সরকারের কাছে পুরনো প্রত্যাশা নতুন করে

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৬:১৭, জানুয়ারি ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, জানুয়ারি ১৭, ২০১৯

লীনা পারভীনটানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পাওয়া এই নেতা তাঁর দৃঢ়তার মাধ্যমে ক্রমশই আমাদের আশান্বিত করে তুলছেন। এ ইতিহাস কে না জানে ১৯৭৫-এর পর থেকে এদেশে চলছিলো নেতৃত্বের শূন্যতা। নেতাশূন্য এ দেশ চলছিলো এলোপাতাড়ি এবড়োথেবড়ো পথে। প্রথমে ১৯৯৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে দেশের ইতিহাস। স্বপ্নহীন বাঙালি জাতি দেখতে থাকে একের পর এক উন্নয়নের স্বপ্ন।
২০০৮ থেকে শুরু করে সবচেয়ে লম্বা সময়ে সরকারে থাকার ইতিহাসও এখন শেখ হাসিনার সরকারের। তবে এ দীর্ঘযাত্রায় কেবল সুখ্যাতি ছিল বা আছে তেমনটাও নয়। গত দুই টার্মে সরকারের সবচেয়ে বেশি যে বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষাখাত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো প্রশ্নফাঁসের ভাইরাস। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা যেন একপ্রকার অলিখিত চ্যালেঞ্জে নেমেছিল মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। মন্ত্রী যতবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন ততই বৃহত্তর গ্রুপে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছিলো। একপর্যায়ে অসহায় মন্ত্রীর অসহায়ত্বের প্রকাশও দেখেছে এ জাতি।

প্রাথমিক ও জুনিয়র পর্যায়ে প্রচলিত পিইসি ও জেএসসি নিয়ে রয়েছে নানা স্তরের ক্ষোভ। এ দুটি পরীক্ষার মাধ্যমে এ জাতি কতটা কী অর্জন করতে পেরেছে সে হিসাব হয়তো কোনও দিন পাওয়া যাবে না। বরং অভিভাবক হিসেবে অন্তত বলতে পারি, এ দুটি পরীক্ষা বাচ্চাদের মধ্যে শঙ্কা ও ভয়ের অবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পরীক্ষার বেড়াজালে বাঁধাপড়া আমাদের সন্তানেরা এখন আর পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র উৎসাহ পায় না। আর এই উৎসাহহীনতা থেকে তারা উদাসীন হয়ে পড়েছে পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে। উদ্বেগ যা আছে তার পুরোটাই অভিভাবকদের মধ্যে বিরাজ করছে। এই উদ্বেগ থেকে অভিভাবকরাও জড়িয়ে পড়েছে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনার সঙ্গে।

শিক্ষার হার বাড়ছে কিন্তু শিক্ষিতের হার কতটা বেড়েছে সে বিষয়টি ভাবতে গেলে অন্ধকারই কেবল দেখা যায়। জিপিএ ফাইভের প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই জিপিএ ফাইভের মর্যাদা এখন শূন্যের কোঠায়। মুখে মুখে চলে কৌতুক। জিপিএ ফাইভ পাওয়া ছাত্ররা মন খুলে উদযাপন করতে পারে না। একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই হচ্ছে সে দেশের প্রকৃত মেরুদণ্ড; অথচ আমাদের দেশের সেই মেরুদণ্ডেই ঘুণে পোকার বাস শুরু হয়েছিলো। একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য পরিবর্তন আনা হয়েছিল স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে। প্রগতিশীল বাংলাদেশের মানুষের মাথায় সাম্প্রদায়িকতাকে ঢুকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো গোটা দেশের মানুষ। যে গল্প কবিতাগুলো আমাদের বাচ্চাদের সামাজিক করে তুলতে পারতো, মানুষকে ভালোবাসতে শেখাতো, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার শপথের পথে নিয়ে আসতো, সেগুলোকে সুকৌশলে ‘হিন্দুয়ানি’ ট্যাগ দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি প্রশ্নপত্রেও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব আমরা দেখেছি।

শিক্ষা ব্যবস্থার অরাজকতার কাহিনি বলতে গেলে কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে কিন্তু তালিকা শেষ হবে না। তবে আজকের এই লেখা সমস্যার তালিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে নয়। নতুন করে সরকার গঠিত হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় যারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তাদের দেখেই আবারও আশায় বুক বাঁধছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোনও কাজই ভাবনাচিন্তা ছাড়া করেন না। তিনি যা করতে চান সেটাই করে দেখান এবং সে কাজের মধ্যে এখন পর্যন্ত ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত আসেনি। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে যে কাজগুলো তিনি করেছেন সেগুলোকে শুধরে নেওয়ার হয়তো প্রত্যয় নিয়েই তিনি আবারও চেয়ারে বসেছেন। তার কিছুটা ঝলক আমরা দেখতে পেলাম সম্প্রতি মওলানা শফীর করা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়। যার ফলে হেফাজত নেতাদের মুখেও আজ নরম সুরে কথা শোনা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষাকে যুক্ত করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে।

তাই আমরা আশা করছি এবারের সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেমন জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন, ঠিক তেমনি শিক্ষা খাতকে আধুনিককরণের পথে সব বাধার বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স ঘোষণা করবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক ও স্বার্থান্বেষী মহলকে চিহ্নিত করে যথার্থ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সিলেবাসকে যুগোপযোগী করা ছাড়া আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন হয়েই থাকবে। বর্তমান সরকার গোটা বিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন এক অন্যরকম উচ্চতায়। এই উচ্চতাকে স্থায়ী করতে তাই প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষিত একটি জাতি গঠন। শিক্ষার সঙ্গে আপস করে স্বাধীনতার স্বপ্নকে স্থায়ী করা প্রায় অসম্ভব।

শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করা লোকগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে আইনের শাসনের প্রতি সরকারের প্রতিজ্ঞাকে আরও শক্ত করতে হবে। সরকারের বিরুদ্ধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অবহেলার অন্যতম একটি অভিযোগ, যে জায়গাটিকেও এবারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে একটি দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা হচ্ছে অন্যতম পূর্বশর্ত। আইনের শাসন কায়েম হলে সমাজ থেকে যেকোনও অপরাধ এমনিতেই কমে আসে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা এর আগে কখনোই আইনের আওতায় আসেনি বলে দিনের পর দিন একই অপরাধ করে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞার ছোঁয়া দেখা গেছে নতুন মন্ত্রিসভার চমকে। অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ কিন্তু দারুণ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বল একদল লোকের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এবারের মন্ত্রিসভা। অভিজ্ঞতা না থাকলেও যার ভেতরে বাংলাদেশ বাস করে, তেমন লোকদের জন্য প্রশাসন চালানো এমন কোনও কঠিন কিছু নয়। তারচেয়েও বড় আশ্রয় যাদের মাথার ওপর আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আর তাই তো স্বপ্ন দেখা শিখতে শুরু করা এ জাতি আশায় বসে আছে কবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হবে বৈষম্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন।

লেখক: কলামিস্ট

  

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ