অবসরপ্রাপ্ত আমলা, থিংকট্যাংক ও পাবলিক পলিসি

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৭:১৮, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২১, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২০

মো. সামসুল ইসলামউন্নত, কোনও কোনও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পাবলিক পলিসি প্রণয়নে থিংকট্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বলা হয়, যে সরকারি আমলারা অফিসে তাদের দৈনন্দিন রুটিন কাজকর্মে এত ব্যস্ত থাকেন যে, তাদের পক্ষে কৌশলগত পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। থিংকট্যাংকগুলো এক্ষেত্রে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রণয়নে এবং বাস্তবায়নে শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাতকেও তারা তাদের গবেষণা ও পরামর্শের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারে।    
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য লডার ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের গ্লোবাল গো টু থিংকট্যাংক ইনডেক্স রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে এখন থিংকট্যাংকের সংখ্যা ৩৬। একই রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী সব ধরনের থিংকট্যাংকের মধ্যে র‌্যাংকিং অনুসারে বাংলাদেশের থিংকট্যাংক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অবস্থান ১০৪ নম্বরে। বিশ্বব্যাপী আট হাজারেরও বেশি থিংক ট্যাংকের মধ্যে বিআইডিএসের অবস্থান বেশ সম্মানজনকই বলা যায়। র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের সেরা থিংকট্যাংকটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস। সবচেয়ে বেশি থিংক ট্যাংকের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে, সংখ্যা ১৮৭১। এরপর ভারতে ও চীনে, যথাক্রমে ৫০৯ ও ৫০৭ টি।   

সম্প্রতি সরকারের কিছু অবসরপ্রাপ্ত সচিবের একটি থিংক ট্যাংক কমিটি গঠনের সংবাদ গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। দেশের ৪২ জন সাবেক সচিব এক বৈঠকে তারা নিজেদের প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালনের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। পত্রিকার খবর পড়ে বোঝা গেলো, এটি তাদের একবারে প্রাথমিক চিন্তাভাবনা। তারা এখন এটির গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করছেন। তবে পত্রিকার খবর অনুসারে এটি একটি গবেষণা বা সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হবে বলে তারা জানিয়েছেন।

যেহেতু এটি এখনও কোনও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপ নেয়নি, সেহেতু এটি নিয়ে কোনও আগাম মন্তব্য করাও সমীচীন নয়। তবে, আমি একটি সরকারি থিংকট্যাংকে এক দশকের বেশি সময় কাজ করেছি। তাই, থিংকট্যাংক গঠনের এই সংবাদ আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এটি বলতে পারি, বাংলাদেশে সরকারি নীতি প্রণয়নে ও বাস্তবায়নে থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, তা বলা যায় না। অন্যভাবে বলা যায়, থিংক ট্যাংকগুলোর পরামর্শ আমাদের দেশে শোনা হয় না।

অথচ সরকারি বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে গবেষণার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। আমি যেহেতু শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি পছন্দ করি, তাই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কথাই বলা যাক। বেশ কিছুদিন থেকে দেখছি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকসহ শিক্ষাব্যবস্থায় এত পরিবর্তন আনা হচ্ছে যে, যারা শিক্ষা নিয়ে খোঁজখবর রাখেন তাদের পক্ষেও এত কিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। বারবার গ্রেডিং পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি বা কারিকুলাম ইত্যাদির পরিবর্তন করা হচ্ছে। জাতির জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিসের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। ইন্টারনেটে কি কোনও পলিসি পেপার, ওয়ার্কিং পেপার বা গবেষণা পাওয়া যাবে এসব ব্যাপারে? নাকি সিদ্ধান্তগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়েছে জনগণের সঙ্গে কোনও আলাপ আলোচনা করা ছাড়াই?

আমরা যদি শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করি, তাহলে দেশের শিক্ষা পদ্ধতির একটি বিচিত্র চিত্র পাই। সব পর্যায়ে গ্রেডিং পদ্ধতি বা স্নাতক পর্যায়ের পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের পদ্ধতির মতো করা হচ্ছে, আবার স্নাতকোত্তর বিশেষত এমফিল, পিএইচডি শিক্ষাপদ্ধতি যুক্তরাজ্যের আদলে, এসএসসি, এইচএসসি পদ্ধতি যুক্তরাজ্যের আদলে আবার পিইসি বা জেএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি সম্ভবত থাইল্যান্ডের মতো করা হয়েছে। বারবার বিভিন্ন পরিবর্তনে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, দীর্ঘমেয়াদি কোনও গবেষণা বা কৌশলগত চিন্তাভাবনা ছাড়াই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

থিংকট্যাংকগুলো শিক্ষাসহ এই ধরনের বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে সরকারকে সহায়তা করতে পারে। থিংকট্যাংকগুলোর বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ আছে। উন্নয়ন, পররাষ্ট্রনীতি, সামাজিক নীতি ইত্যাদি বিষয়ে আলাদা আলাদা হতে পারে আবার বিভিন্ন বিষয়ের একসঙ্গে বা মাল্টিডিসিপ্লিনারিও হতে পারে।

তত্ত্বীয়ভাবে বলতে গেলে, সরকারি অবসরপ্রাপ্ত আমলারা শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের একটি সুবিধা আছে যে, তারা ইচ্ছে করলেই সরকারি তথ্য, উপাত্ত সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন। দীর্ঘদিন সরকারে কাজ করার ফলে তাদের সরকারি বিভিন্ন নীতি, কার্যক্রম বা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একধরনের যোগাযোগ থাকে যা পরবর্তী সময়ে গবেষণা কার্যক্রমে সহায়ক হয়। তবে বোঝাই যায়, এসব থিংক ট্যাংক বেসরকারি পর্যায়ে হয়ে থাকে। 

বাংলাদেশে এ ধরনের বেসরকারি বেশ কিছু থিংকট্যাংকের অস্তিত্ব আছে। যেমন, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) নামে একটি থিংকট্যাংক গড়ে তুলেছেন, যা দেশে-বিদেশে বেশ সমাদৃত। এছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বা আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশি চ্যাপ্টার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিশেষভাবে পরিচিত। 

আবার দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও থিংকট্যাংক থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) বা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআর আই)-এর কথা বলা যায়। বলা হয়ে থাকে, এনডিআই ডেমোক্রেটিক পার্টির এবং আইআরআই রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর থিংকট্যাংক থাকা অবশ্যই ইতিবাচক। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শন সম্পর্কে সাধারণ জনগণ ধারণা পেতে পারে। আমাদের দেশের কোনও কোনও রাজনৈতিক দলের থিংক ট্যাংক বা গবেষণা সেলের কথা শোনা যায়। ভালো হয় সেগুলো যদি দলের ঊর্ধ্বে উঠে জনসম্পৃক্ততা অর্জন করতে পারে।

আধুনিক যুগে একটি দেশে থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। থিংকট্যাংকের আদর্শ যে কার্যাবলি যেমন স্ট্যাটেজিক থিংকিং বা পাবলিক পলিসি তৈরি বা বাস্তবায়নে সাহায্য বা রিস্ক অ্যানালাইসিস ইত্যাদির মাধ্যমে তারা আমলাতন্ত্র তথা সরকারকে সাহায্য করতে পারেন। আমাদের অবসরপ্রাপ্ত আমলারা বলছেন, তারা জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশের উপকার করতে চান। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমে দেখলাম পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি হচ্ছে। আগেই বলেছি, যেহেতু এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু বলেননি, সেহেতু আমরা এ বিষয়ে আগাম কোনও মন্তব্য করতে চাই না। আমাদের আজকের আলোচনা ছিল মূলত থিংকট্যাংকের তত্ত্বগত বিষয়ে–কীভাবে তারা দেশকে সহায়তা করতে পারেন, সে ব্যাপারে। 

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]                    

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ