নেপালের রসুয়া এলাকায় বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর আবারও দুর্যোগের আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উজানে একটি বাঁধে এখনও বিপুল পরিমাণ পানি আটকে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তারা। এটি ভেঙে গেলে ওই এলাকায় আবারও বন্যার ঢল নামতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।
কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) এমন সতর্কতা দিয়েছে। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের আটটি দেশ—ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করে সংস্থাটি।
আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট হঠাৎ ঢল নেমে ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও পাথর নেমে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
সংস্থাটির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একই এলাকা আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। লেন্দে খোলা নদীতে একটি বরফধসকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে, তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উজানে একটি বাঁধে এখনও পানি আটকে থাকায় দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। জিলং বন্দরের জন্য এরই মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইসিআইএমওডির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে ভয়াবহ বন্যার শিকার একই নদী অববাহিকার একটি অংশ আবারও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার আরও ভাটির এলাকাগুলোও সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, এবারের ঘটনায় অবকাঠামো ও পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে নদী তীরবর্তী জনবসতি ও সম্প্রদায়গুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোটেকোশী অববাহিকায় পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। পরে বন্যার পানি ভোতে কোশি নদী দিয়ে ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত হয়।
বিজ্ঞানীদের একটি প্রধান ধারণা হলো, উঁচু পাহাড়ে বড় ধরনের বরফ-পাথরের ধস নেমেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভিডিও ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোতে কোশি নদীর শাখা লেন্দে খোলা নদীতে পড়ে থাকতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ পানি সরে গিয়ে পাথর, পলি ও ধ্বংসাবশেষসহ শক্তিশালী ঢল সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হিসেবে বিজ্ঞানীরা অস্থায়ী ভূমিধসের বাঁধ তৈরির বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ধস থেকে আসা ধ্বংসাবশেষ উজানের সরু অংশে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। এমন বাধার পেছনে পানি জমে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হলে তা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় শক্তিশালী বন্যার ঢল সৃষ্টি করতে পারে। কিছু অংশে এখনও এমন বাধা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্তৃপক্ষ।
বন্যার সময় রেকর্ড হওয়া অস্বাভাবিক ভূকম্পন সংকেতও বিশ্লেষণ করছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিকভাবে জিলংয়ের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে অস্বাভাবিক তৎপরতার সংকেত পাওয়া গেছে। ওই কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। ঝাংমুতেও আরেকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে এমন সংকেত পাওয়া গেছে। এসব সংকেত কোনো তুষারধস বা বড় ধরনের ভূমিধস থেকে সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসব ভূকম্পন সংকেতের সঙ্গে বন্যার সরাসরি কারণগত সম্পর্ক এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে জানিয়েছে আইসিআইএমওডি।
বন্যার ভয়াবহতা বোঝা যায় পানির উচ্চতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঘটনায়। গালছিতে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটে সর্বোচ্চ ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে মালেখুতে নদীর পানির উচ্চতা ৭ মিটার বেড়েছে। এত দ্রুত পানির উচ্চতা বৃদ্ধি উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ নেমে আসার ইঙ্গিত দেয়।
আইসিআইএমওডির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, ১৪ মাসের মধ্যে লেন্দে খোলা নদীতে দুইবার বন্যা হয়েছে। এবার সম্ভবত একটি বরফধস নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে হঠাৎ ঢল সৃষ্টি করেছে। তবে আরও তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত ধারাবাহিক দুর্যোগ—হিমবাহমণ্ডলীয় একটি ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জনবসতিতে বন্যায় রূপ নিতে পারে।
আইসিআইএমওডির জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, হিমবাহ, তুষার ও পারমাফ্রস্ট-সংক্রান্ত ঝুঁকি ক্রমেই বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে এবং এ ধরনের আন্তসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
আইসিআইএমওডির মহাপরিচালক পেমা গ্যামশো এই দুর্যোগে নেপালের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিতভাবে আঘাত হানা এই বিপর্যয়ে তারা গভীরভাবে শোকাহত। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সম্ভব হলে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ, তুষার, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ের ঢালের পরিবর্তন ঘটছে। তবে এবারের ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণ করার সময় এখনও আসেনি।
বিজ্ঞানীরা জলপ্রবাহ, ভূকম্পন ও স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো উজানে সন্দেহ করা বাধাটি কতটা স্থিতিশীল, তা নির্ধারণ করা। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার তীরবর্তী মানুষের জন্য তাই বিপদ এখনও কাটেনি। দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম ও পর্যবেক্ষণে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি









