সাহেদ-সাবরিনা প্রমাণ করে ‘শুদ্ধি অভিযানের‘ অশুদ্ধতা

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:০৫, জুলাই ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৯, জুলাই ১৭, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানসম্রাট আর জি কে শামীমের নাম এখনও স্মৃতিতে আছে আমাদের, তবে আমরা অনেকেই খোঁজ রাখি না, তারা কোথায় আছে? কেমন আছে? চাঞ্চল্যকর সংবাদের ‘উর্বর ভূমি’ এই দেশ, তাই একের পর এক চাঞ্চল্যকর খবর এসে আমাদের ভুলিয়ে দেয় আগেরটি। ওই আলোচিত ঘটনার পর যখন পাপিয়া কাণ্ড হলো, তারপর যখন সাম্প্রতিক সাহেদ কাণ্ড হলো তখন আমার বারবার মনে পড়েছে সম্রাট আর জি কে শামীমের কথা। কেন, সেই প্রসঙ্গে আসছি একটু পরে।
সম্প্রতি তুমুল আলোড়ন তোলা রিজেন্ট হাসপাতাল আর এর মালিক সাহেদ এখন আলোচনায় আছে। রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কী বলা হবে, সেটার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম আমি। পরে তা-ই ঘটলো। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাৎক্ষণিকভাবেই বললেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু’।
দিন কয়েক আগে একটা টিভি চ্যানেলের টকশোতে আমার সহ-আলোচক হিসেবে ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনিও যথারীতি এটাকে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান বলে দাবি করেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন যেন আমি সরকারের এই ‘ভালো’ কাজের প্রশংসা করি। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তার এই মন্তব্যের ব্যাপারে আমার বক্তব্য জানতে চান- আমি আসলেই বিশ্বাস করি কিনা, এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর দেশের সব সেক্টরে নানা রকম দুর্নীতির সংবাদ আমাদের সামনে নিয়মিত আসতে থাকে। যে ভৌত অবকাঠামো তৈরিকে উন্নয়ন বলে আমাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে ক্ষমতাসীন দল, সেই ভৌত অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে একের পর এক ভয়ঙ্কর দুর্নীতির সংবাদ আমাদের সামনে এসেছে। এখন যেহেতু করোনাকাল, তাই স্বাস্থ্য কিংবা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বেশি আলোচনায় আসছে।
তবে অনেকের কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে করোনার সময় যখন দেশের জনগণ এবং মিডিয়ার মনোযোগ এই দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের ওপরে অনেক বেশি নিবদ্ধ, তখন পর্যন্ত এই মন্ত্রণালয়গুলোর দুর্নীতি কমেনি; বরং এই সময় যেহেতু এসব মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেড়েছে, তাই দুর্নীতিও বেড়েছে অনেক। মিডিয়ার চোখও এদের আদৌ নিবৃত্ত করতে পারেনি; দুর্নীতিবাজরা এতটাই বেপরোয়া।
আসা যাক আমাকে টকশোতে করা সেই প্রশ্নটায়- সাহেদকে গ্রেফতার করাকে আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান বলে মনে করি কিনা। উত্তর হচ্ছে ‘না’। আমরা যখন দেখি স্বাস্থ্য খাতে ঠিক একই রকম আরেকটা দুর্নীতি, পরীক্ষা না করে ভুয়া করোনা সনদ দেওয়া আরেকটা প্রতিষ্ঠান জেকেজির সিইও-সহ ৬ কর্মচারী গ্রেফতার হলেও বেশ কিছু দিন দিব্যি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন ডা. সাবরিনা আরিফ, তখন শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন জাগবেই। নিয়মের চরম লঙ্ঘন করে একটি সরকারি হাসপাতালের রেজিস্ট্রার হয়েও তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপারসন ছিলেন এবং সেই প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে ব্যবসায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। তারপর তো করেছেন বীভৎস প্রতারণা।
মূলধারার মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে এই গ্রেফতার হওয়া নিয়ে যখন তুলকালাম কাণ্ড ঘটতে থাকে তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয় কয়েকদিন আগে।
আরও উদাহরণ দেওয়া যাক। করোনা শুরু হওয়ার প্রথম দিকে যখন ভুয়া এন৯৫ মাস্ক সরবরাহ করার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন দুটো হাসপাতালের পরিচালক, তখন তাদের বদলি এবং ওএসডি করা হয়েছিল। কিন্তু আত্মস্বীকৃত জেএম‌আই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুদকে ডাকা ছাড়া কোনও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এখনও। দুদকে ডাকা মানে কী, সেটা আমরা এখন খুব ভালোভাবে জানি।
সাহেদ কাণ্ডের আগে করোনার মধ্যেই বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। যাতে বাজার মূল্যের চাইতে তিন-চারগুণ পর্যন্ত বেশি দামে মাস্ক, পিপিই, গগলস, বুট কেনার চেষ্টা হয়েছে। এছাড়াও অবিশ্বাস্য খরচ দেখানো হয়েছিল আরও কয়েকটা জায়গায়। মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের খরচ ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি ডাটাবেজ তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এই ভয়ঙ্কর লুটপাটের প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির খুব আলোচনায় এসেছিলেন। পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।
দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ১৮ এপ্রিল ৫০ হাজার কেএন৯৫ মাস্ক সরবরাহের জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশ দেয় কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। প্রথম দফায় ভুয়া মাস্ক সরবরাহের পর জাল-জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়লেও প্রথম দিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর নীরব ভূমিকা পালন করে। বিষয়টি ফাঁস হলে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনেকটা গোপনে মামলা করে নিজেদের দায় সারে ঔষধ প্রশাসন। এরপর থেকে পুলিশ আমিনুলকে খুঁজছে, কিন্তু তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। না পাওয়ার কারণ জানে এই দেশের মানুষ (১০ জুন, দৈনিক  যুগান্তর)।
আমিনুলের গ্রেফতার না হওয়া নিয়ে আমাদের মিডিয়া খুব বেশি ফলোআপ নিউজ না করলেও মিডিয়ায় খুবই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাহেদের গ্রেফতার না হওয়া। অনেকেই খুব অবাক হয়ে ভেবেছেন, তিনি আদৌ গ্রেফতার হবেন তো? অবশেষে গ্রেফতার হলেন।
সাহেদের যেসব ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বোঝা যায় সমাজের সব স্তরের প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার তোলা ছবিগুলোতে প্রভাবশালী মানুষদের শারীরিক ভঙ্গি ওই মানুষগুলোর সঙ্গে তার যথেষ্ট ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। সে কারণেই মানুষের মনে সন্দেহ ছিল। তবে যেহেতু মূলধারার এবং সামাজিক মিডিয়া এই ব্যাপারে প্রচণ্ড চাপ জারি রাখতে সক্ষম ছিল, তাই দেরি হলেও সাহেদ গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গ্রেফতার হলেই বা কী?
এসব মানুষ গ্রেফতার হলে কী হয়, সেটা বোঝার জন্য আমরা এবার ফিরে আসবো সম্রাট আর জিকে শামীমের বর্তমান অবস্থা জানতে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা মাসখানেক আগে রিপোর্ট করে জানায় তার আগের দুই মাস ধরে এই দুইজন হাসপাতালের কেবিনে আরাম-আয়েশে বসবাস করছেন। কী ধরনের অসুস্থতা নিয়ে তারা সেখানে আছেন সেটা দেখলে বাংলাদেশ বলেই আমরা আর অবাক হই না, না হলে এটা আমাদের স্তম্ভিত করে দিতো।
সম্রাট দুই মাস ধরে হাসপাতালে বসে আছেন তার অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের কারণে। যে কেউ খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন এরকম একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন, ডাক্তারি ভাষায় যাকে ‘অ্যারিদমিয়া’ বলে, সেটা নিয়ে মাসের পর মাস হাসপাতালে বসে থাকতে হয় কিনা। জিকে শামীমের হাসপাতালে থাকার কারণ আরও চমকপ্রদ। তার হাতে কোনও একটা অ্যাক্সিডেন্টের পরে মেটাল প্লেট  বসানো হয়েছে, যেটায় ব্যথা হওয়ার কারণে তিনি হাসপাতালে গেছেন। এর চিকিৎসা হচ্ছে সেই প্লেটটিও অপসারণ করা। মাসের পর মাস সেখানে শামীম থাকলেও ডাক্তাররা প্রতিদিন তার প্লেট অপারেশনের অনুমতি চাইলেও শামীম সেটা দিচ্ছেন না। কিন্তু তিনি হাসপাতালে আছেন।
কয়েক মাস আগে আমরা এই খবরও দেখেছি ক্যাসিনো কাণ্ডে অভিযুক্ত অনেকেই জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। জি কে শামীমও থাকতে পারতেন এই তালিকায়, যদি মিডিয়া ‘বেরসিকে’র মতো বাগড়া না দিতো। ৭ মার্চ জানা গিয়েছিল এক মাস আগেই মোট চারটি মামলা দুটিতে জি কে শামীম হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন। এরপর এটা নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে সেই জামিন হাইকোর্ট বাতিল করে এবং জানায় ‘নাম বিভ্রাট’-এর কারণে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছিল, যদিও শামীমের আইনজীবী দৃঢ়ভাবে সেটা অস্বীকার করেন। এটা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘‘নাম বিভ্রাট’ করে যেভাবে জামিন নেন জি কে শামীম’ শিরোনামে একটা রিপোর্টও হয়েছিল।
এই যে তথাকথিত প্রভাবশালীদের যদি কখনও দলের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ কিংবা অন্য কোনও কারণে গ্রেফতার করতেই হয়, তার সুখকর শেষ পরিণতিও আমরা এই দেশে বসে দেখি। এমন একটা অভিজ্ঞতা সাহেদের‌ও‌ আছে। ২০১১ সালে যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটিই রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখন সাহেদ একটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির প্রতারণার মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা (কোনও কোনও পত্রিকায় ১০০ কোটি বলা হয়েছে) মেরে দেন। জেলেও যেতে হয় তাকে। অবশ্য কয়েক মাস পরই বেরিয়ে আসেন তিনি এবং সেই টাকা তিনি হজম করে ফেলেন। একজন দাগি আসামি এরপর সমাজে অচ্ছুৎ হয়ে থাকার কথা, কিন্তু না, এটা দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বাংলাদেশ, তাই বেরিয়ে আসার পর তিনি চমৎকারভাবে মিশে যেতে পেরেছিলেন এই দেশের সব ক্ষেত্রের সব ক্ষমতাশালী মানুষের সঙ্গে।
তবু সে দিব্যি আরাম-আয়েশে থাকে, এবং পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে বেরিয়ে আসে, তাহলে মানুষের কাছে এসব শুদ্ধি অভিযান কি আদৌ কোনও গুরুত্ব তৈরি করতে পারে? মানুষ স্পষ্টভাবে বুঝে যায়, শুদ্ধি অভিযানটি ভয়ঙ্করভাবে অশুদ্ধ।
গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি ঘটনাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে, এরপর গ্রেফতার হয় ক্যাসিনো কাণ্ডের সময় সম্রাট জি কে শামীম এবং কিছু দিন পর পাপিয়া। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে মো. সাহেদ। এই মানুষগুলো সরকারকে এক ধরনের সুবিধা দিয়েছে। চারদিকে দুর্নীতির মধ্যে ‘সরকার এমনকি তার নিজের লোকদের‌ও দুর্নীতির অভিযোগে ছাড়ছে না’- এমন একটা প্রোপাগান্ডা তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে। এর বেশি কিছু না।
এই আলোচনায় আমি যা যা বলার চেষ্টা করেছি, তার সবকিছুই এই দেশের মানুষ এখন জানেন, বোঝেন। কথাগুলো আবার মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম শুধু। এই দেশের সব মানুষের মতো আমিও জানি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকারের আদৌ কোনও সদিচ্ছা নেই। ছিল না কোনোকালেই।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ