বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো কি সম্ভব?

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৫৭, মে ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২০, মে ১৮, ২০২০

মামুন রশীদআপনাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' পড়েছেন বা সামাজিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে তার জীবনের প্রায় শেষ দিকে সৈনিকদের এক প্যারেডে তার বক্তব্য শুনেছেন। তার বই এবং বক্তব্যের প্রায় দুই জায়গাতেই তিনি বাঙালির সুবিধাবাদিতা, আপসকামিতা, শঠতা আর দুর্নীতির ব্যাপারে কিছুটা উহ্য এবং কিছুটা সরব, এমনকি তির্যক মন্তব্য করেছেন। বেশ আক্ষেপও করেছেন। এমনকি একসময় কিছুটা অসহায়ত্বের সুরও যেন উঠে এসেছে তার স্বরে। অনেকেই মনে করেন, এসব সুবিধাবাদী আর দুর্নীতিবাজরাই পরবর্তী সময় তার অন্তিমদশায় ইন্ধন জুগিয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বেশিরভাগ জনবিচ্ছিন্ন সরকার ‘কিছু লোককে পাইয়ে দেয়ার অর্থনীতিতে’ বিশ্বাস করে বলেই অনেক সময় নীরবে, অনেক সময় সরবে বেশ কিছু ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ তৈরি করে এবং এদের মূল লক্ষ্য থাকে টাকা-পয়সার লেনদেন। এসব সরকার প্রচুর অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করতে চায়। অবকাঠামোগত বিনিয়োগ মানে প্রত্যক্ষভাবে বেসরকারি খাত ও অর্থনীতিকে সহায়তা করা আর পরোক্ষভাবে বড় কন্ট্রাক্ট মানেই হচ্ছে বড় ঘুষের বা অর্থের লেনদেন।

'অনেকটা চেয়ে চেয়ে দেখার মতো', আমরা লক্ষ করেছি- বিকাশমান দেশগুলোতে সরকারগুলোর দায়বদ্ধতা ক্রমাগতভাবে কমছে। তবে দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি কমা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন সরকারে থাকতে পারছে, কারণ তারা স্বাভাবিকভাবে সন্ধি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে। আরেকটি গ্রুপ রয়েছে, যারা মনেই করে যে তাদের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে সরকার-সংশ্লিষ্টতা বা নৈকট্য। অনেক জোরের সঙ্গেই তারা মনে করেন, আমরা সরকারে রয়েছি, বেসরকারি খাতে যাইনি, উদ্যোক্তা হইনি, সরকারকে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। সরকারের পদবি, সরকারের নৈকট্য ব্যবহার করে আমাদের টাকা বানাতে হবে। এছাড়া আমাদের কোনও গত্যন্তর নেই।

আমরা মনে করেছিলাম সরকারে মেধাবী লোকদের যোগদানে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা অবশ্যই বাড়ানো উচিত। বর্তমান সরকার প্রায় তিনগুণ বেতন-ভাতা বাড়িয়েছেন। কিন্তু এরপরও কোনও দুর্নীতি কমেছে, এমনটা অনেকেই মনে করেন না। আমাদের আইসিটি উপদেষ্টা এমনকি সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমেই দুর্নীতি দূর করা সম্ভব, যেটি এখন বিশ্বস্বীকৃত পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারও কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মূল মূল জায়গায় হতে দেয়া হচ্ছে না। ভূমি নিবন্ধনে, আইন মন্ত্রণালয়, আদালতগুলোর কেস ডিসপোজাল ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগে রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলে আমরা অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবায়ন কথা অনুযায়ী হচ্ছে না। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন, এছাড়া আরও বেশ কিছু প্রকল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশ খানিকটা এগিয়েছে। তারপরও দুর্নীতি খুব একটা কমছে না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরম্পরায় ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যদি কোনও একটি প্রকল্পে বরাদ্দ থাকে ১ হাজার কোটি টাকা, সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনায় সে বরাদ্দ বেড়ে হয়ে গেছে অনেক অনেক গুণ। আমরা পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যয় বরাদ্দেও এটা দেখছি। এগুলোতে প্রাক্কলিত ব্যয় কত ছিল, আর এখন কত টাকা শুনতে পাচ্ছি। টেলিকম খাতে আমরা একটা জিনিস দেখতে পেয়েছি। সরকারি মালিকানাধীন টেলিকম কোম্পানিগুলো যেকোনও প্রযুক্তি কিংবা পণ্য ক্রয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকে। টেলিটকের গ্রাহক সংখ্যা খুব কম। কিন্তু টেলিটক কেনাকাটার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে। কেন এটা হয় তা সবারই বোধগম্য।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। এ জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রচুর টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে বড় হয়েছে ' অপচয়ের অর্থনীতি'। সরকারগুলো যথেচ্ছাচারী প্রকল্প পরিচালক, যারা নাকি দুর্বিনীত প্রকল্প পরিচালক, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা, তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আরেকটি হচ্ছে ‘পাইয়ে দেয়ার অর্থনীতি’, আমাদের যদি ক্ষমতায় থাকতে হয় কিংবা আমাদের যদি ক্ষমতায় আসতে হয়, তাহলে যেসব প্রেসার গ্রুপ রয়েছে, তাদের যদি খুশি না রাখতে পারি, তাহলে আমাদের অসুবিধা হবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধা রয়েছে, আবার অসুবিধাও রয়েছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বড় দেশ এখন এগিয়ে আসছে। ভারতীয় বা চীনা কোম্পানি যদি ঠিকাদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে তাহলে একটি জার্মান বা ব্রিটিশ কিংবা মার্কিন কোম্পানি কেন নয়। যার ফলে, যে বড় দেশগুলো আগে আমাদের ওপর গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য, জনগণের অধিকারকে সমন্বিতকরণে কিংবা মানবাধিকারকে উচ্চকিত করার জন্য চাপ দিত, তারা এখন যখন দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তখন এদের বেশি দৃষ্টি চলে গেছে নিজ দেশের কোম্পানিকে ব্যবসা পাইয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে। এর ফলে সাধারণভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক সুব্যবহার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


ক্রমাগত দুর্নীতির ফলে কী হয়? মানুষ হেরে যায়। সাধারণ মানুষ মনে করে আমার আত্মীয় যদি প্রকল্প পরিচালক না হয় তাহলে ছেলে চাকরি পাবে না। আমি যদি একটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে সুবিধা না দিতে পারি আমার ছেলেমেয়ে চাকরি পাবে না। যার ফলে সত্যিকার অর্থে সরকার যেটি চায়, মেধা লালন, মেধাকে আকর্ষণ করা, সেটি কিন্তু হচ্ছে না। এমনকি গরিব ছেলেটাও মনে করবে আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দেবো এ কারণে নয় যে আমি জনসেবা করবো, কারণ আমার কোনও উপায় নেই, আমার প্রচুর টাকার প্রয়োজন রয়েছে। এ টাকা কিন্তু ‘আন-আর্নড মানি’। দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ‘আন-আর্নড মানি’। এটি বৃহত্তর মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। যেকোনও ‘আন-আর্নড মানি’ যেটা আমি ডিজার্ভ করি না, সেটা একটা সমস্যা।

আরেকটি সমস্যা হলো সরকারকে ব্যবহার করে, রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে কোনও ধরনের অর্থপ্রাপ্তি, যা প্রকৃতপক্ষে গরিবের ক্ষতি করে। গরিব বঞ্চনার শিকার হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্র ও সরকার হচ্ছে গরিব মানুষের ত্রাণকর্তা। গরিব মানুষ মনে করে আমার সৃষ্টিকর্তার পরে রয়েছে রাষ্ট্র। অনেক ওয়েলফেয়ার স্টেটে আমরা দেখি সৃষ্টিকর্তার রূপ নিয়ে নিচে নেমে আসে সরকার। এ কারণে সাধারণ মানুষ যখন মনে করে এটা আমার সরকার নয়, প্রচুর বড় বড় প্রকল্প করার পরও যখন তারা মনে করে আমার কী লাভ, আমার ছেলে তো চাকরি পাচ্ছে না, আমি তো তিনবেলা খেতে পাচ্ছি না, তখন বিচ্ছিন্নতাবাদ-হতাশাবাদ তৈরি হয়। হতাশা ও ন্যায়সঙ্গত অপ্রাপ্তি সন্ত্রাসবাদের, বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়। যেকোনও সরকারের জন্য বিরাট একটি কাজ হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের স্বাধীনতার পর সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে, টেকসইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। দুর্নীতি রোধ করার জন্য যে ধরনের সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া দরকার, তা দেখা যায়নি।

আমাদের একদিকে নৈতিকতার স্খলন ঘটেছে, সত্যিকার ধর্মীয়বোধেরও স্খলন ঘটেছে, সামাজিক মূল্যবোধের স্খলন ঘটেছে। এটি হয়েছে দুর্নীতি ও দুষ্ট পুঁজির মধ্যে ব্যাপক ‘সখ্য’ হয়ে যাওয়ায়। সরকার, রাষ্ট্র ও দুর্বিনীত পুঁজির ‘অনৈতিক সখ্য’ ঘটেছে। এ ‘অনৈতিক সখ্য’ কোনও দিনও গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে না।

করোনাকালে যেন কিছুটা ব্যতিক্রমও দেখতে পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই যেন সম্ভাব্য দুর্নীতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। উনার ভেতরে ভেতরে হয়তো কষ্ট হয়েছে, তার পরেও মাঠপর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণকাজ তদারকি বা বিতরণ থেকে দূরে রেখেছেন। এমনকি বেশ কিছু জনপ্রতিনিধিকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্তও করা হয়েছে। উচ্চপদে আসীন সরকারি কর্মকর্তারাও নিজ নিজ এলাকার সাধারণ জনগণের সেবার বা অন্তত তদারকির একটা সুযোগ পেয়েছেন। সামরিক বাহিনী তো আছেই, এমনকি পুলিশ বাহিনীও যেন তাদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে অনেক বেশি সচেতন। তারপরেও মানুষ কেন জানি আশ্বস্ত হতে পারছেন না। সবারই প্রশ্ন- দুর্নীতি কি কমানো সম্ভব। গরিব তার ন্যায্য পাওনা পাবে তো? রাষ্ট্র কি দিবে তার নিশ্চয়তা?

নাকি পরিশেষে আমরা আবার বলে উঠবো- 'পারলে না রুমকি'?

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ