এমন নিরানন্দ ঈদ যেন আর না আসে

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১০:৩২, মে ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৯, মে ২৫, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকারপ্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশের মানুষ যখন দিশেহারা, স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় বিপন্ন কোটি কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে সরকারের যখন নাভিশ্বাস উঠছে, দেশের অর্থনীতি যখন চরম দুর্দশায়, তখন আরেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ–সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলো অসংখ্য মানুষের জীবন ও সম্পদ। ২০ মে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে আম্পানের তাণ্ডবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার পুরো হিসাব বের করতে একটু সময় লাগবে। তবে প্রাথমিকভাবে যতটুকু জানা যাচ্ছে তা-ই বা কম কী!

আগে থেকে সরকারের নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায়, প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়ায় প্রাণহানির ঘটনা কম হলেও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায়নি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আম্পানের কারণে বিভিন্ন জেলায় কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। কমপক্ষে ২৬টি জেলায় নানামাত্রার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, বরগুনা পটুয়াখালী ও ভোলা জেলায়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এসব এলাকায় অনেক বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। কিছু কিছু জায়গায় মাঠের ধান আগেই কাটা হয়েছিল বলে ধানের ক্ষতি বেশি হয়নি। তবে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ২১ মে বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, সারা দেশে এক লাখ ৭৬ হাজার সাত হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে এখনও কানভার্ট করা হয়নি। ধারণার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ কম বলে তিনি জানিয়েছেন। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে কৃষকদের ক্ষতি পোষানোর ব্যবস্থা করা হবে, তাদের প্রণোদনা দেওয়া হবে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান একই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আম্পানে মোট ২৬টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জানিয়াছেন, প্রাণিসম্পদ, পানিসম্পদ, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক যে হিসাব দিয়েছে তা প্রায় এক হাজার একশ কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অনেক জায়গায় ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। চিংড়ি খামারিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আম, লিচু, কলা, সবজি, পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। অনেকের ঘরের চাল উড়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেসে গেছে গৃহস্থালি সরঞ্জাম এবং খাদ্যসামগ্রী। স্কুলঘরের চাল উড়ে গেছে, দেয়াল ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় টিউবঅয়েল ডুবে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট হবে। কোথাও কোথাও বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গেছে, তার ছিঁড়ে গেছে। বিদ্যুৎহীন হয়েছেন সোয়া দুই কোটি গ্রাহক। এমন কত ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা ধীরে ধীরে জানা যাবে।

এবারও বুক দিয়ে আম্পানের ক্রোধ দমনের প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করেছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের প্রতি আমরা মানুষেরা সদয় না হলেও সুন্দরবন আমাদের বিপদের সময় মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও আমাদের রক্ষা করতে ভুল করে না।

আম্পানের তাণ্ডবে সুন্দরবনের গাছপালা, প্রাণিবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি কী পরিমাণ হলো সেটাও নিরূপণ করা দরকার। দুর্যোগকালে যে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রাচীরের ভূমিকা পালন করে সেই মানবহিতৈষী সুন্দরবনের ক্ষতি হয়, এমন যেকোনও উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার বিষয়টি আবার জরুরিভাবেই সামনে এসেছে।

আম্পানে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দুর্যোগ কবলিত জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, পানিবন্দি মানুষের সুরক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতে শেখ হাসিনার সরকার এবং আওয়ামী লীগ আপনাদের পাশে রয়েছে। মনে রাখবেন, আপনারা একা নন, শেখ হাসিনার মতো দরদী ও দক্ষ নেতৃত্ব আপনাদের সঙ্গে আছেন সার্বক্ষণিকভাবে’।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জনগণের সক্ষমতা রয়েছে। অসংখ্য বড় বড় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা মোকাবিলা করে এসেছেন বাংলাদেশের মানুষ। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনেরও দক্ষতা বেড়েছে। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ীই প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনিবার্যভাবেই আঘাত হানবে। কম হোক, বেশি হোক ক্ষয়ক্ষতি হবেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মানবিক মন ও যেকোনও পরিস্থিতিতে সাহসের সঙ্গে দুর্গত মানুষের পাশে আছেন, থাকেন– এটা এখন সবাই বুঝলেও একটি শঙ্কা অনেকের মনে কাজ করে, আর সেটা হলো শেখ হাসিনার সঙ্গে যারা আছেন, তার হয়ে যারা কাজ করেন, তারা সবাই সৎ মানুষ নন। কিছু অসৎ সহযোগীর জন্যই শেখ হাসিনার ভালো উদ্যোগও সমালোচনার কাসুন্দিমুক্ত থাকে না। আম্পান-পরবর্তী সাহায্য-সহযোগিতা বিলিবণ্টনে কোনও ধরনের নয়ছয় না হলেই মানুষ সরকারকে বাহবা দেবে।
দুই.
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের অভিজ্ঞতা আমাদের থাকলেও প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসের মুখোমুখি হয়ে আমরা বেসামাল হয়ে পড়েছি। আবহাওয়া দফতর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা সংকেত দেওয়া হয়, কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র, কীভাবে যেতে হবে, কারা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করবে– এসব আগে থেকেই ঠিক করা যায়। কিন্তু করোনাভাইরাস একেবারেই অতর্কিতে এসে মানব দেহে মৃত্যুপরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়। কখন, কীভাবে কাকে এই ভাইরাস ঘায়েল করবে তা আগে বোঝা যায় না বলে একে প্রতিরোধ করা কঠিন। করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগাম যেসব সতর্কতা (সঙ্গনিরোধ, বিচ্ছিন্ন থাকা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘরে থাকা, সাবান পানিতে ঘন ঘন হাত ধোয়া, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে মাস্ক ব্যবহার করা, ইত্যাদি) অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তা প্রতিপালনে আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে প্রবল অনীহা দেখা গেছে।
সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে আমরা সমালোচনামুখর, কিন্তু নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আমরা একেবারই উদাসীন। আমরা সেধে বিপদ ঘরে ডেকে এনে তারপর হাহাকার করি, কেন আমার বিপদ হলো? জীবন আগে, না জীবিকা আগে– এমন তাত্ত্বিক বিতর্ক সামনে এনে আমরা ঘরে থাকার বিধি শিথিল করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করি, সরকারের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে থাকে বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপ (তাদের লক্ষ, এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই)– সব মিলিয়ে এখন ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’ অবস্থা। প্রতিদিন করোনা-আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। ঈদের আগে বাজার করা এবং ঘরে ফেরার যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছে তা থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটবে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। জোড়াতালি দিয়ে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। করোনার ভয়ে সব জবুথুবু হয়ে পড়ায় অন্য রোগীরাও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে একদিকে ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসাকর্মীরা করোনা-আক্রান্ত হচ্ছেন, মৃত্যুবরণ করছেন, অন্যদিকে এই মারাত্মক দুঃসময়ে কিছু সংখ্যক চিকিৎসক কিছুটা গুটিয়ে থাকায় অনেক মানুষের মনে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার অভাব, সমন্বয়ের অভাব, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে উদ্যোগহীন হওয়ায় স্বাস্থ্য খাত এক জটিল বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ অবস্থায় করোনা রোগীর সংখ্যা যদি দ্রুত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় তাহলে তাদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হবে, কান্নার রোল বাতাস ভারী করে তুলবে।
এক ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে এবার ঈদ উদযাপন করছে দেশের মানুষ। এমন নিরানন্দ পরিবেশে ঈদ উদযাপনের নজির খুব কম। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার ভয় ও আতঙ্কের মধ্য ঈদ উদযাপন হয়েছিল। তবে এবারের অবস্থা সব দিক থেকেই আলাদা। প্রকাশ্য ঈদ জামাত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো এই নিষেধাজ্ঞা মানবেন না, যেমন মানেনি ঢাকা ছাড়া বা ঢাকা ফেরার ক্ষেত্রে। অনেকে হয়তো জামাতেও যাবে না। বেঁচে থাকলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা কিংবা আনন্দের সঙ্গে খোলা মনে একে অপরের সঙ্গে জামাত শেষে কোলাকুলি, গলাগলি, করমর্দন সবই করার সুযোগ পাওয়া যাবে। মানুষ এখন ধর্ম পালন করছেন যার যার মতো করে। রোজা রেখেছেন, নামাজ পড়ছেন, কোরআন পড়ছেন, সেহরি, ইফতার করেছেন, কিন্তু সবই সীমিতভাবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে। আনন্দ উদযাপন তো একা করা যায় না। বলা হয়ে থাকে, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। আনন্দ সঙ্গোপনে হয় না। আনন্দের প্রকাশ থাকতে হয়। তার জন্য একাধিক মানুষের জমায়েত, সমাবেশ অপরিহার্য। এবার সেটা হচ্ছে না। এবার আমরা বাধ্য হয়ে, নিরুপায় হয়ে শামুকের মতো নিজের ঘরের পরিচিত চৌহদ্দির খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছি। এটা একেবারেই সাময়িক ব্যবস্থা। করোনার বিস্তার রোধের প্রাথমিক উপায়।
ভবিষ্যতে আর কোনও ঈদ বা অন্য কোনও ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসব যেন এমন নিরানন্দ পরিবেশে করতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই এবারের ঈদটা রোজার সংযমের মতো ঘরে ঘরে উদযাপন হোক। এতে নিশ্চয়ই ধর্মের কোনও বড় খেলাপ হবে না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ