জাতীয় পদককে বিতর্কিত করছে কারা?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:১৩, মার্চ ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২০, মার্চ ০১, ২০২০

আমীন আল রশীদআমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য যে, জাতীয় জীবনের কোনও কিছুই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকছে না। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারী রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঢুকে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনাও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে এসে এই দেশের মানুষকে দেখতে হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারটিও বিতর্কিত হলো। এর আগে হয়েছে একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়েও। খোদ স্বাধীনতাবিরোধীকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘটনাও এ দেশে ঘটেছে।
১৯৮০ সালে শিক্ষার জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার পান শর্ষিনার পীর আবু জাফর মো. সালেহ; মুক্তিযুদ্ধে যার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অভিযোগও পুরনো। মুক্তিযুদ্ধ স্মারকে সোনা জালিয়াতির কথাও দেশবাসী ভোলেনি। পৃথিবীর আর কোনও জাতি তাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গর্ব আর অহংকারের জিনিসগুলোকে এভাবে বিতর্কিত বা বিকৃত করে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদ নামে যে ব্যক্তিকে এবার সাহিত্যে স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত করা হলো, তিনি সদ্য সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে পারেননি, এরকম পদক তিনি পাবেন (বিডিনিউজ,২২ ফেব্রুয়ারি)। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদনে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এবং কবি অসীম সাহাও বলেছেন,কোনোভাবে জনাব রইজ উদ্দিন স্বাধীনতা পদকের যোগ্য নন।

এখন প্রশ্ন হলো, কোন যোগ্যতায় এবং কার বা কাদের তদবিরে এই ভদ্রলোক রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পেলেন? ব্যক্তিজীবনে রইজ উদ্দিন কেমন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে তার কী অবদান ছিল, তা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু যে কারণে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারটি দেওয়া হলো, অর্থাৎ সাহিত্যের জন্য, সেই ক্ষেত্রে তার অবদান কী? কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে দেশের কতজন মানুষ তার নামটি জানতেন?

সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার তোপটি যাচ্ছে মূলত রইজ উদ্দিনের দিকে। কিন্তু আশির দশকের একজন কবি লিখেছেন, ব্যক্তি রইজ উদ্দিন অত্যন্ত সৎ ও সজ্জন মানুষ। আমলা হলেও চাটুকারিতা জানতেন না বলে ডিসি হতে পারেননি। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায়, তিনি নিজে এই পুরস্কারের জন্য তদবির করেননি। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কারা তার নামটি বাছাই কমিটিকে দিয়েছিলেন এবং কেন দিয়েছিলেন? সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার মতো তার চেয়ে যোগ্য কেউ কি ছিলেন না? নাকি যোগ্যদের সবাইকে পুরস্কৃত করা হয়ে গেছে?

অস্বীকার করার উপায় নেই, এসব রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে রাজনৈতিক বিবেচনাটিই প্রধান। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের ঘরানার লোকদেরই এসব পুরস্কার দেয়। তাতে তিনি কবি হন আর বিজ্ঞানীই হন। এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু তারপরও বিজ্ঞান ও সাহিত্যে যারা পুরস্কৃত হন, আশা করা হয়, সরকার এখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে।

সরকারের বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ,জেলা প্রশাসক,সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধিদফতর/দফতর/সংস্থাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের বিষয় উল্লেখ করে সংযুক্তি ছক অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। এই পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিদের নামের প্রস্তাব বা মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মাধ্যমে প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা হবে। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের কথাও বলা আছে। এরপর প্রাথমিক বাছাই করে একটি তালিকা করা হবে। পদক কমিটির বৈঠকে এই তালিকা উঠবে। সেখান থেকে তালিকা যাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। তিনি এই তালিকায় সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবেন। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে তালিকাটি চূড়ান্ত হবে। এখন প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারের জন্য এই ধাপগুলো কি অনুসরণ করা হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে বাছাই কমিটিকে এই প্রশ্ন করতে হবে, তারা কীভাবে এমন একজন লেখককে সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর সুপারিশ করলেন?

অনেক অযোগ্য ও ‘অখ্যাত’ এমনকি ‘কুখ্যাত’ ব্যক্তি এসব রাষ্ট্রীয় পদক পেলেও অনেক যোগ্য ব্যক্তি এসব সম্মাননা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এমন অনেক ব্যক্তি স্বাধীনতা বা একুশে পদক পাননি। বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার কারা পান, কোন যোগ্যতায় পান, তা নিয়েও প্রশ্নের অন্ত নেই। কিন্তু স্বাধীনতা ও একুশে পদক—যা বাঙালির স্বাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই পুরস্কারগুলো বিতর্কিত করা কিংবা এর আগে রাজাকারের তালিকা নিয়ে যে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গেলো, সেগুলো স্যাবোটাজ নাকি এসবের পেছনে সুদূরপ্রসারী কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। অন্তত মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল যখন ক্ষমতায়, যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে স্বয়ং জাতির পিতার কন্যা, তখন আর যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোনও বিষয় নিয়ে ন্যূনতম কোনও বিতর্কের সুযোগ নেই। যদি কেউ সেটা করে, তাহলে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনাই একমাত্র কাজ। এই ইস্যুতে কোনও ধরনের আপসের সুযোগ নেই।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ