ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন এবং মৃত্যুদণ্ড বিতর্ক

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:১২, অক্টোবর ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৪, অক্টোবর ১৩, ২০২০

আনিস আলমগীরধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সরকার ১২ অক্টোবর ২০২০ এ সংক্রান্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। বেশ কিছু দিন ধরে ধর্ষণ নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত। চারদিকে আওয়াজ- ধর্ষকদের ফাঁসি দেন, ক্রসফায়ারে দেন। এখন সংসদ চলমান নেই। সরকার তাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলা যায়, এর মাধ্যমে সরকার রাজপথের উত্তেজনায় পানি ঢেলে দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।
কিন্তু আন্দোলনে পানি ঢালতে পেরেছে কিনা এখনও পরিষ্কার না। ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে অনেকে স্বাগত জানালেও উদ্বেগ জানাচ্ছে মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠন। এমনকি শাহবাগে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ করা বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলোও মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে না। তারা বলেছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণজাগরণ চান। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ৯ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ-কর্মসূচি চলমান রাখবে। গত ৫ অক্টোবর থেকে শাহবাগে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে আসছে এসব সংগঠন।
আবার মৃত্যুদণ্ডে ধর্ষণ কমবে কিনা অনেকে বিভ্রান্ত। তারচেয়েও বেশি শঙ্কিত এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে। বিশেষ করে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে সেই সম্পর্কে যদি তিক্ততা আসে তখন ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে তা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে! বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর এরকম ঘটনায় বিচার প্রার্থনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পক্ষে-বিপক্ষে দু’ধরনের মত থাকায় চিন্তাটি আরও ধারালো হয়েছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা আগে ছিল যাবজ্জীবন। এখনও ১৮০ দিনে বিচার সম্পন্ন করার কথা আইনে আছে কিন্তু ৫ বছর চলে গেলেও রায় হয়নি এমন ঘটনাও রয়েছে। শাস্তি ফাঁসি হলে রায় পেতে কতদিন লাগবে।
পত্রিকায় দেখলাম, আইনের বিধান হলো, ১৮০ দিনে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলে বিচারক, পুলিশ ও প্রসিকিউটর যথাক্রমে সুপ্রিম কোর্ট, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা (পুলিশ ও প্রসিকিউটরের ব্যাখ্যার অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া বাধ্যতামূলক) করবেন। সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু হাইকোর্ট দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেন, দু-একটা বিরল ব্যতিক্রম বাদে এই বিধানের আদৌ কোনও কার্যকারিতা নেই বাস্তবে।
মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি নিয়ে আরও বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলছেন মৃত্যুদণ্ড যখন সভ্য দেশগুলো উঠিয়ে দিচ্ছে সেখানে সাজা কড়া করার চেয়ে সঠিক, দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক হওয়া জরুরি ছিল। মৃত্যুদণ্ড থাকলে সেটি বাস্তবায়নে বছরের পর বছর চলে যাবে। তাদের মতে, দরকার ছিল বর্তমান আইনের যে ত্রুটিগুলো আছে সেগুলো সংশোধনের। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ধর্ষণের শিকার ধর্ষণের প্রমাণ দিতে গিয়ে পুলিশ এবং উকিলের হয়রানির মুখোমুখি হওয়া। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ১৫৫(৪) ধারা বিলোপের দাবি করা হচ্ছে বহুদিন ধরে, যেখানে উকিল-পুলিশ মিলে ধর্ষণের শিকার নারীকে দুশ্চরিত্রা বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যেখানে ডিএনএ পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে সেখানে ভিক্টোরিয়ান আইনের এই ধারাটি বদলে ডিএনএ পরীক্ষাকে ধর্ষণ মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে কার্যকর করা যেতে পারে।
ধর্ষণ নিয়ে কাজ করা এনজিও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, কেবল সাজা বাড়িয়ে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্যতম সামাজিক অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আসক মনে করে, এ জনমতকে কাজে লাগিয়ে বরং ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার আনার জন্য সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগীকে পদে পদে যেসব প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়- সেগুলোর ওপর দৃষ্টি না দিয়ে, সেগুলো নির্মূল না করে কেবল শাস্তি বাড়িয়ে এ অপরাধ রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সংস্থাটি বলে, বিদ্যমান আইনের অধীনেই শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থাকলেও প্রসিকিউশন, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার নানা ফাঁকফোকর দিয়ে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা নানা ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর আইনগত সংস্কার আনার ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই ধর্ষণের সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা, সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা পরিবর্তন করতে হবে।
আমি মনে করি আসক সরকারের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা বাস্তবায়নের সুযোগ এখনও রয়েছে। আইনটি সংসদে গিয়ে চূড়ান্ত পাসের আগে খুঁটিনাটি দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। আরেকটি বিষয় নিশ্চিত করা দরকার যে বিচারক বা বেঞ্চ বদল হলেও মামলার যাতে ধারাবাহিকতা থাকে। বর্তমানে বহু ফৌজদারি মামলায় বাদী বা বিবাদী পক্ষ অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে একের পর এক বেঞ্চ পরিবর্তন করে আদালতের সময় নষ্ট এবং প্রতিপক্ষকে হয়রানির সুযোগ নিচ্ছে।
ধর্ষণ নিয়ে যা হচ্ছে তাতে ধর্ষণের সাজা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড করার পেছনে সরকার যে শুধু রাজপথের আন্দোলন দমনের ব্যবস্থা নিয়েছে তা নয়, হয়তো মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না। সমাজের এক বর্বরতাকে শেষ করতে মৃত্যুদণ্ডের মতো বিশ্বে সমালোচিত সাজাকে গ্রহণ করেছে।
বাংলা ট্রিবিউনের সংবাদে দেখলাম, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে আটটি বেড রয়েছে। তবে ১২ আগস্টের হিসাবে সেখানে মোট ২৩ জন ভিকটিম ভর্তি আছে। এরমধ্যে ১৭ জনই শিশু। যাদের বয়স চার থেকে ১৫ বছর। তাদের সবাই নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অবস্থা কতটা ভয়াবহ হয়েছে ভেবে দেখুন। দু’জন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী- এমসি কলেজে স্বামীকে অবরুদ্ধ করে স্ত্রীকে নির্যাতন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা দিয়েই মূলত বর্তমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়েছে কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিশুরা এই নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি শিকার– সেটাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
মৃত্যুদণ্ডের এই সিদ্ধান্ত ধর্ষণ নির্যাতন কতটা বন্ধ করতে পারবে এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সরকার যদি আইন করে বসে না থেকে আইনের প্রয়োগে তদারকি করে, এনজিও-সামাজিক সংগঠনগুলো যদি তাদের আওয়াজ বন্ধ না করে, তাহলে ধর্ষণের এই মহামারি থামতে বাধ্য। ধর্ষণ, ধর্ষকের প্রতি মানুষের ক্ষোভ-ঘৃণা বেড়েছে। এর পাশাপাশি জরুরি দরকার ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাকে ধর্ষণ পরবর্তীতে সমাজে যে নিগ্রহের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা থেকে রক্ষা করা। এ কাজে মিডিয়াও ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান সরকার টানা দীর্ঘ এক যুগ ক্ষমতায়। সুতরাং অ্যান্টি-স্টাবলিশমেন্ট ট্রেন্ডে সরকারের জনসমর্থনের পাল্লা কিছুটা দুর্বল থাকা বিচিত্র নয়। সেই সুযোগ নিয়ে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভকারীদের এই ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেও দেখা যাচ্ছে। বিক্ষোভকারীরাও বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিক দলের মোটিভেটেড কর্মী। এদের অনেকে শুরুতে ধর্ষকের ফাঁসি চেয়েছেন কিন্তু সরকার তা দিতে রাজি হওয়ায় এখন কেউ কেউ সুর পাল্টাচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন ধর্ষণের জন্য দুই মিনিটের ফাঁসি লঘু শাস্তি বলে গণ্য হবে, ৫০ বছরের কারাদণ্ড দিতে হবে। আসলে বিক্ষোভকারীদের মুখে এক, অন্তরে আরেক বাসনা থাকলে কোনও আন্দোলনই সফল করা যায় না। স্কুল শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটিরও সফলতা আসেনি একই কারণে।
রাজপথের আন্দোলন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে তাদের মধ্যে সমন্বিত কোনও পরিকল্পনা যদিও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না, তবু সবাই যে তলে তলে সরকারের পতন চায় এটা অনেকটা অবধারিত। ধর্ষণ নিয়ে মাঠ গরম করে জনসমর্থন আদায়ে সফল হলে দ্বিতীয় ধাপে হয়তো তারা সরকার পতনের দাবি উত্থাপন করতে চাইবে। এ আন্দোলনে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুর নেতৃত্বেও কিছু লোক অংশ নিচ্ছে। কিন্তু নুরুকে বিএনপি বিশ্বাস করে না। নুরুর নাটাই নাকি প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
যাই হোক, করোনার কারণে গোটা বিশ্বের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক হিসাব দিতে গিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে এবার প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ৬০, পাকিস্তানের হবে শূন্য দশমিক ৫০ আর ভারতের প্রবৃদ্ধি মাইনাসে পৌঁছেছে। করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছুতে ধস নেমেছে। সুতরাং রাজনীতিবিদদেরও দেশের মানুষের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমগ্র বিশ্বে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ আরম্ভ হচ্ছে, ইউরোপে দ্বিতীয় ওয়েভ আরম্ভ হয়ে গেছে। ইউরোপে দ্বিতীয় ওয়েভ দেখে মনে হচ্ছে করোনায় এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আমাদের সরকার দ্বিতীয় ওয়েভ সম্পর্কে সতর্ক করেছে সত্য কিন্তু কোনও প্রস্তুতি নিতে দেখছি না। সরকারের এখন থেকে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। আর বিরোধীদের সরকার পতনের চিন্তা না করে এখন সহযোগিতার সময়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ