X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

ইমরান খানের সাবেক উপদেষ্টার বয়ানে বাংলাদেশের সাফল্য

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:০৭

বাংলাদেশের ৫০তম বিজয় দিবস উপলক্ষে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ডন-এ একটি কলাম লিখেছেন দেশটির একজন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ ইশরাত হোসাইন। ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দ্য বাংলাদেশ স্টোরি নামের এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন উজ্জ্বল দিক তুলে ধরেছেন এবং সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ পর্যালোচনা করেছেন। ইশরাত হোসাইন কিছু দিন আগেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও মিতব্যয়িতা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।  এর আগে তিনি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ডিন (২০০৮-২০১৬) এবং স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৯৯-২০০৬)-এর দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য কলামটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশ বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন করছে। একসময় হেনরি কিসিঞ্জারের বলা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের জাতীয় আয় ৫০ গুণ বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৫ গুণ (ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি) এবং খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চারগুণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি আটকে রাখা হয় আড়াইগুণে। এতে মাথাপিছু খাদ্যের প্রাপ্যতা বেড়েছে। রফতানি বেড়েছে ১০০ গুণ এবং ১৯৯০ সালে দারিদ্র্যের হার ৬০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২০ শতাংশে। আয়ুষ্কাল বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর। বেশিরভাগ সামাজিক সূচক শ্রীলঙ্কা ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় ভালো। মানব উন্নয়ন সূচক মান বেড়েছে ৬০ শতাংশ।

ইমরান খানের সাবেক উপদেষ্টার বয়ানে বাংলাদেশের সাফল্য

বেশিরভাগ অগ্রগতি গত তিন দশকে অর্জিত হয়েছে। প্রথম দুটি দশক ছিল প্রবৃদ্ধিহীন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল দ্বিগুণ। কিন্তু এখন তা বাংলাদেশের চেয়েও কম। কোভিড মহামারি শুরুর আগে ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭-৮ শতাংশ, যা পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশের সাফল্য আকর্ষণীয়। কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ তাদের চেয়ে বৃহৎ ও ভালো অবস্থাসম্পন্ন ভারত ও পাকিস্তানকে বেশিরভাগ আর্থসামাজিক সূচকে পেছনে ফেলতে পারলো? বাংলাদেশ অনেক কঠিন সময় পার করেছে, নতুন প্রশাসন গঠন করেছে, বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন, জাতির জনক ও শীর্ষ রাজনীতিক নেতাদের হত্যাকাণ্ড এবং বেশ কয়েকটি ব্যর্থ ও সফল সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবিলা করতে হয়েছে। ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদ সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল সেনাবাহিনী। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলে দুই বছর সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ছিল।

প্রধান দুটি দল, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও খালেদা জিয়ার বিএনপি ১৯৯১ সাল থেকে ক্ষমতা পালাবদল করেছে। ২০০৯ সাল থেকে টানা তিনটি নির্বাচন জিতে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। দুই নেত্রীর লড়াই এখনও তিক্ত ও তীব্র। খালেদা জিয়া নির্বাচন বয়কট ও দলের অনেক নেতাসহ বেশ কিছু দিন কারাগারে ছিলেন। তাই, এমন তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অস্থিরতার পরও দেশটি কীভাবে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধন করলো তা পর্যালোচনা করা দারুণ বিষয়।

প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মতো নয়, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিকভাবে সমজাতীয়। দেশটির ভাষা, জাতীয়তা ও ইতিহাস এক। বাস্তবে কোনও ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, উপজাতি এবং সামন্তীয় বিভাজন নেই। শহর ও গ্রামের বিভাজন রয়েছে কিন্তু দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে এই বিভাজনে সাধারণ অসন্তুষ্টি যাতে কম মাত্রায় থাকে। আরও ভালো করার প্রয়াস একটি শক্তিশালী সামাজিক নীতিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ বাইরের কোনও গুরুতর হুমকির মুখে পড়েনি।

দ্বিতীয়ত, রাজ্য ও প্রদেশ স্তরের হস্তক্ষেপ ছাড়া সরকারের একক ধরন। এর ফলে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, আইনি ও আর্থিক ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এতে বহু স্তরের সরকার কাঠামোর বিভাজন কমেছে। নীতি গ্রহণ ও সেগুলোর বাস্তবায়ন সুনির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। দুর্বল বিরোধী দল এবং ক্ষমতায় থাকা দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে নির্বাচনে জয়ী দল উদ্যোগ গ্রহণ, বাস্তবায়নের সামর্থ্য ও আমলাদের জবাবদিহির আওতায় রেখেছে।

তৃতীয়ত, ১৯৭১ সালের আগে থেকেই নারীদের ক্ষমতায়ন প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু পরে তা পরিবার পরিকল্পনা, নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্রঋণ বহুলভাবে প্রচলন করে ধারাবাহিক সরকারগুলো। এগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)’র। ব্র্যাক, গ্রামীণ, আশা ইত্যাদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নারীদের ক্ষুদ্র ঋণ দেয়। নিজেদের ঘাটতি অনুধাবন করে সরকার সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে পূর্ণ সমর্থন ও এনজিওগুলোকে মুক্তভাবে কাজের সুযোগ দেয়। শিক্ষিত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং কম সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে শ্রম অংশগ্রহণে নারীর হার বেড়েছে এবং লিঙ্গবৈষম্য কমেছে। 

চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও অর্থনৈতিক নীতি, প্রকল্প ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ছিল। দলগুলো মূল শেকড়- ক্ষুদ্র অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, আর্থিক বিচক্ষণতা, বাণিজ্যের উন্মুক্তকরণ, বেসরকারি খাতে প্রণোদনা এবং সামাজিক উন্নয়ন থেকে সরে দাঁড়ায়নি। নীতির অপরিবর্তনীয়তা দেখিয়ে দিয়েছে যে সরকার পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক কোনও বিচ্যুতি ঘটবে না, যার ফলে বিনিয়োগকারী ও বাজারে বড় প্রভাব পড়বে। এতে তারা তাদের পরিকল্পনা কোনও বাধা ছাড়াই বাস্তবায়ন করে যেতে পেরেছেন এবং সময়ের পথ ধরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের বাণিজ্যকে মুক্ত ও অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ বিদেশি কারিগরি জ্ঞান এবং রফতানিকারকদের নগদ ও বিভিন্ন সুবিধা ফল দিয়েছে। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। এই খাতে চীনের পরেই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। বেশিরভাগ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশের রফতানিকারকদের কাছ থেকে পোশাক কিনছে। এই শিল্পে নারীদের কর্মসংস্থান তাদের অবস্থান ও পরিবারের ক্ষমতার সম্পর্ক শক্তিশালী করেছে। অনুপ্রাণিত তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বহির্মুখিতার কারণে কাজের চর্চার অগ্রগতি হয়েছে। বেড়েছে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতার চাহিদা।

ষষ্ঠত, স্থিতিশীল উচ্চ প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব হয়েছে যখন অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ ৩০ শতাংশ হয়েছে। উৎপাদন খাতে বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয়, একইসঙ্গে শ্রমশক্তিকে শিক্ষিত করার মাধ্যমে অর্জিত প্রবৃদ্ধি ছিল ব্যাপকভিত্তিক। ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে আমদানি বেড়েছে কিন্তু তাতে অর্থ এসেছে রফতানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স থেকে। যার ফলে বর্তমান রাজস্ব ঘাটতি ছিল নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

আমাদের এখানে অনেক কিছু শেখার আছে। দুই দলের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিলেন যে সংকীর্ণ অভিজাত শ্রেণিকে সীমাবদ্ধ পৃষ্ঠপোষকতার বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জন হলো বৃহত্তর রাজনৈতিক সুবিধা। দক্ষতা, জনপ্রিয়তা এবং প্রার্থীর চেয়ে দলের রেকর্ড বিবেচনায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। বেসরকারি খাত, রাজনীতিক ও আমলাদের মধ্যে প্রতীকী ঐক্য স্থিতিশীলতায় ভারসাম্য এনেছে। রাজনীতিকরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্বাচনি প্রচারের জন্য অর্থ পেয়েছেন, আমলারা উপহার ও পারিতোষিক পেয়ে নিজেদের কম বেতনের ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছেন এবং ব্যবসায়ীরা শ্রম ও পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তাদের সম্পদ বাড়িয়েছেন। কিন্তু তারা টাকা বিদেশে পাঠাননি।

কর ও জিডিপির অনুপাত ৮ থেকে ৯ শতাংশ রয়েছে। মূলগত দর্শন মনে হচ্ছে, সরকারি খাতের তুলনায় বেসরকারি ব্যবসায়ীদের হাতে বিনিয়োগে অগ্রগতি বেশি। ফলে সরকারকে অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণতা দেখাতে হয়েছে। ঘাটতি এখনও ৫ শতাংশে রয়েছে, ফলে প্রাথমিক উদ্বৃত্ত জনগণের ঋণের অনুপাত কমেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, রফতানির প্রসার, মানবসম্পদে (বিশেষ করে নারী) বিনিয়োগ এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের একসঙ্গে কাজ করা এই সাফল্যের গল্পের উপাদান।

/এএ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কান উৎসবে ‘মুজিব’ বায়োপিকের ট্রেলার উদ্বোধন
কান উৎসবে ‘মুজিব’ বায়োপিকের ট্রেলার উদ্বোধন
পেশাদার বক্সিংয়ে সেরা বাংলাদেশের আল আমিন ও সুরো কৃষ্ণ
পেশাদার বক্সিংয়ে সেরা বাংলাদেশের আল আমিন ও সুরো কৃষ্ণ
‘বিসিএস বিশ্ববিদ্যালয় খুলেন, প্রিলিমিনারি-ভাইভা বিভাগ চালু করেন’
‘বিসিএস বিশ্ববিদ্যালয় খুলেন, প্রিলিমিনারি-ভাইভা বিভাগ চালু করেন’
রাতে নামবে বৃষ্টি,  কমতে পারে তাপমাত্রা
রাতে নামবে বৃষ্টি,  কমতে পারে তাপমাত্রা
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এসে বিএসএফের হাতে গ্রেফতার বাংলাদেশি যুবক
প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এসে বিএসএফের হাতে গ্রেফতার বাংলাদেশি যুবক
বৃষ্টি ঠেকাবে না এক লাখ ৪৩ হাজার টাকার ছাতা, চীনে ক্ষোভ
বৃষ্টি ঠেকাবে না এক লাখ ৪৩ হাজার টাকার ছাতা, চীনে ক্ষোভ
পাম ওয়েল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করছে ইন্দোনেশিয়া
পাম ওয়েল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করছে ইন্দোনেশিয়া