ভারতের শহুরে নারীদের অর্ধেক কেন ঘরে থাকে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ মার্চ ২০২৩, ১৭:৫০আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৩, ১৯:০২

১৯ বছরের মনীষা ভারতের রাজধানী দিল্লির উপকণ্ঠে একটি বাড়িতে পূর্ণকালীন গৃহ পরিচালিকার কাজ করেন। মনীষার বেড়ে ওঠা ঝাড়খণ্ডে। সেখানে স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারেননি মনীষা। কারণ ওই অঞ্চলে গণপরিবহনের ব্যাপক সংকটের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ছিল সাধারণ ঘটনা।

এক সময় কাজের সন্ধানে মনীষা চলে আসেন রাজধানী দিল্লিতে। কাজ নেন একটি বাড়িতে। কিন্তু এখানেও বিপদ কম না। নিরাপত্তা শঙ্কায় বাড়িতেই কাটে তার বেশিরভাগ সময়।

মনীষা বলেন, ‘মাসে একবার বা দুবার বাইরে যাই। আমি রাস্তায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।’

দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)-এর পরিবহন গবেষণার সহকারী অধ্যাপক রাহুল গোয়েলের কাছে মনীষার গল্প অবাক হওয়ার মতো কিছু না৷

লিঙ্গ বৈষম্য দৈনন্দিন গতিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে আরও জানতে তিনি ভারতে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা সমীক্ষা থেকে ডেটা ব্যবহার করেন; যা বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে মানুষ কতটা সময় ব্যয় করে তা পরিমাপ করে (সাক্ষাটকারের আগের দিন সবাই কীভাবে তাদের সময় ব্যবহার করেছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে ২০১৯ সালে চালানো জরিপ)।

এর ফলাফলগুলো দারুণ ছিল। জরিপকারীরা যখন বাড়িতে গেছেন তখন ৫৩ শতাংশ নারী বলেছিলেন, তারা আগের দিন বাড়ির বাইরে পা রাখেননি। যেখানে কেবল ১৪ শতাংশ পুরুষ বাড়িতে ছিলেন।

 

ভারতের শহুরে নারীদের অর্ধেক কেন ঘরে থাকে?

 

সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কম ছিল (১০-১৯ বছর)। আর যখন নারীরা মধ্যবয়সে পৌঁছায় তখন ‘গতিশীলতা সামান্য বাড়ে’।

গোয়েল বলেন, ‘রক্ষণশীল সামাজিক নিয়ম নারীদের বাড়ির বাইরে কাজ করতে বা বাড়ির বাইরে যেতে বাধা দেয়। এই প্রবণতা শৈশব থেকেই শুরু হয়।’

গবেষণায় লিঙ্গ ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য প্রকাশ পেয়েছে। নারীরা বেশিরভাগ অবৈতনিক ঘরের কাজ করে, যখন পুরুষরা বাড়ির বাইরের কাজে সময় কাটায়। ২৫-৪৪ বছর বয়সী নারীরা প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৮ ঘণ্টা ঘরোয়া বা পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন। একই বয়সের পুরুষরা এই কাজগুলোতে ব্যয় করেন এক ঘণ্টারও  কম সময়। ৪৪ শতাংশ পুরুষের তুলনায় এই বয়সের নারীদের কেবল ৩৮ শতাংশ বাড়ির বাইরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বিবাহিত থাকা বা কারও সঙ্গে বাস করা নারীদের গতিশীলতা হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সমীক্ষায় দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে পুরুষের গতিশীলতা বেড়ে যায়। এ ছাড়া যেসব নারী বিবাহিত বা যাদের একটি নবজাতক আছে, তারা কম বাইরে যায়; এ ক্ষেত্রে অবশ্য পুরুষের চলাফেরায় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

গোয়েল বলেন, ‘এই ফলাফলগুলো সেই ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব অসমভাবে কেবল নারী ওপর পড়ে।’

কর্মক্ষেত্রে ঢোকার বয়সে (ভারতে সাধাণরত ১৫ বছর বয়স) দেখা যায়, নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন।

গোয়েল বলেন, ‘এটা এমন নয় যে কিছু নারী কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছেন না। আসলে অনেকেই বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন না।’

 

কিছু ফলাফল বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করেছে

অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অশ্বিনী দেশপান্ডে বলেন, ‘ভারতে স্কুল এবং কলেজ ভর্তি হওয়া মেয়েদের সংখ্যা ‘ব্যাপকভাবে’ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ক্লাসে উপস্থিত না হওয়ার খুব কম প্রমাণ রয়েছে।

অধ্যাপক দেশপান্ডে বিশ্বাস করেন, ভারতীয়রাও তাদের বিভিন্ন ভাষায় ভ্রমণের ধারণাটিকে ভিন্নভাবে ‘অনুবাদ’ করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে স্কুল বা কলেজে যাওয়াকে ভ্রমণ হিসেবে দেখব না।’

এ ছাড়া নারীদের কম চলাফেরাকে সামাজিক নিয়ম বা চাকরির অভাব দ্বারা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। উদাহরণস্বরূপ, পুনে শহরের রাস্তায় নারীদের চলাফেলা খুব চোখে পড়ে। 

গোয়েল বলেন, ‘আঞ্চলিক বৈচিত্র্য রয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে অনেক নারী নিয়মিতভাবে বাইরে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, গোয়া হলো একমাত্র রাজ্য যেটি চলাফেরার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লিঙ্গ সমান।’

 

ভারতের শহুরে নারীদের অর্ধেক কেন ঘরে থাকে?

 

একটি সমীক্ষা অনুসারে, তামিলনাড়ুতে ৪৩ শতাংশ নারী কারখানার কাজে নিযুক্ত। অন্যদিকে, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে মেয়েদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

২০০৭ সালে ১৫টি ইউরোপীয় দেশে সময়-ব্যবহারের সমীক্ষার সারসংক্ষেপে দেখা গেছে, লিথুয়ানিয়া ছাড়া সব দেশেই পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি বাইরে যায়। লন্ডনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পার্থক্য নেই। ফ্রান্সে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ভ্রমণ করেন।

অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার ১৮টি শহরে চালানো আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে ৭৬ শতাংশ নারী কাজের জন্য বাইরে যায়; যেখানে পুরুষ বাইরে যায় ৭৯ শতাংশ।

গোয়েল বলেন, ‘সব মিলিয়ে এটাই বোঝা যাচ্ছে যে চলাফেরায় ভারতের মতো লিঙ্গ বৈষম্য বিশ্বে খুব একটা দেখা যায় না।’ বিবিসি অবলম্বনে

/এসপি/
সম্পর্কিত
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
৫৩০০ বছর পরও মমিতে জীবিত অণুজীব
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস
সর্বশেষ খবর
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের