টার্নিং পয়েন্টে আওয়ামী লীগ

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৭:১৬, নভেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩১, নভেম্বর ১২, ২০১৯

প্রভাষ আমিনশুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশ বা আরেকটু বড় করে বললে গোটা বিশ্বেই অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বয়সের সংখ্যার সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিবেচনা করলে আওয়ামী লীগের নাম আরও সামনে চলে আসবে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। তার মানে একটি ক্ষসতাসীন মুসলিম লীগ, আরেকটি আওয়ামের, মানে জনগণের মুসলিম লীগ। ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু। গত ৬০ বছরে দলটি অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছে, অনেক ভাঙচুর দেখেছে। প্রতিষ্ঠার ৮ বছরের মাথায় ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে গঠন করেন ন্যাপ। আর কালে কালে প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন দলের প্রাণভোমরা। এখন আওয়ামী লীগ মানেই শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, পাথেয়। অনেকবার দল ভেঙেছে, অনেকে দল ছেড়ে গেছেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনও লক্ষচ্যুত হয়নি। প্রবল ঝড়ে নুয়ে পড়েছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে।

ষাটের দশকে পাকিস্তানি সরকার বারবার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে। আতঙ্কে তখন এমন অবস্থাও হয়েছিল, আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বালানোর লোক নেই। তাও শেখ মুজিব হাল ছাড়েননি। তিনি ধরতে পেরেছিলেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল সেই আকাঙ্ক্ষা-স্বাধীনতা। ছয় দফায় আতঙ্কিত পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়। এই মামলাই আসলে পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক। গণঅভ্যুত্থানে মুক্তি পান শেখ মুজিব, হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। তারপর ’৭০-এর নির্বাচন আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আসে স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন বঙ্গবন্ধুর নামে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। হত্যার ধরনটাই বলে হত্যাকারীরা বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ’৭৫-এর পরের ২১ বছর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে কঠিন সময়। ’৭৫ থেকে ’৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ফেরা পর্যন্ত টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম। আর ’৮১ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের লড়াই। ’৭৫ থেকে ’৯৬—এই ২১ বছর বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলেন জাতির জনক। ’৭৫-এর পর কৃষ্ণতম সময়েও আওয়ামী লীগ টিকে থাকতে পেরেছিল তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের জন্য। এই কর্মীরা কিছু পাওয়ার আশায় নয়; একদমই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে, আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে সামরিক শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাটি কামড়ে পড়ে ছিল।

২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়াম লীগ। তারপর থেকে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায়, শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী। এখন বাংলাদেশের যে বাস্তবতা, তাতে শেখ হাসিনার কোনও বিকল্প নেই। শেখ হাসিনা নিজেকে তুলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। শেখ হাসিনা তো বিশ্বনেত্রী। কিন্তু সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থা কী?

আমার বিবেচনায় আওয়ামী লীগ এখন একটি ভয়াবহ সংকটকাল পার করছে। সংকটটা ’৭৫-এর পরের চেয়েও ভয়াবহ মনে হয় কখনও কখনও। কারণ, তখন আওয়ামী লীগকে যারা বাঁচিয়েছিলেন, তারা এখন দলে কোণঠাসা। ‘ডিজিটাল আওয়ামী লীগে’ এখন মাটি কামড়ে পড়ে থাকা ‘আনস্মার্ট’ নেতাকর্মীদের কদর নেই। দলে এখন যেই ‘স্মার্ট’ নেতাদের ভিড়, বিপদের দিনে তাদের পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সে কারণেই এবারের সংকটকে আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ মনে হচ্ছে। চরম নেতিবাচক যেমন খারাপ, চরম ইতিবাচকও ভালো নয়। না খেলে যেমন মানুষ বাঁচে না, বেশি খেলেও বদহজম হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ যেমন ঘোর অন্ধকারে পড়েছিল, এখন আবার টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অতি আলোয় চোখ ঝলসে যাওয়ার দশা। ঝলমলে সেই আলোর নিচেই জমা হয়েছে গভীরতর অন্ধকার। টানা ক্ষমতা আওয়ামী লীগের নেতাদের জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, মাস্তানির এন্তার অভিযোগ। কথা বললেই বোঝা যায়, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সামান্যই। শুধু যে স্বীকৃত সহযোগী সংগঠনের নেতারা দলকে বিপদে ফেলছেন তা-ই নয়; নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’, শেষে ‘লীগ’ লাগিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে আরও বহু সংগঠন। তাদের সবার ‘ধান্দাবাজিতে’ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। এখন যতই অপকর্ম করুক, যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগার, সংগঠনের বিপদে তারা ঠিকই পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সমস্যা হলো ক্ষমতার মধুর লোভে আসা নতুন ‘স্মার্ট নেতাদে’র নিয়ে, ওবায়দুল কাদের যাদের ‘হাইব্রিড’, ‘কাউয়া’ বলে ডাকেন। স্রোতের সঙ্গে অনেক সময় কচুরিপানা আসে। কিন্তু কচুরিপানা বেশি এলে স্রোত আটকে যায়।.
পরগাছা কখনও কখনও খেয়ে ফেলে মূল গাছ, আগাছায় ঢেকে যায় মূল ফসল। আওয়ামী লীগে এখন প্রকৃত আওয়ামী লীগারের বড়ই অভাব। মাঠপর্যায়ে যাওয়ার দরকার নেই, আওয়ামী লীগের এমপিদের মধ্যে কয়জন প্রকৃত আওয়ামী লীগার, সেই হিসাব করলেই বুঝবেন সংকটের ধরনটা। আওয়ামী লীগে নেতাকর্মীর কমতি নেই। ইউনিয়ন পর্যায়েও তাদের লোক আছে। সেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কেন সবার জন্য তার দ্বার খুলে দিলো, সেটাও একটা বিস্ময়ের। বিএনপি-জামায়াত তো বটেই, এমনকি আওয়ামী লীগের ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষায় যাদের সৃষ্টি, সেই ফ্রিডম পার্টির নেতারাও এখন আওয়ামী লীগের সামনের সারিতে। পেছনে পড়ে থাকেন পোড় খাওয়া, মাটি কামড়ে পড়ে থাকা নেতারা।
আশার কথা হলো, দেরিতে হলেও শেখ হাসিনা বিপদটা বুঝতে পেরেছেন। তাই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন ঘর থেকেই। ১৪ সেপ্টেম্বর চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতির মাধ্যমে শেখ হাসিনা যে অভিযান শুরু করেছেন, তা আতঙ্ক ছড়িয়েছে আওয়ামী লীগের ঘরেই। শেখ হাসিনাকে এখন আওয়ামী লীগের লোকজনই বেশি ভয় করে। অবশ্য সবাই নয়; দুর্নীতিবাজ, ক্যাসিনোবাজ, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজরাই শেখ হাসিনার ভয়ে অস্থির। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা দিয়ে শুরু, এরপর শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু করেন সর্বাত্মক অভিযান। এ অভিযান থেকে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগ কেউই রেহাই পায়নি। সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি চলছে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও।
শেখ হাসিনা জানেন, তার সবচেয়ে বড় সহায় সংগঠন। যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিনই প্রশাসন আর উড়ে আসা নেতারা থাকবে। আর সংগঠন পাশে থাকবে সারা জীবন। তাই তিনি টানা তিন দফা ক্ষমতায় থাকার কারণে ভঙ্গুর ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সংগঠনকে নতুন করে প্রাণসঞ্চারের কাজ শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ যে সংকটে পড়েছে, তা থেকে দলকে উদ্ধার করে আবার জনগণের দলে পরিণত করার সক্ষমতা কেবল শেখ হাসিনারই আছে। তিনি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সম্মেলনের তুফান মেইল চালিয়ে দিয়েছেন। দুই বছরের কমিটি দিয়ে যেখানে সাত বছর চলে, সেখানে এবার তিনি একসঙ্গে সম্মেলনের লাইন ধরিয়ে দিয়েছেন। আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে হয়ে গেছে কৃষক লীগ আর জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্মেলন। লাইনে আছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং যুবলীগের সম্মেলনও। আশার কথা হলো, এবারের সম্মেলন আগের মতো গড়পরতা নয়। প্রস্তুতি পর্ব থেকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগের নেতৃত্বেও এসেছে চমক। শেখ হাসিনার ভয়ে পদপ্রত্যাশী নেতারাও চুপ মেরে গেছেন। এবার শোডাউন নেই, স্লোগান নেই, প্রতিযোগিতা নেই।
টানা তিন দফা ক্ষমতায় থাকাটা সাফল্য, তবে আওয়ামী লীগের মতো ৬০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী দলের জন্য এটা তেমন কিছু নয়। একটা সংগঠন কতদিন টিকে থাকবে, তা নির্ভর করবে সেটি কতটা জনসংলগ্ন তার ওপর। আওয়ামী লীগ এখন এক টার্নিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চিত করেই বলা যায় সম্মেলন পর্ব শেষে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হবে। শেখ হাসিনার পছন্দের নেতারা যদি আগের মতো ভালোবেসে সংগঠনের জন্য কাজ করেন, জনগণের পাশে থেকে দেশের জন্য কাজ করেন; তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ