পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। পুঞ্চ জেলার রাজধানী রাওয়ালকোটে একটি নিষিদ্ধ নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীর পূর্বনির্ধারিত বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে রবিবার এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এই ঘটনায় আরও ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর কড়াকড়ি উপেক্ষা করেই সেই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেখানে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছিল এবং ওই এলাকায় যাতায়াতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছিল।
কী ঘটছে সেখানে?
সংগঠন নিষিদ্ধ করা এবং আঞ্চলিক কিছু ক্ষোভের জেরে এই বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত সামরিক অঞ্চল পুঞ্চ জেলার পাকিস্তান অংশের কমিশনার সরদার ওয়াহিদ খান ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা ও একজন পথচারী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের গুলিতে ছয়জন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে আঞ্চলিক পুলিশ প্রধান লিয়াকত মালিক জানান, রবিবারের সংঘর্ষে ২৩ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ৫০ জন বিক্ষোভকারীসহ অনেকেই আহত হয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার স্থানীয় প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট (পিআইডি) এক বিবৃতিতে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ওই এলাকায় চলাচল এড়াতে অনুরোধ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি থেকে দর্শনার্থীদের রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ।
ইতোমধ্যে সেখানে ঘুরতে যাওয়া ব্যক্তিদেরও অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আজ ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, কাশ্মীরের এই অংশে টানা তিন দিন ধরে ইন্টারনেট সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত বা সীমিত রয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলের বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর ভূখণ্ডটি ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই নিজেদের বলে সম্পূর্ণ দাবি করে। এর একটি অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে। পাকিস্তান-শাসিত অংশটি স্থানীয়ভাবে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে) নামে পরিচিত। এর জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের বেশি। নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী ও আইনসভা নিয়ে এটি একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এর চূড়ান্ত ক্ষমতা মূলত ইসলামাবাদের হাতেই ন্যস্ত। ভারতের অংশ থেকে এটি ৭৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সামরিক সীমান্ত লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) দ্বারা বিভক্ত।
বিক্ষোভের নেপথ্যে কারা?
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। ২০২৩ সালে মূলত ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজকে নিয়ে অধিকারকর্মী শওকত নওয়াজ মীরের নেতৃত্বে এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে ওঠে। শুক্রবার স্থানীয় সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০১৪-এর আওতায় জেএএসি-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের এক পরিপত্রে দাবি করা হয়, জেএএসি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত এবং তারা সমাজে নৈরাজ্য, ঘৃণা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষতি করছে।
রবিবারের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় শওকত নওয়াজ মীর প্রশাসনকে দায়ী করে বলেন, রাষ্ট্র রাওয়ালকোটে আমাদের সাধারণ মানুষকে গণহারে হত্যা শুরু করেছে। জবাবে কমিশনার ওয়াহিদ খান বলেন, জেএএসি নেতৃত্ব এটিকে গণহত্যা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতেই এই রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের মূল কারণ কী?
আগামী ২৭ জুলাই এই অঞ্চলের আইনসভার ৪৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে সেসব শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের জন্য, যারা ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীর থেকে এসে বর্তমানে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রান্তে বসবাস করছেন। নিয়ম অনুযায়ী, এই শরণার্থীরা যদি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মূল ভূখণ্ডে এসে বসবাস না করেন, তবে তারা এই সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না।
জেএএসি এই সংরক্ষিত আসন প্রথা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। তাদের যুক্তি, আইনসভার সব আসন কেবল তাদেরই পাওয়া উচিত যারা বাস্তবে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, পাকিস্তানের অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভোটারদের জন্য নয়।
তবে করাচিতে কর্মরত গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবদুল জব্বার নাসির বলেন, এই আসনগুলো ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত এবং ১৯৭৪ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধানে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সাংবিধানিক সুরক্ষা যদি বিক্ষোভকারীদের কারণে বদলে যায়, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এই আসনগুলো বাতিল করলে জাতিসংঘে কাশ্মীরের স্বাধীনতার সপক্ষে পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল হবে এবং ভারতের হাত শক্তিশালী হবে।
মে মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে জেএএসি-র ম্যারাথন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা মঙ্গলবার এই বিক্ষোভের ডাক দেয়। এর মধ্যে রবিবার আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, এই ১২টি আসন সাংবিধানিক সুরক্ষাপ্রাপ্ত এবং তা বাতিল করতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক রাজা কায়সার আহমেদ বলেন, আদালতের এই রায়ের ফলে আইনি পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেএএসি তাদের বিক্ষোভ আরও জোরদার করেছে।
ভেতরের গভীর সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট মূলত শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের বণ্টন ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। জেএএসি-র নেতৃত্বে এটি তাদের চতুর্থ বড় বিক্ষোভ।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে জেএএসি ৩৮ দফা দাবি পেশ করে সম্পূর্ণ লকডাউনের ডাক দিয়েছিল, যার জবাবে সরকার সেখানে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে, যখন সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, ময়দা পাচার ও গম সংকটের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে মুজাফফরাবাদ অভিমুখে লংমার্চের সময় সহিংসতায় একজন পুলিশসহ পাঁচজন নিহত হন।
বর্তমানে এই ৩৮ দফা দাবিই উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক ভর্তুকি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তদন্ত, সামাজিক কল্যাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ওই ১২টি সংরক্ষিত আসন বাতিল।
এদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি জানিয়েছেন, তিনি চলমান উত্তেজনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বিলাওয়াল দাবি করেন, ৩৮টি দাবির মধ্যে ৩৫টিই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি দাবিগুলো বাস্তবসম্মত নয় অথবা আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রাজা কায়সার আহমেদ বলেন, এই বিতর্ক কেবল কয়েকটি আসনের নয়; বরং এটি মূলত কাশ্মীরের শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সূত্র: আল জাজিরা









