X
শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

এইডসের কথা গোপন রাখেন অনেকে, নেন না চিকিৎসা

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:৩০আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:৩০

সীমান্তবর্তী হওয়ায় এইচআইভি-এইডসের ঝুঁকিতে রয়েছেন সাতক্ষীরার মানুষজন। সামাজিক মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন, বিড়ম্বনা ও জেলার হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় এইডসে আক্রান্তদের সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাচ্ছে না। তবে চলতি বছর সাত এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তারা খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থেরাপি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় ও মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে এই রোগের কথা গোপন রাখেন অধিকাংশ রোগী। এইডস সম্পর্কে ভুল ধারণা ও সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে অনেকে চিকিৎসা নেন না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, বিদেশফেরত, হিজড়া জনগোষ্ঠী, যৌনকর্মী ও  ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মাধ্যমে এইডসে আক্রান্ত হন অধিকাংশ ব্যক্তি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পরিস্থিতি বিবেচনায় যেকোনো সময় দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, ২০১৭ সালে সাতক্ষীরায় এইডস রোগী ছিল ৭৪ জন। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকে কোনও তথ্য নেই। জেলায় ১০৫ জন হিজড়া, ৭০০ জন সমকামী (এমএসএম) এবং ৮৪৯ জন যৌনকর্মী রয়েছেন।

এইডস রোগ প্রতিরোধে কাজ করছেন সাতক্ষীরা লাইট হাউজের সাব-ডিআইসি ইনচার্জ মো. সঞ্জু মিয়া। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। একসময় নারী মুক্তি এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন এইডস প্রতিরোধে কাজ করতো। এরপর তাদের প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় আর কাজ করে না। হিজড়া, এমএসএম, যৌনকর্মী ও ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের নিয়ে বর্তমানে জেলায় তিনটি এনজিও সংস্থা কাজ করে। আমরা এমএসএম ও হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করি। চলতি ডিসেম্বরে আমাদের প্রকল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে। মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ নামে একটি সংস্থা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের নিয়ে কাজ করে। সেভ দ্য চিলড্রেন যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করে। আমরা সমন্বয় করে কাজ করছি।’

ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে যাতায়াত করে দুই দেশের মানুষ

এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে এইডসের ঝুঁকিতে ভারত উল্লেখ করে সঞ্জু মিয়া বলেন, ‘ভারতে রোগীর সংখ্যা বেশি। সাতক্ষীরার মানুষ সহজে ভারতে যাতায়াত করে। তাদের মধ্যে কি পরিমাণ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তা বোঝা যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু জেলার হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। আবার অনেকে মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন, বিড়ম্বনার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখেন। তারা চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না।’

আমাদের সংস্থা হিজড়া ও এমএসএমদের নিয়ে কাজ করে জানিয়ে সঞ্জু মিয়া বলেন, ‘পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হলে আমরা তাদের খুলনা মেডিক্যালে চিকিৎসার সুযোগ করে দিই। এইডস প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। আমরা বিভিন্ন সময় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছি।’

উন্নয়ন সংস্থা অ্যাডাব সাতক্ষীরা জেলার সভাপতি ও স্বদেশের পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘এই অঞ্চলের অনেক মানুষ ভারতে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে নারীরা বাসাবাড়িতে কাজের জন্য এবং পুরুষরা ভাটায় কাজ করতে যান। এর মধ্যে কেউ কেউ সেখানে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। ফলে মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। আবার রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় এইডসের ঝুঁকি আছে। ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রতিদিন পণ্য নিয়ে শত শত ভারতীয় ট্রাকচালক এসে এখানে রাত্রিযাপন করেন। তারাও বিভিন্ন সময় শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। এতে কয়েকটি দিক থেকে ঝুঁকি আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‌‘সাতক্ষীরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের সঠিক চিত্র জানা যায় না। সে কারণে দাতা সংস্থাগুলো অর্থায়ন থেকে সরে যাচ্ছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক কার্যক্রম না চালানোর কারণে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আগে অনেকগুলো উন্নয়ন সংস্থা কাজ করতো। কিন্তু দাতা সংস্থাগুলো এখন অর্থায়ন করছে না। হাতেগোনা দু’একটি সংস্থা কাজ করছে। অনেকের প্রকল্প চলতি বছর শেষ হয়ে যাবে। যেহেতু দিন দিন রোগী বাড়ছে সেহেতু সরকারের উচিত এটি নিয়ে বড় কর্মসূচি গ্রহণ করা। এইডস প্রতিরোধে আরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে রোগী শনাক্ত হবে, সংক্রমণ কমবে। সেইসঙ্গে মানুষজন সচেতন হবে।’

সাতক্ষীরা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. সুব্রত ঘোষ বলেন, ‘এইডস সংক্রামক রোগ। এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসা না নিলে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ছয়-সাত সপ্তাহ পরে শরীরে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন; জ্বর, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, মুখে ঘা, দীর্ঘমেয়াদি কাশি, স্বাস্থ্যের অবনতি, লসিকা গ্রন্থি ফুলে ওঠা ইত্যাদি। আক্রান্তদের স্বাস্থ্যবিধি এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। ইনজেকশন নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবার নতুন সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে। ঝুকিপূর্ণ শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে হবে।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. সবিজুর রহমান বলেন, ‘জেলার হাসপাতালগুলোতে এইডস রোগী শনাক্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। এখানে রোগী এলে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে পাঠানো হয়। তবে অধিকাংশ ব্যক্তি এইডসে আক্রান্ত হলে বলতে চান না। সে কারণে সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন। তবে এইডস হলেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে এটি ভুল ধারণা। এইচআইভি অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) নিলে সুস্থভাবে অনেক বছর বেঁচে থাকা যায়। সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইডিডিআরবি, উন্নয়ন সংস্থা লাইট হাউজ, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন সংগঠন এ নিয়ে কাজ করছে। তবু অনেকে বিষয়টি গোপন করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এইডস মারাত্মক সংক্রামক রোগ। প্রাণঘাতী এই রোগ প্রতিরোধে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে হবে। ভোমরাসহ সীমান্ত এলাকায় ও বিদেশগামীদের বাধ্যতামূলক এইচআইভি পরীক্ষা করাতে হবে। এইডস প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা। এর বিকল্প নেই। সেজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় ট্রাকচালক পণ্য নিয়ে এসে এখানে রাত্রিযাপন করেন

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর দিবেশ ওঝা বলেন, ‘চলতি বছর আমাদের সেন্টারে ৯২৩ জনকে পরীক্ষা করে ৬৫ জনের এইডস শনাক্ত হয়েছে। এর  মধ্যে সাতক্ষীরার সাত জন। তাদের মধ্যে নারী পাঁচ, শিশু এক ও পুরুষ একজন। ২০২১ সালে ৯২৯ জনকে পরীক্ষা করে ২৮ জনের এইডস শনাক্ত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় সাতক্ষীরার মানুষ এইডসের ঝুঁকিতে আছে। আমাদের এখানে যেসব রোগী চিকিৎসা নেন তাদের অধিকাংশই সাতক্ষীরা, যশোর এবং নড়াইলের। খুলনা ও বাগেরহাটের কিছু রোগী আছেন। চলতি বছর খুলনা বিভাগে মারা গেছেন ১৮ জন। তার মধ্যে সাতক্ষীরার কেউ নেই। পজিটিভ ৫১৫ রোগীর মধ্যে ৪১০ জন নিয়মিত চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে সাতক্ষীরার শতাধিক রোগী আছেন। আরও অনেক রোগী আছেন। পরীক্ষা না করায় তাদের শনাক্ত করতে পারি না। এই এলাকার অনেক নারী ভারতে যান। এর মধ্যে অনেকে এইডসে আক্রান্ত হন। একেবারে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন আমরা আক্রান্তের কথা জানতে পারি। অধিকাংশ রোগী বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখেন। ফলে তাদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে এর সঠিক চিত্র জানা যাবে। ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন জেলায় এইডস রোগী শনাক্তের জন্য ২২টি সেন্টার করার উদ্যোগ নিয়েছে। কার্যক্রম শুরু হলে সঠিক চিত্র উঠে আসবে।’

প্রসঙ্গত, মরণব্যাধি এইডসের ব্যাপারে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক এইডস দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

/এএম/
সর্বশেষ খবর
কাভার্ডভ্যানের চাপায় ২ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
কাভার্ডভ্যানের চাপায় ২ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির টার্গেট ১৩ মুসলিম অধ্যুষিত আসন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির টার্গেট ১৩ মুসলিম অধ্যুষিত আসন
সারাদেশে যুব মজলিসের বিক্ষোভ: মামুনুল হকের মুক্তি দাবি
সারাদেশে যুব মজলিসের বিক্ষোভ: মামুনুল হকের মুক্তি দাবি
বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস
বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস
সর্বাধিক পঠিত
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার