মেয়রদের ইশতেহার: বাস্তবতা বনাম স্বপ্নবিলাস

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৪৫, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৬, জানুয়ারি ২৯, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজানির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। লিখিত ও মুদ্রিত আকারে সেগুলোর উপস্থাপন ঘটে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এটা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আমরা দেখলাম এই সিটি নির্বাচনেও মেয়র প্রার্থীরা ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন ডিজিটাল ও সচল ঢাকা করবেন, কেউ স্মার্ট ঢাকা করবেন কিংবা ইনটেলিজেন্ট ঢাকা করবেন।
ইশতেহার মানে শুধু কিছু প্রতিশ্রুতি নয়, কথার কথা নয়। ইশতেহার যেহেতু লিখিত আকারে প্রকাশিত হয়, তাই ইশতেহার হলো ভোটারের সঙ্গে একজন প্রার্থীর লিখিত চুক্তি। তো সেই চুক্তি পরে যদি ভুলে বসেন তখন কী হবে? সত্য হলো, নির্বাচনে জেতার পর এসব আর প্রার্থীদের মনে থাকে না, বা নানা কারণে মনে রাখতে পারেন না তারা। 
পাঁচ বছরের জন্য দুইজন মেয়র আসবেন এই শহরের দুটি অংশে। একটি শহরে দুটি সিটি করপোরেশন। কেন্দ্রে অবস্থিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এই শহরের নাগরিকদের জন্য তারা কতটা করতে পারবেন, সেটা না জানা গেলেও এটুকু অনুমেয় যে, নির্বাচিত মেয়ররা নিজেদের পাহাড় সমান সমস্যায় সোপর্দ করতে যাচ্ছেন।

তাই অতিমাত্রায় প্রতিশ্রুতি পরবর্তী সময়ে কাল হতে পারে। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ আমাকে বললেন, মেয়র প্রার্থীরা কেউ কেউ এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যেগুলো আইন অনুযায়ী তাদের দায়িত্বের মাঝেই পড়ে না, কারণ এসব কাজ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা রয়েছে। তার মতে বেশি নয়, পাঁচ বছরে একটি কাজ করুক যেটা নগরবাসীকে অন্তত একটি সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে।

অনেক কাজের কথা না বলে কিছু সুনিদিষ্ট কাজ করার চেষ্টা করলে নগরবাসীর উপকার হয় অনেক। যেমন মশা নিধনের কাজটি যদি সুচারুরূপে করা যায়, সেটাই একটা বড় কাজ হয়ে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা শহরের তকমা পাওয়া এই শহরটায় একটা পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি আনতে পারাটাই হবে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যানজট থেকে মুক্তি দিতে বা সারাবছরের উন্নয়ন খোঁড়াখুঁড়ির বেদনা উপশম করতে তারা যদি সরকারি নানা সংস্থার কাছে পরাজিত না হয়ে জনগণের হয়ে কিছু কাজ করেন, সেটাই বদলে দেবে এই রাজধানীকে।

মেয়র প্রার্থীরা বলছেন তারা নির্বাচিত হলে নিরাপদ নগরী গড়ে তুলবেন। কিন্তু আইনে করপোরেশনকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ বাহিনী এবং সেটি সিটি করপোরেশনের অধীনে নয়। তেমনি পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, রাস্তা মেরামত, নগর পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো সিটি করপোরেশনের হাতে নেই।

হ্যাঁ এমন অনেক কিছুই নেই সিটি করপোরেশনের হাতে। কিন্তু মেয়রের হাতে একটি অস্ত্র আছে। সেটা হলো এই শহরের জনগণ। অনেক এমপির চেয়েও বেশি ভোটে নির্বাচিত মেয়র পারেন এসব বিশেষায়িত সংস্থা বা আমলাদের করপোরেশনের ইচ্ছার কাছে নত করতে। তিনি বলতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন যে, এই নগরীর উন্নয়ন, মেরামত, সেবা-পরিষেবায় সব নাগরিকের মতামত প্রয়োজন এবং নগরবাসীর হয়ে মতামতটা দেবেন তিনি নিজেই। এমন মেয়র চাই যিনি কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে প্রশ্ন করতে পারেন, তার ভোটারদের কষ্টের কারণ হলে কোনও উন্নয়ন কাজ তিনি বন্ধও রাখতে পারেন, ঠিকাদার ও বাস্তবায়ন সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারেন।

একটি বড় দুর্বলতার জায়গা হলো ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কর্মকাণ্ড। সব কাজের জন্য মানুষ মেয়রকে দেখে, তাকেই দায়ী করে। কিন্তু সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, সব কাজের জন্য মেয়র এবং কাউন্সিলরগণ যৌথভাবে দায়ী থাকবেন। যেহেতু এটি এখন করপোরেশন, তাই তার কাজের প্রকৃতি করপোরেট ধরনের। এই কাউন্সিলরদের নিয়েই যেহেতু করপোরেশনের পরিচালনা পর্ষদ, তাই মেয়র একক কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। যেখানে নানা সরকারি সংস্থা থেকে লোক এনে প্রধান নির্বাহী থেকে শুরু করে, বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান যেভাবে আমলানির্ভর করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের পরিচালন, সেখানে কাউন্সিলরদের নিজ নিজ এলাকায় ব্যবসাপাতির খোঁজ করা ছাড়া আর কোনও ভূমিকা নেই।

কাউন্সিল সভা হয় ঠিকই, কিন্তু দায়সারা গোছের সেইসব সভা। করপোরেশনের প্রতিটি কাজই আসলে করার কথা কাউন্সিল সভার অনুমোদন সাপেক্ষে। অনেক সময় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার সিটি করপোরেশনকে বড় আকারের বাজেট বরাদ্দ দেয়। আইন অনুযায়ী সেটি নির্ধারণ করা আছে এবং সেসবের বাস্তবায়নের জন্য কাউন্সিলরদের বড় ভূমিকা চোখে পড়ে না।

এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মেয়রের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে তিনি কতটা সমন্বয় করতে পারছেন, বা মানুষকে তিনি কী উপহার দেবেন। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক নগরবাসীর অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য চালু সামাজিকমাধ্যমে সবসময় সক্রিয় ছিলেন। তাই যে নতুন মেয়র আসবেন, তাকে নাগরিকের সমস্যা-অভিযোগ শুনতেই হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। সাধারণের কথা শুনলেই মেয়র বুঝবেন বড় বড় পরিকল্পনাবিদের চেয়ে তারাই তাকে সমাধান যাত্রার পথ দেখাবেন বেশি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ