X
শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
সিনেমা সমালোচনা

জ্বীন: ‘জিন ছাড়ানো’র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছবি!

আহসান কবির
আহসান কবির
৩০ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৩৯আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৪৬

‘হরর’ বা ‘সাইকো’ থ্রিলার ছবির তকমা লাগানো এক ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ ছবি ‘জ্বীন’! প্রচলিত বাংলাদেশি ছবির ভিড়ে খানিকটা নতুন গল্পের ছবি ‘জ্বীন’। সারাদেশে ‘জিন ছাড়ানো’র ব্যাপারটাকে যখন নেতিবাচক চোখে দেখা হয়, তখন সেটিকে বিশ্বাস করাতে চাওয়া এক ছবির নাম ‘জ্বীন’। হয়তো বিশ্বাসী মানুষকে আকৃষ্ট করার নতুন এক ছবি ‘জ্বীন’। জিন ছাড়ানোর নতুন এক ‘হাফেজ’ বা ‘শিক্ষক’ পাওয়ার ছবি ‘জ্বীন’। ‘লালচর’ এবং ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’র পর নাদের চৌধুরী পরিচালিত তৃতীয় ছবির নাম ‘জ্বীন’। আব্দুন নূর সজল, শহীদ-উন-নবী কিংবা হীরা সাহেবের মতো অভিনেতার ছবিতে ফেরার এক ছবি ‘জ্বীন’। জাজ মাল্টি মিডিয়ার এক লাখ টাকার চ্যালেঞ্জ এবং কোক-নাস্তা খাওয়ানোর আলোচিত এক ছবি ‘জ্বীন’!

ফ্যাশন ফটোগ্রাফি করা রাফসান বাবা-মা’র অমতে বিয়ে করে মোনালিসা ওরফে মনাকে। মনাও অনেকের মতো রাফসানের কাছে ছবি তুলতে এসেছিল। বিয়ের দুদিনের মধ্যেই রাফসান বুঝতে পারে মনা অস্বাভাবিক এক মেয়ে। তার ওপর জিনের আছর(?) হয়েছে। রাতে, বিশেষ করে অন্ধকারে মনার ওপর জিন ভর করতে থাকলে রাফসান তার বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক বিজয়ের কাছে সাহায্য চায়। রাফসান বিজয়কে তার গল্প শোনায়।

সেখানে আরেক গল্প উঠে আসে। রাফসানের দাদীর মুখে শোনা যায় দত্ত বাড়ির কথিত ইতিহাস বা অত্যাচারের গল্প। সেখানে কুয়াতে চুবিয়ে মারা হতো মানুষকে। কুয়ার পাশে ছবি তুলতে যেয়ে পচা জলে পড়ে যায় মনা, তাকে উদ্ধার করে রাফসান। বিজ্ঞান কেন্দ্রিক কিছু ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে বিজয়। যেমন চোখ উল্টে আসাটা লেন্স পরা থেকে এসেছে কিংবা কনশাস মাইন্ড আর আনকনশাস মাইন্ডের আলাদা আলাদা অবস্থান। কিন্তু তাতেও মনা ভালো না হলে বিজয় তাকে নিয়ে যায় তার ‘হাফেজ  শিক্ষকের’ কাছে। তিনি শুরুতেই বলে দেন বিজ্ঞান যেখানে শেষ, ধর্ম সেখান থেকে শুরু। এরপর সেই ‘ঘরপড়া’ বা ‘ঘরবান্ধা’ থেকে শুরু করে জিনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বৃত্তবন্দী থাকাসহ অনেক কিছু দেখা যায় এই ছবিতে। শেষ দৃশ্যের আগে হয়তো উত্তেজনা শেষ হয় না।

আরেকটি দৃশ্যে পূজা চেরী অভিনেতা সজল এর তৃতীয় ছবি ‘জ্বীন’। ছবিতে রাফসানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সজল এবং মনার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পূজা চেরী। মনোবিজ্ঞানের শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিয়াউল রোশান এবং তার প্রেমিকা চরিত্রে জান্নাতুল নূর মুন। সজল, পূজা এবং রোশান তাদের চরিত্রে স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন। প্রথম ছবি হিসেবে জিন ছাড়ানোর শিক্ষকের চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন হীরা। ‘ফোর জি’ চরিত্রে খুবই সপ্রতিভ ছিলেন সহিদ-উন-নবী, যিনি নিজেও নাটক পরিচালনার সাথে জড়িত। পরিচালক নাদের চৌধুরী, রোকেয়া বেবি এবং সুজাতাও এই ছবিতে অভিনয় করেছেন। 

নাদের চৌধুরীর পরিচালনায় এর আগে ‘লালচর’ এবং ‘মেয়েটি এখন কোথায়’ যাবে নামের দুটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল। তার পরিচালনায় তৃতীয় ছবি ‘জ্বীন’ আলোচনায় এসেছে, এক ধরনের জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই ছবির কাহিনি লিখেছেন প্রযোজক আব্দুল আজিজ এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন আব্দুল্লাহ জহির বাবু। ছবির চিত্রগ্রহণে ছিলেন সাইফুল শাহীন।

ছবিতে তিনটি গানের ভেতর ‘জ্বীন’ শিরোনামের গানটি লিখেছেন প্রয়াত কিংবদন্তি গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন জাভেদ আহমেদ কিসলু। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন কিশোর ও দিঠি আনোয়ার। এছাড়া ‘ঢঙ্গী ছেলে’ গানটিও শ্রুতিমধুর।

ছবিতে অসঙ্গতি আছে প্রচুর। মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক বিজয় একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললেও ক্যাম্পাস দেখানো হয়েছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের। আবার জিন ছাড়ানো নিয়ে যারা ব্যবসা বা ধান্দা ফিকির করে সেটা দেখানোর জন্য বিজয়কে আনার পর পরই একধরনের আইটেম গানে দেখা যায় বিজয় ও তার প্রেমিকাকে, চরিত্রের বিবেচনায় যা হাস্যকর মনে হয়েছে। মনার ওপর জিনের আছর নিয়ে রাফসান ওরফে সজলকে যতটা চিন্তিত মনে হয়েছে তার পরিবারের অন্য সদস্য বিশেষ করে তার মা ও ফোর জি (কাজের মানুষ)কে ততটা চিন্তিত মনে হয়নি। মনা অসুস্থ, এটা জানিয়ে তার মাকে রাফসানের বাসাতে ডাকা হয় কিন্তু তাকে দেখে মনা বা পূজার ভেতরে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। জিন এই ছবিতে অন্ধকারে এসেছে এবং অন্ধকারেই আসে, এমন ধারণা দেয়া হলেও পরে কিন্তু কথিত জিন আলোতেও এসেছে!

নাদের চৌধুরী গ্রাফিক্স বা অ্যানিমেশনের এই যুগে নেকড়ে বা শিংওয়ালা ঘোড়া (আযাজিল?) বানানো এবং সেগুলোকে মেরে ফেলার দৃশ্য হাস্যকর। কারণ দর্শক এখন সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র দেখে অভ্যস্ত। তেমনি বিদ্যুৎ চমকানো কিংবা বাড়ির ভৌতিক ফ্লেভার আনা অথবা আবহ সংগীত কোনটাই একালের হরর বা সাইকো থ্রিলার মুভির সঙ্গে আদৌ মানানসই হয়নি!

সম্ভবত ছবির প্রচারণার কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের এক ওয়ার্কশপে প্রযোজনা সংস্থা জাজ মাল্টিমিডিয়ার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল কেউ একা একা হলে বসে ‘জ্বীন’ ছবিটি দেখতে পারলে তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে! ভয়ের কারণে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে জাজ বা হল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। এই ঘোষণা নিয়েও ছবির দর্শকদের মধ্যে তুমুল ‘ফান’ লক্ষ্য করা গেছে। কেউ কেউ ছবির ভৌতিক আবহকে কমেডি হিসেবে নিয়ে হলের ভেতরেই আনন্দে মেতে উঠছিলেন! ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করছিলেন!

‘জ্বীন’ ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল ২০১৯ এর আগস্টে। ২০২৩ সালের ২২ এপ্রিল ছবিটি ১৫ হলে মুক্তি পায়।

এর আগে কাজী হায়াত ‘রাজবাড়ি’ নামে একটা ভৌতিক ছবি করেছিলেন। ‘ডাইনী বুড়ি’ নামেও একটা ছবি হয়েছিল। কোনোটিই সুখকর ছিল না, আলোচনাতেও আসে নি। ‘জ্বীন’ আলোচনায় এসেছে এবং মানুষ যে কোনও কারণেই হোক এই ছবিটি দেখছেন।

জয় হোক বাংলা ছবির। আহসান কবির

জ্বীন: রেটিং ৫.৫/১০
পরিচালক: নাদের চৌধুরী
প্রযোজক: আব্দুল আজিজ ও আলীমুল্লাহ খোকন
চিত্রনাট্যকার: আব্দুল্লাহ জহির বাবু
কাহিনিকার: আব্দুল আজিজ
শ্রেষ্ঠাংশ: আব্দুন নূর সজল, পূজা চেরী, জিয়াউল রোশান, জান্নাতুন নূর মুন প্রমুখ
সুরকার: জাভেদ আহমেদ কিসলু
চিত্রগ্রাহক: সাইফুল শাহীন
সম্পাদক: মোহাম্মদ কালাম
প্রযোজনা ও পরিবেশনা: জাজ মাল্টিমিডিয়া
মুক্তি: ২২ এপ্রিল ২০২৩

সমালোচক: রম্যলেখক, সাংবাদিক ও কবি

আরও সমালোচনা:

কিল হিম: বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন অনন্ত, কিন্তু সেটা নড়ে না!

লিডার: স্বস্তি আর অস্বস্তির পাঁচ-ছয়

লোকাল: রাজনীতির ব্যানারে প্রেম ও প্রতিশোধের ছবি!

/এমএম/
সম্পর্কিত
খুব কষ্ট হচ্ছে মামনি: পূজা চেরী
মা দিবসখুব কষ্ট হচ্ছে মামনি: পূজা চেরী
এগিয়েছে ‘ওমর’, চমকে দিলো ‘লিপস্টিক’!
ঈদের ছবিএগিয়েছে ‘ওমর’, চমকে দিলো ‘লিপস্টিক’!
নায়িকাদের ঈদ: এগিয়ে বুবলী, আরও যারা মিছিলে…
নায়িকাদের ঈদ: এগিয়ে বুবলী, আরও যারা মিছিলে…
আইটেম চমকের পর রোমান্টিক আবহে আদর-পূজা
আইটেম চমকের পর রোমান্টিক আবহে আদর-পূজা
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
২৪-এ হচ্ছে না বনি-কৌশানির বিয়ে
২৪-এ হচ্ছে না বনি-কৌশানির বিয়ে
আমি পুরোপুরি সিঙ্গেল: শ্রুতি হাসান
আমি পুরোপুরি সিঙ্গেল: শ্রুতি হাসান
ইতিহাসের পাতায় পায়েল কাপাডিয়া
কান উৎসব ২০২৪ইতিহাসের পাতায় পায়েল কাপাডিয়া
ফারিণের অভিষেক, নিরব-স্পর্শিয়ার অভিমান!
এ সপ্তাহের ছবিফারিণের অভিষেক, নিরব-স্পর্শিয়ার অভিমান!
শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগে ভারতীয় তরুণ-তরুণীর জয়
কান উৎসব ২০২৪শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগে ভারতীয় তরুণ-তরুণীর জয়