আকবরদের হাতে উঠুক পুরস্কারের ডালি

Send
পবিত্র কুন্ডু
প্রকাশিত : ১৪:৪১, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

পবিত্র কুন্ডু‘বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ।’
কবির এ কথা আমাদের মতো করে বদলে নিয়ে লিখতে পারি, সেনওয়েস পার্কে কয়েক মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ! তোমায় মানে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব নির্মিত হওয়ার সেই কয়েক মিনিট। সেই কয়েক মিনিটে স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার পরও যা স্বপ্নের মতো। যে স্বপ্ন  ডুবে থাকে জাগরণে অথবা মায়াবী বিভ্রমে। বহুক্ষণ কেন সারাক্ষণই।
না, ঘুম বা বিভ্রম কাটিয়ে আমরা ধাতব ট্রফিটিকে দেখলাম মূর্তিমান। সত্যিই আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এই পৃথিবীতে ক্রিকেট নামের যে মোহনীয় খেলাটি আছে, তাতে আমাদের উনিশ না পেরোনো তরুণেরাই সবার সেরা। সবাইকে পেছনে ফেলে তারা মুকুট পরেছে শ্রেষ্ঠত্বের।
মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কথা বলেছেন, রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে এটাই শ্রেষ্ঠ উপহার। দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি খাঁটি কথা বলেছেন, শুধু ক্রিকেটই নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনেরই সেরা অর্জন এই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়।

কে কবে ভেবেছিল এক শীর্ণ ক্রীড়া কাঠামোর ভেতরে থেকেও এ দেশের একটি দল বিশ্বসেরা হতে পারে! আকবর আলীর দল কল্পনার খোলস ভেঙে সেটা করে দেখিয়েছে। এই তো গত রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে। যেখানে তাদের অগ্রজদের দুটি টেস্ট আর একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা গভীর পরাজয়ের ক্ষতচিহ্ণ এঁকে রেখেছে।

সুতরাং আকবর আলীদের এই অর্জনের আলো ঠিকরে পড়ার কথা ছিল সারাদেশে, এমনকি বাঙালি অধ্যুষিত সারাবিশ্বে। সেটাই হয়েছে। পচেফস্ট্রুমের আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরোন্টো, মেলবোর্ন,মস্কো।

রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার পর পরই যখন জয়টা এসে গেলো, উদযাপনটা হয়েছে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। ড্রয়িংরুমে উৎসব। করতালির সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ বা ‘আকবর’ ‘আকবর’ ধ্বনিতেই যা সীমাবদ্ধ ছিল। ২৩ বছর আগের আইসিসি ট্রফি জয়ের সেই বাঁধভাঙা উদযাপনের সঙ্গে ইচ্ছে করেই মিল খুঁজতে যাইনি। বসন্ত আসি আসি হালকা এই শীতের রাতে কেউ বাইরে উদ্দাম উদযাপনে মেতে উঠতে চায়নি। রাস্তায় রং খেলা হয়নি, বাজি পোড়েনি। স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল হয়নি পাড়ায় পাড়ায়।

আমার মনে হয় বিশ্বজয়ের মহিমা বুঝতে একটু দেরিও হয়েছে অনেকের। কিন্তু যখন সবাই বুঝেছে ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জয় ছিল সিনিয়র দলের ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলার ছাড়পত্র পাওয়া, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত ছিল আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোর মধ্যেই, আর এটি ছোটদের হলেও প্রকৃতই বিশ্বজয়, মানুষ হয়েছে উদ্বেল।

অতএব এই দৃশ্যটি অনিবার্য ছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে ঢল নামল মানুষের। বালকবীরের বেশে বিশ্ব জয় করে আসা আকবর-ইমন-অভিষেক-শরিফুল-রাকিবুলদের নিয়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটে না তাদের। বিমানবন্দর থেকে ক্রিকেট সদর দফতর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম পর্যন্ত রাস্তা জনারণ্য। বিজয়ীদের গলায় ফুলের মালা, চোখে আনন্দাশ্রু। স্টেডিয়ামের মধ্যিখানে মঞ্চ বেঁধে কেক কাটা হচ্ছে। আতশবাজির আলোয় ঝলসে উঠছে চারপাশ। ক্রিকেটের এমন দিন এই জাতির জীবনে আর আসেনি। এই ফুল আর অশ্রু আকবরদের, এই ফুল আর অশ্রু জনতার। ক্রিকেটের সরণিতে হাঁটা সব মানুষের।

পরদিন ক্রিকেটারদের ঘরে ফেরার পালা। দেশের এ প্রান্তে ও প্রান্তে কেউ কেউ গেলেন বিমানে, কেউ কেউ সড়কপথে। বিস্ময়কর দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার বাকি ছিল আরও। ইস্পাত-স্নায়ুর প্রেরণাদায়ী অধিনায়ক আকবর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে রংপুরের বাড়িতে পৌঁছালেন ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তায় মানুষের ফুল আর ভালোবাসা পেয়ে। মাশরাফির শহর নড়াইলের ছেলে অভিষেক দাসকে অর্ভ্যথনা জানায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ জনতার মিছিল। পঞ্চগড়ে শরিফুল ইসলামকে বরণ করে নেয় মোটরসাইকেলের লম্বা শোভাযাত্রা। বিশ্ব জয়ের পাঁচদিন পরেও উৎসবের আলোর ঝলকানি। উৎসবের আলো আর অভিনন্দনের উষ্ণস্রোত এখনও থামেনি। বিশ্বজয়ীদের এটা প্রাপ্য। আগামী দু’বছর ধরে চলতে থাকুক না এমনটা, ক্ষতি কী? এই দু’বছর উনিশ বছর বয়সী ক্রিকেটারদের পৃথিবীর রং যে লাল-সবুজ।

মিরপুরে ১২ ফেব্রুয়ারি যে সংবর্ধনা হয়েছে বিশ্বকাপ জয়ী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের, সেটি হঠাৎই আয়োজিত। সেটাই উপহার দিয়েছে রাশি রাশি বিস্ময়। বাকি আছে সরকারি সংবর্ধনা। যেখান থেকে ৪৯ বছর আগে ঘোষিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা, সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২১ ফেব্রুয়ারি সংবর্ধিত হবেন আকবররা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে মিশবে ক্রিকেটে বিশ্ব জয়ের অহংকার।

এই ক্রিকেটারদের হাতে উঠুক পুরস্কারের ডালি। আমাদের ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই পুরস্কৃত করবেন ওদের। তুলনায় কত অনুল্লেখ্য অর্জনেই উনি মহার্ঘ্য পুরস্কার দিয়েছেন ক্রীড়াবিদদের। আর এ তো হবে বিশ্ব জয়ের স্বীকৃতি। যারা মনে করেন এত এত পুরস্কার দিয়ে মাথা খেয়ে ফেলা হবে তরুণদের, আমি তাদের দলে নেই। সাফল্য সব সময়ই প্রণোদনা দাবি করে, অর্জন সর্বদাই চায় স্বীকৃতি। এরা চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার, কীভাবে সাফল্যের খিদেটাকে চাগিয়ে রাখতে হয়, তা জেনে গেছে সেনওয়েস পার্কে। না হলে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত, প্রবল প্রতাপশালী ভারত যাদের কাছে বারবার হারই হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের নিয়তি, তাদের ওভাবে স্নায়ু-জর্জর ফাইনালে হারানো যেতো না।

কেন এদের পুরস্কৃত করা হবে না? এদের বাবারা কেউ ঘুষখোর, প্রতারক, ‍ঋণখেলাপি বা অর্থ পাচারকারী নন। মালয়েশিয়ায় বা কানাডায় এদের বাবারা কেউ ‘সেকেন্ড হোম’ বানাননি। এদের বাবারা নিম্নবিত্ত। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, কেউ গাড়িচালক। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় প্রায় সবার। আর এরাই যখন এ দেশকে যুব ক্রিকেটে বিশ্বসেরার গৌরব এনে দেয়, বড় পুরস্কারই তাদের প্রাপ্য।

পুরস্কারে মাথা যাতে ঘুরে না যায়, সেটা দেখার দায়িত্ব ক্রিকেট বোর্ডের। আইসিসি ট্রফি জয়ে কি মাথা ঘুরে গিয়েছিল আকরামদের? ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর স্বপ্নের মতো যে প্রহর কেটেছে মাশরাফিদের, তাদের পা তখন মাটিতে থাকেনি?

চ্যালেঞ্জটা হলো অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটের পরের বিশাল ব্যবধান ঘুচিয়ে এদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য তৈরি করে তোলা। ক্রিকেট বোর্ডকে সেই চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে। সবাইকে তো আর উন্নতির রাস্তায় সমানভাবে ধরে রাখা যাবে না, কেউ দলছুট হবে। টিকে যারা থাকবে, তারাই আগামীদিনের সৈনিক।

দক্ষিণ আফ্রিকার তাজা উইকেটে আকবররা অনেক পরিণতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডেরও পরিণত হয়ে ওঠার সময় এখন। আশা করি বিশ্ব জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ বোর্ডের খিদেটা বাড়িয়ে দেবে। জয়ের খিদে আছে কি নেই, এতদিন সেটাই যে বোঝা যায়নি।

লেখক: স্পোর্টস এডিটর, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X