X
মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২
২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব চার

‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
০৬ জুন ২০২২, ১০:৪০আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ১৩:৪৪

ভারতে রেকর্ড কোম্পানি যখন এলো, তখন বয়সের দিক থেকে কাজী নজরুল ইসলাম শিশু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি এল রায়, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গান সেই সময়ে সভা-জলসায় অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
 
মূলত রবীন্দ্রনাথ ও ডি এল রায়ের হাত ধরে বাংলা গানের নবধারা সূচনা হয়। কিন্তু ওনাদের আগমনের ঠিক আগে কেমন ছিল বাংলা গানের অবস্থা? 

গবেষক-লেখক সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘তখনকার কলকাতার সংগীত-পরিবেশ ছিল হয় হিন্দুস্তানি কালোয়াতি, না হয় নির্বোধমূলক ব্রম্মসংগীত। কিছু টপ্পা কিংবা নাটকের গান এবং রুচিদুষ্ট বাঈজিদের গান। শিষ্ট শিক্ষিত রুচিমান বাঙালি তার মনের খোরাক মেটাবে বা বিনোদনে মগ্ন হবে, এমন গান তখন ছিল না।’

এই পর্যায়ে সুধীর চক্রবর্তী সে সময়ের বাংলা গানের বিষয় ও বাণীকে অকিঞ্চিতকর উল্লেখ করে প্রমথ চৌধুরীর রচনা থেকে কয়েকটি গানের উদ্ধৃতি দেন।

প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘আত্মকথা’য় ছোটবেলায় শোনা কিছু গানের বাণী লিখেছেন। যেমন- ‌‘অয়ি সুখময়ী ঊষে কে তোমারে নিরমিল’ (ললিত)। সে কালের ব্রম্ম সংগীতের প্রথম যুগে প্রকাশিত কয়েকটি গানের কথাও উল্লেখ করেছেন- গাও হে তাঁহার নাম (খাম্বাজ), দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আননে (বাহার ), দিবা অবসান হলো (পূরবী)।

আবার মনে কোনও ছাপ ফেলেনি এমন গানের কথাও লিখেছেন। যেমন-
যদি গৌর চাস 
কাঁথা নে ধনী। 
সকালবেলায় ভিক্ষায় যাবি
ঘরে এসে তেল মাখাবি, 
আর পেতে দিবি বিছানাখানি। 
আর গাঁজার কলকেয় আগুন দিবি দিবস-রজনী।

কিংবা ‘এ পূজোতে ঝুমকো দিবি তবে ঘরে রাইবো’, ‘ও পাড়াতে দুধ জোগাতে যাই গো আমার বেলা হলো’ প্রভৃতি।

প্রমথ চৌধুরী ছোটবেলায় শোনা সব গানকেই অপছন্দের তালিকায় ফেলেননি। তবে এটাও ঠিক, সেই সময় মানসম্মত গানের যথেষ্ট অভাব ছিল। যে কারণে কলকাতার লোকজন গান থেকে দূরে থাকতেন। তাই প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘আত্মকথা’য় লিখেছেন, ‘সে কালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’। 

ঠিক এমনই এক পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ, ডি এল রায় মানসম্মত নতুন ধারার বাংলা গানের স্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হন।

রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল দুজনেই  যৌবনে গীতিকার বা সুরকাররূপে যতটা পরিচিত ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি গায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সভা-সমাবেশে গেলে তাঁদের গান শোনার জন্য শ্রোতারা আবদার করতেন। পরে রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদ এই নবযাত্রায় সঙ্গী হন।

তারও অনেক পরে নজরুল যখন তারুণ্যে, বাংলা গানে তিনি নতুন ঝড় তুলে গানকে ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেন।  

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ডি এল রায়, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ- এই পাঁচ জনই বাংলা আধুনিক গানের স্থপতি। তাঁদের গড়ে দেওয়া ভিত্তির ওপরেই বাংলা আধুনিক গান শতধারায় বিকশিত হয়েছে (বাংলা গানের এই পাঁচ দিকপালকে নিয়ে আমার লেখা বই ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরে’তে কিছুটা বিস্তারিত আলাপ আছে)। 

‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’ রেকর্ড যুগের শুরুর দিক থেকেই রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড পাওয়া যায়। কিন্তু প্রথমদিকে সেভাবে ডি এল রায়, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গানের রেকর্ড পাওয়া যায় না। যদিও একটা সময়ের পর তাঁদের সবার গানের গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি হয়, প্রকাশিত হয়।

রাজশাহীর প্রখ্যাত রেকর্ড সংগ্রাহক প্রফেসর ইকবাল মতিনের কাছে সংরক্ষিত রেকর্ড অনুযায়ী দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ গানটি রেকর্ড করেছিলেন শিল্পী দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচী। ১৯০৪ সালে। এরপর বিভিন্ন শিল্পী তাঁদের সুবিধামতো রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুরের প্রয়োগে অনেক সময় শিল্পীরা সচেতন ছিলেন না।
 
সন্তোষকুমার দে তাঁর ‘কবিকণ্ঠ ও কলের গান’ বই-এ লিখেছেন, ‘‘কে. মল্লিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। তিনি একসময় খ্যাতির উচ্চ শিখরে উঠেছিলেন। তার বহু গান আমারও মুখস্থ ছিল। প্রসঙ্গক্রমে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আমার মাথা নত করে দাও’ গানটির মধ্যে দয়ালকে আমদানি করেছিলেন কেন? তিনি হেসে বললেন, ‘অমন মন মাতানো গান, গাইতে গাইতে ভাবের ঘোরে আপনিই কথাটি এসে গিয়েছিল; আপনারা কীর্তনের মাঝে যেমন আখর দেওয়া বলেন, অনেকটা তাই।”

প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন ছাড়াই ওনার অনেক গান বিভিন্ন শিল্পী রেকর্ড করেন। অনেক গান যথাযথভাবে গাওয়া হচ্ছিল না। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর, রেকর্ডে ওনার গানের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা চিন্তা করেন। এবং ১০ মার্চ ১৯১৫ সালে কবির সলিসিটার খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় গানের রয়্যালটি দাবি করে চিঠি দেন। এরপর কোম্পানির পক্ষে মর্গন অ্যান্ড কোম্পানি কবির সলিসিটারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আসলেই কবির রচিত গান রেকর্ড করা হয়েছে। তখন তারা কবিকে গীতিকারের সম্মানী দিতে রাজি হলেন। ভারতে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম এই সম্মানী পান।

রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁর গান গাওয়ার জন্য প্রস্তুত গায়ক-গায়িকাও ছিলেন। যে কারণে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড প্রকাশ হয়েছিল নিয়মিত। অত্যন্ত উন্নত মানের গান ও জনপ্রিয় গান হওয়া সত্ত্বেও দ্বিজেন্দ্রলালের গান গাওয়ার জন্য গায়ক-গায়িকা সেই সময় পাওয়া যেত না। গবেষকদের মতে, দ্বিজেন্দ্রগীতি গাইতে প্রচুর অনুশীলন প্রয়োজন। সেই কষ্টটুকু তখনকার শিল্পীরা করতে চাইতো না। আরেকটি মত হলো, দ্বিজেন্দ্রলাল নিজে যখন গাইতেন, তাঁর গান পরিবেশনের স্টাইল ও গায়কি শ্রোতাদের বিমোহিত করে রাখতো। ওই পর্যায়ের গায়কি ও গান পরিবেশনের স্টাইল আয়ত্ত করা সম্ভব নয় বলে, সেই সময়ের শিল্পীরা গাইতে উৎসাহবোধ করতেন না। এই প্রসঙ্গে, প্রবাসী বাঙালি সম্মেলনে দ্বিজেন্দ্রলালের তুমুল জনপ্রিয় হাসির গান ‘নন্দলাল’ গাইলেন দ্বিজেন্দ্রলালের পুত্র  দক্ষ গায়ক, সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। গান শেষে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘দিলীপ গাইলে বটে, হাততালিও পেলে, কিন্তু তোমার পিতৃদেবের মতো হলো না। তিনি যখন এই গানটি গাইতেন, লোকে হেসে মাটিতে লুটিয়ে পড়তো।’
 
তবে একসময় রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পীরা এবং কিছু দক্ষ কণ্ঠশিল্পী দ্বিজেন্দ্রলালের গান গাওয়া শুরু করেন। ফলে, শ্রোতারা রেকর্ডে দ্বিজেন্দ্রগীতি শোনার সুযোগ পান। প্রথমদিকে তেমন একটা না হলেও, পরে রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গানের রেকর্ড নিয়মিত প্রকাশ হয়েছে।
 
নজরুলের গান তো ঝড়ের গতিতে সবার মন জয় করেছে। গ্রামোফোন বাণিজ্যকে নজরুলের গান যেমন উচ্চমাত্রায় উন্নীত করেছে, একইভাবে অনেক শিল্পী নজরুলের গান গেয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছেন। গ্রামোফোন রেকর্ডে নজরুলের প্রথম গান প্রকাশ হওয়ার পর থেকে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত নজরুলের গানই বাংলা গানের শেষ কথা ছিল।

চলবে…

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি

তথ্যসূত্র:

“আত্মকথা” প্রমথ চৌধুরী
“কবি কণ্ঠ ও কলের গান” সন্তোষ দে
“দ্বিজুবাবুর গান থেকে দ্বিজেন্দ্রগীতি” সুধীর চক্রবর্তী
“নীলাম্বরী শাড়ি পরে” শহীদ মাহমুদ জঙ্গী

প্রথম পর্ব: অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

দ্বিতীয় পর্ব: শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে দেয় গ্রামোফোন

তৃতীয় পর্ব: গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক

 

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (গ)পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
পংকজ-রাইচাঁদ জুটি: বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় প্লে-ব্যাক শুরুর ইতিহাস
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (খ)পংকজ-রাইচাঁদ জুটি: বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় প্লে-ব্যাক শুরুর ইতিহাস
পংকজ মল্লিক: বাড়ি বাড়ি টিউশনি থেকে বেতার-সিনেমা ও রেকর্ডিংয়ে অবদান
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (ক)পংকজ মল্লিক: বাড়ি বাড়ি টিউশনি থেকে বেতার-সিনেমা ও রেকর্ডিংয়ে অবদান
রবীন্দ্রনাথের পরে দিলীপকুমারের ওপরেই দাবি ছিল সর্বাধিক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৩রবীন্দ্রনাথের পরে দিলীপকুমারের ওপরেই দাবি ছিল সর্বাধিক
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
জেদ্দায় সুলতান সুলেমানের স্ত্রী হুররাম!
জেদ্দায় সুলতান সুলেমানের স্ত্রী হুররাম!
‘১৮ বছর হলে মেয়েকে এমন একটা সিঙ্গেল ট্রিপে পাঠাবো’
৫০ পর্বে মামানামা- আউট অব দ্য বক্স‘১৮ বছর হলে মেয়েকে এমন একটা সিঙ্গেল ট্রিপে পাঠাবো’
নয়তো নেপথ্যে চলে যাবো: আফজাল হোসেন
মুখোমুখিনয়তো নেপথ্যে চলে যাবো: আফজাল হোসেন
পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৪ (গ)পংকজের কণ্ঠ-সুর: কবিগুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত
আজ অব্দি শাকিব খানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিইনি: বুবলী
আজ অব্দি শাকিব খানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিইনি: বুবলী