কোনও শিশুই অস্বাভাবিক নয়, ভিন্ন মাত্র

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ১৭:১৯, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

বিধান রিবেরুপ্রাণ ওষ্ঠাগত করা এই প্রযুক্তি চালিত যুগে সন্তান লালন পালন এক অতীব কঠিন কাজ হয়ে ওঠায় উন্নত বিশ্বের মতো এখন বাংলাদেশেও ছেলেপুলে দেখে রাখার জন্য ডে কেয়ার সেন্টার চালু হয়েছে। মানুষের শ্রম-ঘাম-মেধা-অবসর-যৌন জীবন সকল কিছু নিংড়ে মুনাফার খাতায় যোগ করে চলা এই নিষ্ঠুর ও যান্ত্রিক সময়ে তাই পিতামাতারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে কীভাবে তারা সন্তানদের বড় করে তুলবেন। এর মাঝে যোগ হয়েছে শিশুদের স্পিচ ডিলে বা দেরিতে কথা বলা, অটিজম ও ডাউন সিনড্রোমের মতো সমস্যা।
শিশুদের দেরিতে কথা বলার উদাহরণ এখন আর দুর্লভ নয়, অনেকেই এর জন্য দায়ী করছেন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি সাইজ ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে। আর অটিজম কেন যে হয় তার কারণ এখনও অনুদঘাটিত, কিন্তু এটা শিশুদের ক্ষেত্রে ঘটছে। তাদের বুদ্ধির বিকাশ অসম হচ্ছে। আবার ক্রোমোজমের ভেতর একুশতম জোড়ায় দুটি জিন থাকার বদলে এক অজানা কারণে তিনটি জিন হয়ে গেলেই শিশুরা শিকার হচ্ছে ডাউন সিনড্রোমের। এতকিছুর পর শিশুর শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার শঙ্কা তো থাকছেই। নতুন শিশু পৃথিবীতে আনার আগে ও পরে তাই বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার সীমা থাকে না।

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে এক ধরনের চিন্তা থাকে, শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হবে তো? হওয়ার পর যদি শরীর কিংবা মনের দিক থেকে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় শিশু, তখন তাকে নিয়ে এক রকম যুদ্ধ, আর যদি সবদিক ঠিকঠাক থাকে, তাহলে তাকে নিয়ে আরেক রকম যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় পিতামাতার। মোটকথা সন্তান যেমনই হোক না কেন, মা-বাবা, পরিবারের লোকজনকে এই যুদ্ধে শামিল হয়ে যেতে হয় অবধারিতভাবে। এসব কথাই মনে হচ্ছিল সম্প্রতি দুটি ছবি দেখে। একটি গেন্ডি তারতাকভস্কি পরিচালিত শিশুতোষ অ্যানিমেটেড ছবি ‘হোটেল ট্রান্সিলভ্যানিয়া-২’ (২০১৫), অন্যটি সুজান বিয়ের পরিচালিত পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক থ্রিলার ‘বার্ড বক্স’ (২০১৮)।

হোটেল ট্রান্সিলভ্যানিয়ার দ্বিতীয় পর্বটিতে দেখা যায়, ১২৫ বছর বয়সী ড্রাকুলা মাতা  মেভিস ও ২৮ বছর বয়সী মানব পিতা জনির ঘরে নতুন অতিথি এসেছে, নাম ডেনিস। এখন সে কি ড্রাকুলা হলো, না মানুষ হলো, সেটি নিয়ে চিন্তার শেষ নেই ৫৩৯ বছর বয়সী নানা ড্রাকুলার। ডেনিসের বয়স এক দুই তিন করে বাড়ছে, কিন্তু এখনো ড্রাকুলাদের মতো দাঁতের ওপরের পাটিতে দুই পাশে ধারালো দাঁত বা ফ্যাং বেরুচ্ছে না। আবার বাচ্চাটা ঠিকঠাক জাদু দিয়ে নিজেকে বাদুড় বানাতে পারবে কিনা সেটা নিয়েও নানার দুশ্চিন্তা। তাহলে কি বাচ্চাটা ‘স্বাভাবিক’ নয়? অটিস্টিক বাচ্চাদের আমরা যেভাবে বলি বাচ্চাটা ‘নরমাল’ নয়, ঠিক সেই কণ্ঠস্বরই যেন ধরা পড়ে নানা ড্রাকুলার কথায়। তবে এর প্রতিবাদ করে মা মেভিস। মেভিসের দাবি, তার ছেলে ডেনিস যেমনই হোক, সে স্বাভাবিক।

হাল ছাড়বার পাত্র নয় নানা ড্রাকুলা। সে সুযোগ বুঝে নাতি ডেনিসকে নিয়ে চলে যায় দূরের এক ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে সে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নেয়, যেন ড্যানিসের দাঁত বেরিয়ে আসে, যেন সে অন্য ড্রাকুলাদের মতো বাদুড় হয়ে উড়তে পারে, কিন্তু না, সেসবের কিছুই যখন হয় না, তখন নানা কিছুটা বাধ্য হয়ে মেনে নেয়, তার নাতি স্বাভাবিক হয়নি, মানুষ হয়েছে। পরে অবশ্য ঘটনার পরম্পরায় শেষ অঙ্কে দেখা যায় ডেনিসের দাঁত ঠিকই বের হয়, সে মায়ের বংশের অন্যদের মতো বাদুড়ও হয়ে যেতে পারে। এটা দেখে সবাই বলতে থাকে, ডেনিস আসলে ছিল “লেট ফ্যাঙ্গার”। এখানে প্রতিধ্বনিত হয় “স্পিচ ডিলে” সমস্যার। অনেক বাচ্চাই কথা বলতে শুরু করে দেরিতে, আড়াই কি তিন বছরের পর। ডেনিসের ড্রাকুলারূপ দেরিতে প্রকাশের মতো।

বাচ্চার কথা বলায় দেরি হলে তখন অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপের শেষ থাকে না। নানা ড্রাকুলার মতো তারাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যায়, সেখানে প্রশিক্ষকরা বাচ্চাদের চোয়াল চেপে ধরে, জিহ্বা টানাটানি করে কথা ফুটানোর চেষ্টা করে। বাচ্চারা এ সময় বুক ফাটানো চিৎকার, কান্নাকাটি করে। অনেক বাচ্চা এই প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে আসে পুরোপুরি, অনেকে আংশিক, অনেকে আবার পারে না। এ এক যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। নানা ড্রাকুলা ‘টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটিল স্টারে’র প্যারোডি করে যে গানটি গায়: Suffer, suffer scream in pain/ Blood is spilling from your brain, বাস্তবিক অবস্থা যেন সেটিই হয়ে দাঁড়ায় বাবা-মায়ের জন্য। অবশ্য প্যারোডিতে বুদ্ধ দর্শনেরও দেখা পাওয়া যায়। জীবনটাই আসলে কষ্টভোগের জন্য।

যাই হোক, সবাই তো আর বাচ্চা ড্রাকুলা ডেনিসের মতো সৌভাগ্যবান নয়। তাই মা ও বাবা যন্ত্রণাকে বুকে চেপে ধরেই তাদের ‘নরমাল’ নয়, এমন বাচ্চাটিকে বড় করতে থাকেন এই ‘স্বাভাবিক’ সমাজে। সত্যিই কি এই সমাজটি স্বাভাবিক? আমার মনে সন্দেহ জাগে, যে সমাজে ‘সুস্থ’ মানুষেরা সবসময় একে অপরকে ঠকিয়ে, মেরেকেটে নিজের পেট ভরার চিন্তা করে, সেই সমাজ স্বাভাবিক? যাদের আমরা ‘সুস্থ’ নয় বলে দাবি করি, সেই শিশুরা বড় হয়ে কি এই ‘সুস্থ’দের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শামিল হয়? তারা কি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়? অনেক অটিস্টিক শিশুকে তো আমি দেখেছি চমৎকার ছবি আঁকতে কিংবা পিয়ানোতে আনন্দধারা সৃষ্টি করতে। সুকুমার বৃত্তিতে তারাই এগিয়ে। তাদের কেউই আজ পর্যন্ত এটম বোমার মতো কোন মারণাস্ত্র আবিষ্কার করেনি বা ব্যাংক লুট করেনি। স্বাভাবিক ও সুস্থের সাথে অস্বাভাবিক ও অসুস্থ হওয়া বা থাকার ধারণাকে তাই আমার কাছে আপেক্ষিক বলেই মনে হয়।

যেসব বাচ্চা তথাকথিক সুস্থ হয়ে জন্মায়, তাদের নিয়েও মা-বাবার চিন্তার অন্ত থাকে না। এই এটা করো না, সেটা করো না, ওদিকে যাওয়া যাবে না, এদিকে হাঁটা যাবে না। এ যেন এক পাগল-পাগল অবস্থা। একে বলে প্যারানয়েড প্যারেন্টিং। এমন চিন্তারই প্রতিফলন দেখতে পাই ‘বার্ড বক্স’ নামের ছবিটিতে। যেখানে দেখা যায় এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে মানুষ গণহারে আত্মহত্যা করছে। অদৃশ্য শক্তিটিকে হাওয়ার মতো করে দেখানো হয়েছে, কিন্তু স্পষ্ট করে দেখানো হয়নি এটি দেখতে কেমন বা এর নামইবা কি। তাই এর নাম দেয়া যায় ‘বদ হাওয়া’। তো এই বদ হাওয়ায় যদি কারো নজর পড়ে তাহলে সে আত্মহনন করে তৎক্ষণাৎ। অবশ্য ছবিতে অনেককেই দেখা গেছে, যারা বদ হাওয়ার সংস্পর্  এসেও নিজেকে হত্যা করতে প্রবৃত্ত হয় না, এদেরকে ইঙ্গিতে বলা হচ্ছে, আগে থেকেই এরা উন্মাদ ও পাগল। তাই নতুন করে এরা আর পাগল হয় না। বরং অন্যদের বাধ্য করে এই ‘সৌন্দর্য’ অবলোকনে।

বদ হাওয়া থেকে বাঁচতে অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকে এবং তারা একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের ডেরা থেকে বেরোয় না। বেরুলেও চোখে পট্টি বেঁধে বেরোয়। ম্যালোরি চরিত্রটিকে দেখা যায় তার নিজের ছেলে ও পালিত এক মেয়েকে নিয়ে শেষ বাজিটি ধরে, জীবন বাঁচানোর জন্য। একটি আশ্রয় স্থলের সন্ধান পায় তারা, সেখানে যেতে হলে খরস্রোতা নদী পেরুতে হবে। এছাড়া আর কোন পথ নেই। সেই রুদ্ধশ্বাস অভিযান শুরু করে তারা। তিনজনকেই তখন চোখ বেঁধে রাখতে হয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তাদের মোকাবিলা করতে হয় নানা প্রতিবন্ধকতার। তখন ম্যালোরিকে বারবার তার দুই ছেলেমেয়েকে বলতে শোনা যায়: Keep running and don’t stop till you get there এবং আরো বলতে শোনা যায়, যত কিছুই হোক চোখ থেকে পট্টি খুলবে না। খুলেছো তো মরেছো।

ব্লাইন্ডফোল্ড বা পট্টিকে বলা যেতে পারে বাবা-মায়ের নিষেধ। এটা করো না, ওটা করো না। অনেকে বলবেন, ফেসবুক বা অসৎ সঙ্গকে দূরে রাখতেই অভিভাবকরা সন্তানদের পট্টি পরে থাকতে বলে। সাফল্য না পাওয়া পর্যন্ত তারা যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়, অর্থাৎ সেই অভয়ারণ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত তারা যেন চোখের বাঁধন খুলে না ফেলে। এতে পথ ভুল করে সন্তান এমন কিছু করে ফেলতে পারে যা আত্মহত্যারই নামান্তর। মা-বাবা নিজেরাও ফোকাস রাখতে চায় সন্তানদের প্রতি, কারণ তাদেরও তো আত্মঘাতী হওয়ার উপকরণের অভাব নেই!

বাস্তব জীবনে সন্তান লালন পালনে অভিভাবকদের অবস্থার এক অপূর্ব রূপক বলেই মনে হয়েছে উল্লিখিত ছবি দুটিকে। দুটি ছবিতেই শেষ পর্যন্ত উত্তরণের গল্প আছে, আশার কথা আছে, ভবিষ্যতের ইতিবাচক ইঙ্গিত আছে। আমরাও চাই আজকের শিশু, যারা আগামী, যারা ভবিষ্যৎ, তাদের নিয়ে আমরা ভাবি, চিন্তা করি, কিন্তু অতিরিক্ত ভাবনা বা দুশ্চিন্তা নয়, সন্তান যেমনই হোক, অটিস্টিক, ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত অথবা এগুলোর কিছু নেই, সুস্থ-সবল সন্তান, তাদের প্রত্যেককেই যেন আমরা সমান ভালোবাসা দিয়ে, চাপমুক্ত হয়ে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করি। কোনও শিশুই ‘অস্বাভাবিক’ নয়, তারা একে অপরের চেয়ে ভিন্ন মাত্র। তাই কোনও বাচ্চার ওপর যেন জোর-জবরদস্তি, তাদের প্রতি যেন পক্ষপাত বা তারা যেন বৈষম্যের ভেতর না থাকে এমন সমাজই আমরা নির্মাণ করতে চাই। সেই সমাজ নির্মাণে আছে কি কেউ ‘সুস্থ’ মানুষ?

লেখক: প্রাবন্ধিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ