রানা প্লাজা ঘরে ঘরে

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৪:৫১, এপ্রিল ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৯, এপ্রিল ২৪, ২০২০

বিনয় দত্তবৈশাখের সকালগুলো বেশ মিষ্টিমধুর হয়। গাছেরা নতুন করে নিজেদের আবরণ মেলে পরিপক্ব হতে চায়। পাখিরা যে এই বৈশাখে বসে থাকে তা নয়। নিমন্ত্রণের ডালি সাজাতে থাকে। সাজতে থাকে প্রকৃতি। বৈশাখজুড়ে চলে এই আয়োজন। কখনও মানুষের, কখনও প্রকৃতির, কখনও পাখ-পাখালির। এইরকম এক আনন্দঘন বৈশাখে হঠাৎ সবকিছু স্থবির হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির সাজ সাজ রব কান্নার কোলাহলে চাপা পড়েছিল। গাছের সবুজ রঙ ফিকে হতে হতে রঙহীন হয়ে পড়েছিল। চারদিকে শুধু কান্নার রব। আর্তনাদ। চিৎকার। গুঞ্জন। কোলাহলে স্তব্ধ পুরো অঞ্চল।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, বুধবার, সকালবেলা। সাভার বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটি বহুতল ভবন। ভবনে প্রতিদিনকার নিয়মে শ্রমিকরা প্রবেশ করেন। সবাই নিজ নিজ জায়গায় চলে যান। পুরোদমে শুরু হয় কাজ। সঙ্গে থাকে গল্পের আমেজ। গল্পের আমেজ আর কাজের গতিকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ ভবনটি ধসে পড়ে। ভবনের নাম ছিল ‘রানা প্লাজা’।

এই একটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা, ঘৃণা, দুঃখ-কষ্ট, বেদনা আর হতাশা। আর জড়িয়ে ‘অনুভূতি’ নামক একটি শব্দ। ২৪ এপ্রিল আসলেই ‘রানা প্লাজা’ এবং ‘অনুভূতি’ মস্তিষ্কে তীব্রভাবে আঘাত করে! এই আঘাত শুধু আমাকে নয়, সবাইকে করে।

এখন ২০২০। ২০১৩ থেকে ২০২০। এই বিশাল সময়ে মালিকের মানসিকতায় কি পরিবর্তন এসেছে? তারা কি এখন শ্রমিকদের কথা ভাবে? প্রশ্নগুলো আপনাদের কাছে। এর উত্তর না জানলেও সমস্যা নেই।

২০১৩ থেকে ২০২০। এরমধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানার বিচার কাজ শেষ হয়নি। হয়তো হবে। এই দীর্ঘ সময়ে পোশাক শ্রমিকদের জীবনে খুব যে পরিবর্তন আসছে তা কিন্তু বলা যাবে না। পোশাক শ্রমিকরা দৈন্যদশা থেকে এখনও মুক্তি পাইনি। মুক্তি মেলেনি অন্ন আর বাসস্থানের অভাব থেকে। অর্থনৈতিক অভাব তাদের সঙ্গে সঙ্গেই  ছিল। সংকট তখনও ছিল, এখন তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে মানসিক চাপ। এই চাপ কৃত্রিম। তবে সার্বক্ষণিক।

চাপের নমুনা দেই। করোনাভাইরাসের এই মহামারি সময়ে অগণিত মানুষ মারা যাচ্ছে। আর পোশাক শ্রমিকদের চাকরি যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন কারখানা থেকে প্রায় ১০ হাজার পোশাক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন (বিজিআইডব্লিউএফ), বাংলাদেশ মুক্ত গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ফেডারেশন (বিআইজিইউএফ) এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তা নিশ্চিত করে। যদিও প্রধানমন্ত্রী করোনার সময় শ্রমিকদের ছাঁটাই করতে নিষেধ করেছেন। এরপরও মালিকেরা সেই নির্দেশ অমান্য করেছে। কেন? কারণ, তারা দেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেয়।

বাবার যে সন্তান সবচেয়ে বেশি আয় করে তার সব অন্যায় সবাই সহ্য করে। কারণ, সে সবচেয়ে বেশি আয় করে। সেই আয় আনতে বাকিদের যে নিরলস পরিশ্রম, ভালোবাসা জড়িত তা তার মনে থাকে না। যেমনটা মালিকদের নেই। মালিকদের ভাবনা, তারাই সব করছে। শ্রমিকরা কিছুই নয়।

এই সংকটে প্রায় দশ হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা কিন্তু সহজ নয়। দশ হাজার শুধু প্রকাশ করা হয়েছে আর যেটা প্রকাশ হয়নি তার সংখ্যা কি আমরা জানি? জানি না। সেই সংখ্যাও অজানা। চাকরি যাওয়ার চাপে বাকি পোশাক শ্রমিকরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন এইটাই স্বাভাবিক। একদিকে তাদের বেতন হওয়া নিয়ে শঙ্কা, আরেক দিকে চাকরি যাওয়ার ভয়।

চাকরি শুধু পোশাক শ্রমিক নয়, যেকোনও শ্রমিকই পছন্দ করেন। কারণ, চাকরির বেতনের ওপর নির্ভর করে সবকিছু। এই সুযোগটা মালিকরা সবসময় কাজে লাগায়। এই ভয়কে পুঁজি করে তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। এবং করেছও তাই।

২০২০ সালের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ভোগ করার শেষদিকে হঠাৎ করে গার্মেন্ট কারখানাগুলো ৫ এপ্রিল খুলবে এই ধরনের ম্যাসেজ শ্রমিকদের পাঠানো হয়। ৫ এপ্রিল কারখানায় না এলে চাকরি থাকবে না। এই মেসেজও তাদের দেওয়া হয়। শুরু হয় দৌড়।

জীবনের চেয়েও চাকরি বড়, এই মর্মে সবাই  দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অমানবিক কষ্ট সহ্য করে ঢাকায় ঢুকেছে। সেই দৃশ্য পুরো বাংলাদেশ কেন, পুরো বিশ্ব দেখেছে। প্রশ্ন হলো, মালিকরা এই কাজটা কেন করলো? যখন বারবার বলা হচ্ছে, করোনা সংক্রামক রোগ। সেই সময়, পোশাক শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে এসব তথ্যও প্রচার করা হতো। এসব কিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পোশাক মালিকরা শ্রমিকদের ডেকে আনলো। কারণ তাদের স্বার্থে।

এই পোশাক মালিকরাই শ্রমিকদের টেনে ঢাকায় আনলো আবার এই মালিকরাই তার আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে ‘আমরা শেষ’, ‘আমরা শেষ’ বলে আহাজারি করে বিশাল অংকের টাকা প্রণোদনা হিসেবে আদায় করলো। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, করোনা সংকটে প্রথম অর্থনৈতিক প্রণোদনা পেলো এই পোশাক খাত। কেন? কারণ, এই শিল্পের মালিকরা অত্যন্ত বলশালী। তাদের আত্মীয়ের অভাব নেই। সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, কারখানা বন্ধ হলে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবেন। তাই প্রধানমন্ত্রী সবার আগে তাদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন। অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি এই কাজটি করেছেন এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী লাখ লাখ শ্রমিকের কথা ভেবেছেন। তাই শুরুতেই তাদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে এসেছেন।

যদি করোনা সংকটে কারখানা চালু থাকতো এবং পোশাক শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ করতো, তবে কি মালিকরা এই প্রণোদনা আদায় করতো? যদি বাইরের দেশে পোশাক রফতানি সচল থাকতো এবং শুধু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কারণে কারখানা বন্ধ থাকতো, তাহলে মালিকরা কি শ্রমিকদের কথা ভাবতো?

২.

২৩ এপ্রিল ২০১৩। ঘটনার আগের দিন। সেদিন রানা প্লাজায় ফাটল নিশ্চিত হয়। সবাই ভবন ছাড়তে উদ্যত হলেও কারখানা সুপারভাইজার ভবনটিকে নিরাপদ ঘোষণা করেন। পরদিন অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল শ্রমিকদের কাজে আসতে বলা হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, সোহেল রানা নিজে কি এই ঘটনা জানতো না? অবশ্যই জানতো। সেই ভবনটি তো তার নিজের। কি ধরনের মালামাল দিয়ে ভবন তৈরি হয়েছে তা অবশ্যই সোহেল রানার জানা ছিল। তারপরও সে কেন ব্যবস্থা নেইনি? কারণ, পোশাক শ্রমিকরা কি মানুষ?

সোহেল রানা জানতো ভবন অনিরাপদ। তারপরও ভবন থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে নেয়নি। বর্তমান সময়ের মালিকরাও জানতো করোনার সময়ে কারখানা খোলাটাই ভয়ানক বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। তারপরও তাদের বাড়ি থেকে ডেকে এনেছে। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয়, শ্রমিকরা অমানবিক কষ্ট সহ্য করে ঢাকায় আসার পর বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক পোশাক মালিকদের অনুরোধ করছেন যেন কারখানা বন্ধ রাখে। এই 'নাটক'টা যে পরিকল্পিত তা সহজেই সবার কাছে ধরা পড়ে যায়। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এই নাটক? আমি মনে করি, তারা এটা করেছে কারণ সরকারের প্রণোদনা যেন দ্রুত তাদের কাছে আসে। সরকার যেন বিনাসুদে তাদের প্রণোদনা দেয়। মালিকদের যেন আরও প্রণোদনা দেয়। আমি অবাক হয়ে যাই, শ্রমিকদের জীবন তারা কীভাবে বাজি লাগিয়ে দেয় নিজেদের স্বার্থে। তাদের একটুও বুক কাঁপে না? তারা কি সত্যিই মানুষ?

যে রানা প্লাজা দিনের আলোয় ধসে পড়লো সেই ভবন ছিল অসংখ্য ত্রুটিতে ভরপুর। নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, নিম্নমানের পিলার, ফ্লোরে জেনারেটর স্থাপন, বয়লার আর ভারী মেশিন বসানো, অতিরিক্ত কাঁচামাল বহন, ধারণ ক্ষমতার বেশি কর্মী থাকাসহ অসংখ্য ত্রুটি ধরা পড়েছে রানা প্লাজা ধসের পর। এক রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় ১১০০-এর বেশি শ্রমিক মারা গিয়েছে। শুধু কী মৃত্যু? শ’খানেক শ্রমিকের খোঁজই মিলেনি। এরপর আরও শ’খানেক মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।

অ্যাকশন এইড’র ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, শ্রমিকদের মধ্যে ২০ দশমিক ৫ শতাংশের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ৫১ শতাংশ আহত শ্রমিক শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার কারণে কাজ করতে পারছে না। এত এত ক্ষয়ক্ষতির পরও মালিকদের মধ্যে বোধোদয় জাগ্রত হচ্ছে না? সত্যিই সেলুকাস।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এই আয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। দেশের শীর্ষ রফতানি আয় হয় পোশাক খাত থেকে। এত বড় একটা শিল্প, অথচ এই শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত নয় সরকার! বিশ্বাস করা যায়? অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি।

এই সত্য প্রকাশ করেছে ক্লিন ক্লোদস-সহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি শ্রমিক অধিকার সংগঠন। ২০১৯ সালে তারা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে সে দেশের সরকার এখনও একেবারেই প্রস্তুত নয়।

ক্লিন ক্লোদস, আন্তর্জাতিক লেবার রাইটস ফোরাম, মারকুইয়া সলিডারিটি ফোরাম এবং ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম এই চারটি সংগঠন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে শ্রমিকদের ওপর গবেষণা চালায়। সেই গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।

৩.

সুবোল চন্দ্র সাহা। একজন শ্রমিকবান্ধব পোশাক মালিক। করোনা সংকটে অনেকে কারখানা যখন ব্যয় কমাতে শ্রমিক ছাঁটাই করছে বা তাদের অর্ধেক বেতন দিচ্ছে তখন সুবোল চন্দ্র সাহা করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে ২৫ মার্চ থেকে কারখানাটি ছুটি করে দেন। শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন-ভাতার পাশাপাশি এপ্রিলের বেতন অগ্রিম দেন। শ্রমিকদের ঈদ বোনাস ও চাকরি না যাওয়ার নিশ্চয়তাও দেন।

সমস্যা হলো, সোহেল রানার মতো মালিকদের আধিপত্যে সুবোল চন্দ্র সাহারা হারিয়ে যান। সোহেল রানারা সব জেনেশুনেও শ্রমিকদের ভবনে ডেকে আনে। নিজেদের স্বার্থে করোনা সংকটে শ্রমিকদের ঢাকায় ডেকে আনে। এদের অমানবিক আচরণের কাছে শ্রমিকদের জীবন কিছুই না। শুধু রানা প্লাজা নয়, এরকম অসংখ্য রানা প্লাজা ধসে গেলেও মালিকরা তাদের অমানবিক আচরণে অটুট থাকবে। আর ঘরে ঘরে তৈরি হবে পরবর্তী সোহেল রানা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ