একজন শেখ কামাল

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৫৫, আগস্ট ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০১, আগস্ট ০৫, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজামানুষের মতো মানুষরা হারিয়ে যান না। শেখ কামালও হারিয়ে যাননি। বেঁচে থাকলে একাত্তরে রণাঙ্গনের এই যোদ্ধার বয়স হতো একাত্তর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ক্রীড়া সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ কামাল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে মাত্র ২৬ বছর বয়সে পিতা মুজিব ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ মানবতার ঘৃণ্য শত্রুদের নির্মম-নিষ্ঠুর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হন শেখ কামাল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে পরিবারকে সময় দিতে পেরেছেন খুব কম। বলতে গেলে তার পরিবার বঞ্চিতই থেকেছে বেশি। দেশ ও জনগণকে ভালোবাসার জন্য নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে যেভাবে ছেড়ে থেকেছেন তিনি তেমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সেরা বিপ্লবী ও নেতারাই কেবল রেখে গেছেন। তবে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো, সেই নেতাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ত্যাগকে অনেক সময়ই বিতর্কিত করার হীন ষড়যন্ত্র সবসময় হয়েছে, অপপ্রচার চালানো হয়েছে যা বহু মানুষ বিশ্বাসও করেছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করে না, বছরের পর বছর সেই মিথ্যার ঢোল বা বাজনা বাজানো হয়েছে।

শেখ কামাল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান, ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বহুমাত্রিক অনন্য সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী, বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনের শিক্ষার অন্যতম উৎসমুখ ‘ছায়ানট’-এর সেতার বাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল তার। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠন বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সে সময়ের জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠীরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।

১৯৭৫-এর পর শেখ কামালকে নিয়ে যত অপপ্রচার সামরিক শাসকদের পদলেহী মিডিয়া ও আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক মহল করেছে, তাদের কাছে একবারও প্রশ্ন রাখা হয়নি এদেশের কয়টা প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এমনকি উচ্চপদের আমলার সন্তানকে এমন নিবিড়ভাবে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে জড়িত থাকতে দেখেছেন। 

রাজনীতিক বাবার সন্তান শেখ কামাল কোনও শর্টকাট পথে উপরে যাওয়ার পথ দেখেননি বা দেখতে চাননি। মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসির দায়িত্ব পালন করেছেন। চাইলে এই পথে তিনি সেনাবাহিনীতে গিয়ে নিশ্চিত জীবন-যাপন করতে পারতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর শেখ কামাল সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন।

ছাত্র রাজনীতিতেও তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একজন সদস্য হিসেবে নেতাদের নেতৃত্বে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, ছাত্রও ভালো, ক্লাসে প্রথম সারিতে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিক্ষকের কথা শুনবেন এমনটা ছিলেন না তিনি। বরাবরই তাগিদ ছিল তার ভিন্ন কিছু করার।

আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু যারা তার সমসাময়িক ছিলেন তাদের অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে। তাদের কাছে শুনতে শুনতে আমার কেবলই মনে হয়েছে, এই একজন আসলে গড়পড়তা মানুষ ছিলেন না। মনে হয়েছে, এই বিশুদ্ধ মানুষটি সাধারণ মানুষের এক স্তর উঁচুতে। একজন অসহনীয় সৎ মানুষ ক্রীড়া আর সংস্কৃতিকে ভালোবেসে গেছেন আজীবন। এই মানুষটি ১৯৭৪-এ প্লাবনের খবর পেয়ে স্থির থাকতে পারেন না, তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে।

মনে রাখা দরকার সময়টি তখন ছিল উন্মত্ত। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সক্রিয় ছিল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল ছিল বাম হঠকারী গোষ্ঠী। তারা তথাকথিত শ্রেণিশত্রু খতমের আগুন হাতে নিয়ে তাড়া করছিল সব জনপদকে। দেশটাকে শেষ করে দেওয়ার ভাবনাটাকে আরও সংকীর্ণ করার এই বিষযজ্ঞ যখন জমে উঠেছে, ঠিক তখনই সংস্কৃতির ভাবনা ভেবেছেন, খেলার কথা চিন্তা করেছেন, সব হারানো মানুষজনের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করেছেন, সহপাঠীদের অনুপ্রাণিত করে দলবল নিয়ে দৌড়েছেন মানুষের মাঝে।

শেখ কামালের ভাবনা ছিল দেশের তরুণদের ক্রীড়ার মাধ্যমে সংগঠিত করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাওয়া। শেখ কামাল গিটার বাজাতেন, সংগীত চর্চা করতেন, নাট্য চর্চা করতেন। তিনি আড্ডা মাতিয়ে রাখতেন। কিন্তু তার দুর্বলতা ছিল যে তিনি বঙ্গবন্ধুর পুত্র, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। তাই ঈর্ষাপরায়ণ বাঙালির একমাত্র কাজ ছিল বাজে গল্প বানানো। তার বহু সহপাঠীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, যারা এখন আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতি করেন। তারা বলেন, তাদের চোখে কখনও তাকে ঔদ্ধত্য বা অশালীন কোনও আচরণে লিপ্ত হতে দেখেননি। তবুও কতজন কত কথা বলেছে। বঙ্গবন্ধুর ছেলে বলেই হয়তো একটি গোষ্ঠী বেশ কৌশলেই নানা বানোয়াট গল্প ছড়িয়ে দিয়েছিল বাতাসে।

এসবের মূল ছিল একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করা, যা অল্প ক’দিন পরই বড় ধরনের অপবাদ দেওয়ার জন্য বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। এর একটি হলো ব্যাংক ডাকাতির প্রচারণা, যা দেশের তৎকালীন দুয়েকটি পত্রিকায় বড় করে ছাপা হলো। এটি যে একটি পরিকল্পিত ঘটনা ছিল তা সেদিন তার গাড়িতে থাকা বন্ধুদের কাছেই শুনেছি। স্বাধীনতাবিরোধী এবং উগ্র হঠকারী শক্তি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা প্রচার করে। আসল ঘটনা বহুবার বলা হলেও তা অপপ্রচারে চাপা পড়ে যায়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর অপপ্রচারই প্রচারের মূল রসদ হিসেবে থেকে যায় এসব ঘটনা।

রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা দখলের নিরিখে না দেখে সৎ ও নিরলসভাবে দেখবার চেষ্টা ছিল শেখ কামালের। এবং সেটাই তার কাল হয়েছে। তিনি যদি সত্যি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে দখলের রাজনীতি করতেন, যদি সংস্কৃতি আর ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে থাকতেন, তাহলে এত বদনাম তার হতো না। বঙ্গবন্ধুর পর যাতে কেউ তার যোগ্য, সৎ উত্তরাধিকার না হতে পারেন, সেজন্যই অপপ্রচারের গল্পে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল শেখ কামালের সব কৃতিত্ব।

একজন সৃজনশীল উদ্যমী প্রাণবন্ত তরুণ, যিনি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন, সংগীত, নাটক, ক্রীড়া, সামাজিক কাজেকর্মে তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তাকে নতুন করে এখনকার যুব সমাজের কাছে তুলে ধরতে হবে।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শেখ কামালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলেছে। কিন্তু আজ একথা প্রতিষ্ঠিত, তার অন্বেষণই ছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশকে তিনি কোথায় দেখতে চান সেই প্রচেষ্টা। তিনি বাংলাদেশের মানুষের উত্থানের উপায় খুঁজে ফিরেছেন তার পিতার মতো করে।

লেখক: সাংবাদিক

 

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ