করোনার জন্য বিশ্ববাসী প্রস্তুত না থাকলেও ধরণী প্রতীক্ষায় ছিল

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫০, মার্চ ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৫, মার্চ ২৬, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীএপিডেমিকের অর্থ হচ্ছে মহামারি আর এটি অঞ্চলভিত্তিক হয়। করোনা কিন্তু এপিডেমিক নয়, করোনা হচ্ছে প্যানডেমিক অর্থাৎ বিশ্ব মহামারি। মানুষের অনাচারে যখন ধরণী অতিষ্ঠ হয়ে যায় তখন মানুষের ওপর প্রকৃতির রুষ্ট হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। ১৭৯৮ সালে ইতালীয় ধর্মযাজক এবং অর্থনীতিবিদ টমাস রর্বাট ম্যালথাস জনসংখ্যা নিয়ে An Essay on the principle of population নামে একটি থিউরি বা তত্ত্ব দেন, যা তার নাম অনুসারে অর্থনীতিতে ম্যালথাস-এর জনসংখ্যা তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব আমরা উচ্চ ক্লাসে পড়েছি। তিনিও প্রকৃতির প্রতিশোধের কথা বলেছেন।
মানুষ যদি পপুলেশনের বিষয়ে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে মানুষের জন্মের রাস টেনে না ধরে তবে প্রকৃতি তার বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একটার পর একটা বিপর্যয় তখন অবধারিত হয়ে যায়। এজন্যই বলেছি যে করোনার জন্য এই বিশ্ববাসী প্রস্তুত ছিল না কিন্তু ধরণী প্রতীক্ষায় ছিল। কারণ, মানুষের অনাচারে ধরণীর নাভিশ্বাস উঠেছে।
একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস গত তিন মাসে স্তব্ধ করে ফেলেছে গোটা বিশ্বকে। এই ভাইরাসটির আরম্ভ চীনের উহান প্রদেশের পশু মাংসের বাজার হুয়ানান সি ফুড মার্কেট থেকে। জীবাণুটা প্রথমে শ্বাসযন্ত্রকে আক্রমণ করে শরীরে ছড়ায়। প্রথম আক্রান্তের ৪১ জনের মধ্যে ২৭ জন এই বাজারে বারবার ঘোরাফেরা করেছে। উহানের এই বাজারটিতে মুরগি, ভেড়া, শূকর ইত্যাদির পাশাপাশি জঙ্গল থেকে ধরে আনা বিচিত্র প্রাণীও জীবন্ত অবস্থায় বিক্রি হতো। এখানে ভাইরাসটা কোনও এক প্রাণীর দেহ থেকে বিস্তার করেছে। করোনাভাইরাসের পছন্দের জায়গা হলো স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখি। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে কয়েক হাজার কোটি মুরগি, গরু, ভেড়া, ছাগল রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন খামারে। এই পশুগুলো কোনও না কোনোদিন আমাদের খাবার পাতে আসবে।
আমাদের দেশেও খামার আছে। মনে হয় আমাদের দেশের খামারগুলোতে জীবাণুনাশক কেমিক্যাল স্প্রে করা দরকার। সতর্কতা, সাবধানতা এই রোগের মূল চিকিৎসা। এই রোগের বিষয়ে কেউ কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এটা এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে প্রস্তুতি নেওয়ার অবকাশ পর্যন্ত দিচ্ছে না। সব মানুষ সচেতন হয়ে নিজেকে নিজে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সাহস করে বলে ফেলেছেন জার্মানির ৭০% লোক এই রোগে আক্রান্ত হবে অর্থাৎ নিজেরা নিজেদের সুরক্ষার প্রস্তুতি নাও।
দুনিয়া এমন মহামারিতে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। আমরা ছোট বয়সে দেখেছি স্থানীয়ভাবে কলেরা বসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। তখনও কিন্তু মানুষ নিজের সুরক্ষা নিজেরা করেছে। তখন কলেরা, বসন্তের প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। রোগীকে মানুষের সংস্পর্শ থেকে একঘরে করে রাখার ব্যবস্থা করতো। এখনও তা-ই প্রয়োজন হচ্ছে। রোগটি খুবই নির্মম। চিকিৎসকরা সাহস করছেন না রোগীকে চিকিৎসা প্রদানের জন্য। মৃতদেহের সৎকারের জন্য সাহস করছেন না প্রতিবেশী-স্বজনেরা। এখানে চিকিৎসা আর কোভিড-১৯ বিস্তাররোধে সরকারকে সাধারণ মানুষের দিকে খুবই মনোযোগী হতে হবে। সামান্যতম মনোযোগী হওয়ার কোনও অবকাশ নেই।
রোগাক্রান্ত মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে হবে। আর নিজের ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। সাধারণ মানুষ নিজের ব্যাপারে কী কী বিষয় এবং কোন কোন উপায় অবলম্বন করে চলবে সেই বিষয়ে প্রতিটি গণমাধ্যম ব্যাপক প্রচারের আয়োজন অব্যাহত রাখতে হবে।
এই রোগ দ্রুত যাবে কী যাবে না তা এখনও বলা মুশকিল। চৌদ্দশ’ খ্রিষ্টাব্দে আবির্ভাব হয়েছিল প্লেগ রোগের। তখন এই রোগটি দুনিয়ায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। সারা ইউরোপের মানুষ অর্ধেক মারা গিয়েছিল। তখন নাকি সারা ইউরোপে ছয় কোটি মানুষ মারা যায় আর সারা বিশ্বে তখন প্লেগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ কোটি। দুটি শতাব্দী লেগেছিল দুনিয়াতে প্লেগ পরবর্তী জনসংখ্যা ফিরে আসতে। ১৯১৮ সালের স্পেনিশ ফ্লুতে ৫ কোটির বেশি মানুষ মরেছিল। গত বছরের শেষের দিকে আমেরিকায় ফ্লুতে নাকি ২০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। চীন এবং আমেরিকার মাঝে করোনা নিয়ে বাগযুদ্ধে আমরা এই তথ্যটা পেয়েছি।
নবী নূহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে বিশ্বে একবার মহাপ্লাবন হয়েছিল। তাও হয়েছিল মানুষের অবাধ্যতার জন্য। এটির কথা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের ধর্মীয় সাহিত্যে লিপিবদ্ধ আছে। ভারতের হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থসমূহেও এমন প্লাবনের কথা পাওয়া যায়। এখনও একটা প্লাবন সম্ভবত আসার অপেক্ষায় রয়েছে মানুষের সৃষ্ট অনাচারের কারণে।
বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে গেছে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সেই সম্মিলিত সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেছিলেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ট্রাম্প নাকি বিশ্বাস করেন না মনুষ্যসৃষ্ট কোনও কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হতে পারে। অথচ আমেরিকা বায়ুমণ্ডলে উত্তাপ উদগীরণের অন্যতম কন্ট্রিবিউটর। এখন বিশ্বের এই উত্তাপের কারণে সুমেরু, কুমেরু, আন্টার্টিকায় বরফ গলা শুরু হয়েছে।  গ্রিনল্যান্ডেরও বরফ গলছে। সব বরফ গলে গেলে দৃশ্যত আরেকটি প্লাবনের সম্মুখীন হতে হবে।
যাক, করোনাভাইরাস নিয়ে সারা বিশ্ব কঠিন এক দুর্যোগের মধ্যে পড়েছে এখন। কর্মচঞ্চল মানুষের পক্ষে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয় আর দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকলে রুটি-রুজি নিয়ে দেশের ৭০% মানুষের তো মুশকিল হয়ে পড়বে। অথচ আপাতত ঘরে বসে থাকাই এই রোগের প্রতিষেধক। অবশ্য এরইমধ্যে কিছু কিছু দেশ প্রতিষেধক আবিষ্কারের দাবি করছে। কার্যকর প্রতিষেধক বাজারে আসলেই পরিত্রাণ। অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন ১৮ মাস সময় লাগবে। এত দীর্ঘ সময় লাগলে করোনায় মরবে শুধু তা নয়, দরিদ্র মানুষও অনাহারে মরবে।
আমাদের সরকারকে অনুরোধ করবো আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন যেন দীর্ঘমেয়াদি ও কম্প্রিহেনসিভ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন আইসোলেশন থাকলে গরিব মানুষের অবস্থা করুণ হয়ে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ মার্চ তার বক্তৃতায় বলেছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা দেওয়া হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ তহবিলের অর্থ দিয়ে কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে সরকার যা কিছু দেওয়ার কথা বলে দরিদ্র মানুষের হাতে আসার আগেই তা অন্যের পেটে চলে যায়- সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে। সরকারকে প্রয়োজনে শহরেও সাহায্য প্রদানের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।
হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে গেছে। কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এটি করোনা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হতে পারে কিন্তু এই মানুষদের সিংহভাগের এটি ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ, কর্মস্থল বন্ধ থাকায় মালিক তাদের থাকার জায়গা দিচ্ছে না। খাওয়ার সমস্যা। প্রয়োজনে উন্নয়নমূলক কাজের গতি মন্থর করে দিয়ে হলেও মানুষ বাঁচাতে হবে।
প্রস্তুত ছিল না বলে আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অক্ষম হচ্ছে। এখন প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপস্থিত থাকছেন না, অথচ কয়দিন আগেও বড় বড় কথা বলেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনও আমলে নেননি। বাংলাদেশে যেন এমন কিছু না হয়। আর অপ্রিয় হলেও একটা কথা বলে রাখা দরকার, আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সুনাম-সুখ্যাতি নেই। আপাতত তারা যেন তাদের অর্থলোলুপতা বন্ধ রাখেন। তাদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে যাতে বরাদ্দকৃত টাকা তছনছ না করে। ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে এই মন্ত্রণালয় পর্দা কিনেছে বলে পত্রিকায় এসেছে। অথচ তারা মানুষের জরুরি প্রয়োজনের প্রতি উদাসীন। এর বিচার নিশ্চয়ই একদিন হবে। গত তিন মাসে অনেক ভুল হয়ে গেছে, তা-ই যথেষ্ট। ভবিষ্যতে যেন আর কোনও ভুল না হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ