বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় নারী

Send
ফারজানা মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৪:২৮, মার্চ ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০২, মার্চ ২১, ২০২০

ফারজানা মাহমুদজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই আজীবন সংগ্রাম করেননি, তিনি বাঙালি নারীদের কীভাবে বৈষম্যহীন মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক ও সামাজিক অবকাঠামোতে সংযুক্ত করা যায়, সেই ব্যাপারেও সজাগ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে কারাগারে রাজবন্দি থাকাকালীন তাঁর রচিত স্মৃতিনির্ভর চীনের ভ্রমণকাহিনী যা অতি সম্প্রতি ‘আমার দেখা নয়াচীন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন চীনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের অবস্থান ও বাঙালি নারীদের সঙ্গে তাদের তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে নারীদের নিয়ে তাঁর ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে পূর্ববাংলা থেকে ‘পিস কনফারেন্স অব দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স’-এ যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু চীন ভ্রমণ করেন।  সেই সময় চীনকে নয়াচীন নামে অভিহিত করা হতো।  দীর্ঘ ২৫ দিনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি চীনের কৃষি, শিক্ষা, শিল্প ব্যবস্থাপনা এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে চীনা নারীদের অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চীনা নারীদের অংশগ্রহণ বঙ্গবন্ধুকে স্পষ্টতই প্রভাবিত করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর গৃহীত কিছু পদক্ষেপে স্পষ্টতর হয়েছে।

তদানীন্তন চীনে হতদরিদ্র নারীদের একাংশ জীবনের প্রয়োজনে পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে যায়, যা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু দরিদ্র নারীদের মর্মবেদনা উপলব্ধি করে লিখেছেন মানুষ যখন দারিদ্র্যে জর্জরিত হয়, খেতে পায় না তখন নারীরা কীভাবে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজেদের সম্ভ্রমকেও বিসর্জন দেন। চীনের সাংহাই শহরে মেয়েদের পতিতাবৃত্তিতে জড়ানোর তিনটি কারণ বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন—১. দারিদ্র্য ও ক্ষুধা ২. যৌতুক বা মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রপক্ষকে অর্থের জোগান দিতে না পারা ৩. প্রেমের প্রলোভনে প্রতারিত নারীদের প্রতি পরিবার ও সমাজের নিগ্রহ। দরিদ্র চীনা নারীদের অসৎ পথে যাওয়ার কারণগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ববাংলার হতদরিদ্র নারীদের সামাজিক অবস্থানের তুলনাও করেছেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে পূর্ববাংলার দরিদ্র নারীরা কীভাবে, মা-বাবা কিংবা স্বামী-সন্তানের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজেদের পতিতাবৃত্তিতে জড়াতে বাধ্য হন, তা বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করেছেন। দারিদ্র্যে জর্জরিত পরিবারের জন্য নারীদের এই আত্মত্যাগ তরুণ বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে যে দাগ কেটেছিল তা সন্দেহাতীত। বঙ্গবন্ধুর ভাবাবেগ ও হতদরিদ্র অসহায় নারীদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটিতে, যেখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন—‘যখন মা দেখে তার ছেলেমেয়ে কলিজার কলিজা না খেয়ে এবং বিনা ওষুধে আস্তে আস্তে কোলে বসে শুকিয়ে শুকিয়ে মারা যায়, অথচ একটু খাবার দিলেই তার কলিজার ধন বাঁচতে পারে, কিন্তু কোন উপায় নাই; ভিক্ষাও পাওয়া যায় না, তখন তার পক্ষে ইজ্জত দিয়ে খাবার জোগাড় করতে একটুও দ্বিধা হয় না’ (পৃ. ৯৬)। বঙ্গবন্ধু এখানে আরও পর্যালোচনা করেন এই সকল হতভাগ্য পতিতা নারীর পুনর্বাসনে রাষ্ট্রের দায় শুধু আইন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানবীয় ব্যবহারও খুবই জরুরি।

একই বইয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি নারীদের বিয়েতে যৌতুক প্রথার সমালোচনা করেছেন কঠোরভাবে। যৌতুক একটি ঘৃণ্য ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেছেন—‘আমি আমার দেশের মেয়েদের অনুরোধ করবো, যে ছেলে এইভাবে অর্থ চাইবে তাকে কোন মেয়েরই বিবাহ করা উচিৎ না’ (পৃ. ৯৭)। প্রকারান্তরে, বঙ্গবন্ধু যৌতুক প্রথা রুখে দিতে নারীদের এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বলেছেন, পাশাপাশি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হতে অনুপ্রাণিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বলেছেন—‘সময় থাকতে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা উচিৎ এবং আমাদের দেশের শিক্ষিত মেয়েদের এগিয়ে আসা উচিত’ (পৃ. ৯৭)।

নারীদের পারিবারিক জীবনে সম্মানজনক অবস্থানে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছেন, যৌতুক একটি মানবসৃষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল এবং এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রয়োজন। সামাজিক অবক্ষয়, নারীর প্রতি নির্যাতন ও বৈষ্যমের একটি বড় কারণ যৌতুক প্রথা উল্লেখ করে এটিকে নির্মূলে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও এগিয়ে আসতে হবে, তা অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু আরও বলেছেন—‘...কুপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমাদের মতো বহু যুবকের সাহায্যও তারা পাবে’ (পৃ. ৯৭)।

শুধু আইনের মাধ্যমেই যে কোনও দেশে অপরাধ দমন করা যায় না, তার জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ইচ্ছা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন, তা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও সহজ বর্ণনাই স্পষ্ট করে। বঙ্গবন্ধু বর্ণনা করেছেন—‘আইন করে কোন অন্যায় কাজ বন্ধ করা যায় না, অন্যায় বন্ধ করতে হলে চাই সুষ্ঠু সামাজিক কর্মপন্থা, অর্থনৈতিক সংস্কার ও নৈতিক পরিবর্তন’ (পৃ. ৯৮, ৯৯)।

এছাড়া সকল কাজে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের দিকটিও বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় যে সচল ছিল তার প্রতিচ্ছবিও আমরা পাই ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটিতে। নারীর স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে নারীকেও যে ভূমিকা রাখতে হবে, সকল কাজে সমানভাবে অংশ নিতে হবে তা অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন—‘স্বামী কাজ করবে আর স্ত্রী বসে বসে খাবে এ প্রথা চীন থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। আমি ট্রেন থেকে পুরুষ ও মেয়েলোক অনেককেই হাল চাষ করতে দেখেছি’ (পৃ. ৯০)।

চীনের অর্থনীতিতে নারীর অবদান বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কলকারখানা, সরকারি অফিস, ফ্যাক্টরি, কৃষি, শিক্ষাসহ সকলক্ষেত্রে চীনা নারীদের পদচারণা এবং অংশগ্রহণের কারণেই যে চীনের প্রভূত উন্নতি সম্ভব হয়েছিল তা তরুণ বঙ্গবন্ধু আত্মস্থ করতে পেরেই লিখেছেন—‘নয়াচীনের উন্নতির প্রধান কারণ পুরুষ ও মহিলা আজ সমানভাবে এগিয়ে এসেছে দেশের কাজে। সমানভবে সাড়া দিয়েছে জাতি গঠনমূলক কাজে। তাই জাতি আজ এগিয়ে চলেছে উন্নতির দিকে’ (পৃ. ১০১)।  নয়াচীন সরকারের বিভিন্ন বড় বড় পদে নারীদের অবস্থান বঙ্গবন্ধুকে উজ্জীবিত করেছিল নিঃসন্দেহে, তিনি চীনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাডাম লু, সহ-সভাপতি সান ইয়াৎ এর কথা তাই স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধাভরে (পৃ. ১০১)। বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করেছেন—‘তাই আজ নয়াচীনে সমস্ত চাকরিতে মেয়েরা ঢুকে পড়েছে। পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছে। প্রমাণ করে দিতেছে পুরুষ ও মেয়েদের খোদা সমান শক্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। সুযোগ পেলে তারাও বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক, ডাক্তার, যোদ্ধা সকল কিছুই হতে পারে’ (পৃ. ৯৯)। বাঙালি নারীদের জীবনমান, তাঁদের দারিদ্র্য, হতাশা বঙ্গবন্ধুকে পীড়িত করত বিধায় তিনি চীনা নারীদের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর স্মৃতিচারণে।

নারীর জীবনযুদ্ধের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যেমন সহমর্মিতা দেখিয়েছেন তেমনি তিনি নারীর ক্ষমতায়নে তাদের ইচ্ছাশক্তি, পুরুষের দায়িত্বের কথাও বারবার প্রকাশ করেছেন। নারী-পুরুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই যে নারীর ওপর অন্যায় অত্যাচার রোখা যায় তা ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান গভীরভাবে অবলোকন করেই বলেছেন—‘নয়াচীন পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার কায়েম হওয়াতে আজ পুরুষ জাতি অন্যায় ব্যবহার করতে পারে না নারী জাতির ওপর’ (পৃ. ৯৯)। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে যে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখলে কোনও জাতি যে অগ্রসর হতে পারে না তা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর নয়াচীন ভ্রমণের বর্ণনাতে চীনা নারীদের সঙ্গে পূর্ববাংলার নারীদের তুলনামূলক পর্যালোচনা তাঁর সেই উপলব্ধিরই প্রতিফলন।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির করে রাখার মানসিকতা যে নারীর উন্নয়নে বাধাস্বরূপ তা বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তিনি যে নারীদের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার তা বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন ও নারীর প্রতি তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনার মাধ্যমে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় অনুশাসন, ধর্মের অপব্যাখ্যা, কুসংস্কার যে নারীর উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার বিশদ বিবরণও দেখা যায় ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটিতে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ধর্মান্ধতার বেড়াজালে নারীর অধিকার কীভাবে ক্ষুণ্ন হয়। বহুবিবাহ প্রথার দিকে কটাক্ষ করে তিনি নারীর অধিকারকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় অনুশাসন ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা যে বাঙালি নারীদের প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখে তা বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন।  ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটিতে জাতির জনক  নির্যাতিতা, অসহায়, হতদরিদ্র নারীদের প্রতি যেমন সহমর্মিতা ও সম্মান দেখিয়েছেন, ঠিক একইভাবে তিনি শিক্ষিত, সফল ও সমাজে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত নারীদেরও সমান মর্যাদার সঙ্গেই তুলে ধরেছেন। তরুণ বঙ্গবন্ধুর নারীর প্রতি সহমর্মিতা, সমবেদনা, শ্রদ্ধা এবং সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি একজন মানবিক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার প্রতিচ্ছবিও বৈকি।

নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হলেই যে নারীদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার বন্ধ হয়, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় তা বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষ করেছিলেন চীনে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ গভীরভাবে তাঁর উপলব্ধিতে মিশে গিয়েছিল বলেই পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ববাংলার নারীদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব পর্যায়ে নারীদের সম অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও সংযোজন করা হয় (অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮)। অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য বিশেষ নীতিমালা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ারও রাখা হয় সংবিধানে। তৃতীয় বিশ্বের একটি নতুন স্বাধীন দেশ যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে গণজীবনে নারীর অংশগ্রহণের অধিকারকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়। সংবিধনের অনুচ্ছেদ ৬৫(৩)-এর মাধ্যমে ১৫টি সংরক্ষিত আসন রাখা হয় নারীদের জন্য। বঙ্গবন্ধুর তত্ত্বাবধানে গঠিত বাকশালে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে সম্মুখভাবে নিয়ে আসা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সম্ভ্রমহারা নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সমাজে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মানকে সমুন্নত করতে ২ লাখ নির্যাতিত নারীকে বীরাঙ্গনা খেতাবে ভূষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন, যা ১৯৭৪ সালে ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন এর স্বীকৃতি পায়।

মুসলিম নারীদের বৈবাহিক জীবন মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতে ১৯৭৪ সালে প্রণীত হয় ‘মুসলিম ম্যারেজ ও ডিভোর্স রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’, যার মাধ্যমে মুসলমান নারী-পুরুষের বিয়ে ও তালাকের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে নারীদের সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়। চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে ১০ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা রাখা হয়। নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে দুই জন নারীকে মন্ত্রিসভার সদস্য করে নেন এবং ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে একজন নারীকে নিয়োগ দেন তিনি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন দেশ গঠনে। নিশ্চিত করে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বহু আগেই বাঙালি নারীদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ক্ষমতায়নের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও সমান অধিকার নিশ্চিত হতো এবং আমরা একটি মানবিক, নারীবান্ধব সমাজ পেতাম, যেখানে বঙ্গবন্ধুর দেখা নয়া চীনের স্বাধীন এবং স্বনির্ভর নারীদের মতোই বাঙালি নারীরাও স্বমহিমায় প্রস্ফুটিত হতো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই গতিধারাকে অনেকটা সময় পর্যন্ত স্থবির করে দিলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাঙালি নারীরা আবারও বঙ্গবন্ধুর ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত, যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজ ও দেশ গঠনে নারীদের অংশগ্রহণ এবং অর্জিত সাফল্যে।

লেখক:  ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল', অ্যাডভোকেট, সুপ্রিমকোর্ট।  আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ