মানুষের পরিশোধন সম্ভব?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:৫২, এপ্রিল ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৪, এপ্রিল ২৫, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহকোভিড-১৯ এর চিকিৎসা নিয়ে আপাতত আর ভাবছি না। যেখানে স্বাস্থ্য কাঠামো বলে কোনও অবয়বই ছিল না, তার কাছে প্রত্যাশা করে কী হবে, আর সেই কাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেই কী ফল পাবো। এতটুকু সান্ত্বনা যে, আমাদের স্বাস্থ্যখাতের স্বাস্থ্য আসলেই যে ভালো নেই, এটি রোগাক্রান্ত একটি খাত, এ বিষয়ে সকলে প্রায় ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। অবস্থান বা কেদারার দিকে তাকিয়ে কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন না। আর সংখ্যাগরিষ্ঠই  দিবারাত্রি এ কথা চিৎকার করে বলে যাচ্ছেন। অতএব এই ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হবে, বিড়ম্বনা বইয়ে তারা চিকিৎসা পাবেন। চিকিৎসা পেয়ে বাড়ি ফিরবেন, কেউ হয়তো ফিরবে না। এটাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আপাতত বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরণ সংস্কৃতির কুৎসিত রূপ দেখা গেলো মহামারির এই সংকটকালে। সংকটে আমরা বুঝে নিতে পেরেছি দেশের স্বাস্থ্যখাত অতি দুর্বল উপকরণে তৈরি। এর ভেতরের কুঠরিগুলো একে অন্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। জানালা, দরজা এমনকি ঘুলঘুলিও নেই। যার মাধ্যমে ন্যূনতম সম্পর্ক তৈরি করারও কোনও সম্ভাবনা থাকে। কভিড-১৯ মহামারিকালে সেই সম্পর্কহীনতার ফল বইতে হলো সাধারণ ও কোভিড রোগীদের।

সংকট কোনও সময়ে স্থায়ী হয় না। মহামারি জয় করে স্বাভাবিক সময়ে ফিরবে পৃথিবী, ফিরবে বাংলাদেশও। সেই স্বাভাবিক সময়ে ফিরে গিয়ে কি মহামারিকালের স্মৃতি ভুলে যাবো? আমাদের অতীত অভ্যাস তাই বলে। আমরা দুর্যোগের অভিজ্ঞতাকে ভুলে গিয়ে আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠি। কোনও দুর্যোগ, মহামারি মানুষকে সংযমে ফেরাতে পারেনি। ফলে বারবার মানুষ লোভের পর্বতচূড়ায় উঠে গেছে পতনের নেশায়।

আমরা আবার পতিত হয়েছি। বাংলাদেশ একা নয়। পূর্ব-পশ্চিম সহযোগেই এই পতন হয়েছে। প্রকৃতি কিছু করেনি। শুধু একটু মুচকি হেসেছে। তাতেই বিশ্বের প্রায় দুইশ’ দেশের ২৮ লাখ মানুষ অদৃশ্য জীবাণুর শিকার হয়েছেন। প্রাণ গেছে দুই লাখ মানুষের। প্রকৃতি কখন সদয় হবে, কোভিড-১৯-এর সুতোয় টান দেবে, সেটি হয়তো তার মর্জির বিষয়। তবে প্রকৃতি বরাবরই দয়ার আধার। এবারও কৃপা দেখাবেন। সেই অপেক্ষাতেই আমরা আছি।

কিন্তু আমরা কি নিজেদের পরিশোধিত করতে পারবো, পরিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে যুক্ত করেছি? আচরণে তা মনে হচ্ছে না। প্রথমত স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য সরকারি নির্দেশনাকে মোটেও তোয়াক্কা করছি না। ধর্মীয় অন্ধত্ব দেখাচ্ছি। সৌদি আরবেও যখন জনসমাগম করে নামাজ আদায় নিষেধ করা হয়েছে, দেশে ইসলামী ফাউন্ডেশন ও আলেমরাও এবিষয়ে আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন, তারপরও শবেবরাত ও তারাবির নামাজ পড়তে আমরা মসজিদে ভিড় করছি। বাড়ির ছাদে জামাতের আয়োজন করছি। লকডাউন ভেঙে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ঢুকছি, বের হচ্ছি। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায়  না রেখে  বাজার হাটে ভিড় করছি। সুতরাং নিজেকে সংযমী রাখার কোনও দৃষ্টান্ত আমরা দেখাতে পারছি না। অনেকে বলতে পারেন নিম্ন আয়ের ও বিত্তহীন মানুষেরা কাজ ও খাবারের জন্য বেরিয়ে আসছে। একথাটি ঠিক নয়। নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি সচ্ছলরাও নানা ছুঁতোতে বেরিয়ে আসছেন পথে। অনেকটা শখের বশেই।

শুরু হলো সংযমের মাস রমজান। আসলে এবার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সংযম দেখানোর প্রয়োজনীয়তা ও তাগিদ এসেছিল ২৬ মার্চ থেকে। যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো। কর্মহীন হয়ে পড়লো অনেক দিননির্ভর শ্রমিক। এখন তো কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন করপোরেট শ্রমিকরাও। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বেতন হয়নি। কবে হবে অনিশ্চিত। বাসা ভাড়া, স্কুলের বেতন, ওষুধ, খাবারের খরচের চিন্তা, আতঙ্ক কোভিড-১৯ এর সংক্রমণকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সমাজের কিছু তরুণ ও পেশার মানুষ ত্রাণ ও অর্থ সাহায্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। তবে তাদের সাধ্যও সীমিত। কিছু শিল্পগোষ্ঠী দৃশ্যমান কিছু সাহায্য দেওয়ার মতো নিজেদের গুটি নিয়েছেন। সামর্থ্য আছে এমন পেশাজীবীদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। পেশাজীবীরা যদি নিজেদের পেশার অসচ্ছল মানুষের পাশেই গিয়ে দাঁড়ান এই মুহূর্তে, তাহলে এটিই হবে বড় সহায়তা। কিন্তু এই উদাহরণ বৃহত্তর অর্থে পেশাজীবীরা দেখাতে পারছেন না। বিচ্ছিন্নভাবে করছেন কেউ কেউ। উল্টো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং হাট বাজারে দেখতে পাচ্ছি ভোগের মচ্ছব। সংযমের কোনও লক্ষণ নেই। পাশের বিপন্ন মানুষের প্রতি নেই কোনও সহানুভূতি। সংযমের কোনও প্রদর্শন নেই। এই মহামারি যাদের সংযমে ফেরাতে পারছে না। সেই মানুষদের নিয়ে কীভাবে আমরা পরিশোধনের শপথ নেবো? কিন্তু পরিশোধিত হওয়া ছাড়া ‘মানুষ’ নামক প্রাণীর কাছে আর কোনও বিকল্প নেই।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ