খালেদা জিয়ার মুক্তির রাজনীতি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:১৮, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৩, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজারাজনীতির মন থাকে না, মন থাকতে নেই। রাজনীতি মানে ক্ষমতার কক্ষপথ ধরে আবর্তিত হওয়া। কিন্তু এই ক্ষমতা ভাবনা বা ক্ষমতাকে কীভাবে আরও নিশ্ছিদ্র করতে হয় সেটা ভাবা ছাড়া আরও অনেক কিছু ভাবতে হয়। তাই রাজনীতি নামক গল্পের পরিণতি সবসময় আগে অনুমান করা যায় না।
যেমন এ মুহূর্তের রাজনীতির গল্প বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। তিনি কি শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছেন? পেলে কীভাবে পাবেন? জামিনে, না প্যারোলে? এসব আলোচনা সরব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে তা কেউ জানেন না। বিএনপি ভাবতে পারেনি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা আছে তা এতদূর যাবে, ভেবেছিল আর যাহোক তাঁকে জেলে ভরা যাবে না, তাকে জেলে নিলে দেশবাসী বড় আন্দোলন গড়ে তুলবে। কিন্তু তা হয়নি। বেগম জিয়া জেলে আছেন এবং সম্প্রতি তার জেলজীবনের দু’বছর পূর্ণও হয়েছে।

দুটি দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের দণ্ড নিয়ে কারাগারে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই দু’বছরে তার মুক্তির বিষয়টি একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। বিএনপি বুঝতে পারছে ভালো করেই যে আন্দোলন কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় দলীয় প্রধানকে বাইরে আনা যাচ্ছে না। এখন ভরসা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা। কিন্তু সেটাও কী করে হবে তা পরিষ্কার নয়।

২০১৪ সালের ভুলকে স্বীকার করে আর নির্বাচন বর্জন করছে না বিএনপি। সংসদ ও স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি। বারবার বলছে আন্দোলনের অংশ হিসেবে দল নির্বাচনে যাচ্ছে। এই আন্দোলন হলো বেগম জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি নেতারা রাজনীতির গভীরতা মাপছিলেন। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলেন না গন্তব্য কী? সেই নির্বাচনে দলের যে ফলাফল হয়েছে তাতে সরকারকে একতরফা দোষ দিয়ে, আগের রাতে ভোট হয়েছে ইত্যাদি অভিযোগ করে রাজনীতির মাঠে নিজেদের খুব একটা গুরুত্ব বাড়াতে পারেননি নেতারা। ঐক্যফ্রন্ট অকার্যকর হয়েছে নির্বাচনের পরপরই। নিজেদের দলীয় মনোবল আর চাঙ্গা করার কোনও উপায়ই খুঁজে পাচ্ছে না দলীয় নেতৃত্ব। এমন বাস্তবতায় দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরও তাকে বাদ দিয়ে ছয় জনকে লন্ডনের সিদ্ধান্তে সংসদে পাঠানো হয়েছে। সংসদীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে চায় বলেই হয়তো এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল দল।

বিএনপি নেতাদের ভাবনায় আছে দল জনপ্রিয়। কিন্তু দলের ডাকে নেত্রীর মুক্তির জন্য মানুষ কেন পথে জেদ নিয়ে নেমে পড়লো না, সেই বিশ্লেষণ পাই না। রাজনীতির চেনা ছক থেকে এই দলের বেরিয়ে আসার কোনও লক্ষণও নেই। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি নির্বাচনেও দলটি তার জনপ্রিয়তা যাচাই করেছে। নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রচারে দলের নেতা কর্মীদের যতটা উজ্জীবিত দেখা গেছে, ততটা ভোটের দিন দেখা যায়নি। বুথ দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়ার অনেক অভিযোগ করতে পারবে দলটি, কিন্তু দলকে ভোট দিতে, নেত্রীকে জেল থেকে বের করতে দলের নেতাকর্মীরা কেন ভোট দিতে এলো না সেই উত্তর দিচ্ছেন না দলের নেতারা।

জনপ্রিয়তার কথা বললেও বিএনপি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রমাণ করেছে যে এটি একটি জনবিচ্ছিন্ন দল। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ইত্যাদি ইস্যুর বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য কথা বলেছে খুবই কম। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এখন কোনও যোগাযোগ নেই দলের। নেই বলেই দলের ডাকে মানুষ রাস্তায় নামে না।

তাছাড়া মানুষের মনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। জামায়াতের সঙ্গে মিলে তিন মাস ধরে পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার আগুন সন্ত্রাসী রাজনীতি সরকারকে যতটা না বেকায়দায় ফেলেছিল, তারচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে সাধারণ মানুষকে। সাধারণ মানুষ মারা গেছে, তারা ঝলসে গেছে, আর বিএনপি নেতারা এসি রুমে বসে পোলাও কোরমা খেয়েছে– এমন এক ধারণায় এখন আর মানুষ রাজপথে নেমে আসে না।

মানুষের ভেতর পরিবর্তন আরও এসেছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ক্ষমতায়। ফলে এই সরকারের সব কাজ ভালো হয়েছে সেটা বলা যাবে না। কিন্তু সরকার কোনও ভালো কাজ করেনি বা করে না বলে বিএনপি যা বলে, সেটাও মানুষ নিচ্ছে না। বিএনপির এই ঢালাও সরকারবিরোধিতা মানুষ সত্যি পছন্দ করছে কিনা, সেটা দলের নেতারা যাচাই করার প্রয়োজনও বোধ করছেন না। ফলে কোন কাজটি করলে মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে– বিএনপি সেটাও বোঝার চেষ্টা করেনি।

ঘুষ-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-দলীয়করণ নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালোভাবে দেশ চালাবে– এটাও মানুষ বিশ্বাস করে না। প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলে বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন, নাকি অন্য কোনও উপায়ে সরকার তার বিষয়টি বিবেচনা করবে, সে বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি এখনও।

বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে বিএনপি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার কথা বলছে। এই বিবেচনার কথা বললে, তাঁকে মুক্তিদানের বাধ্যবাধকতার রাজনীতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে এসেছে বলেই ধারণা করছি। দলীয় কর্মকাণ্ড, দলের প্রধান নেতৃত্বের ভাবমূর্তিসহ নানা প্রশ্নকে প্রাপ্য গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে হয়তো বিএনপি নতুন পথের সন্ধান করছে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ