মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ‘ভালোভাবে এগোচ্ছে’, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ও ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। শুক্রবার দেওয়া এই কঠোর হুঁশিয়ারি সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তা পিছিয়ে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের অনুরোধেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কারণ ইরান যুদ্ধ শেষ করতে ‘চুক্তি করতে চায়’।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এমন কোনও নমনীয়তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং তারা নিজেদের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে অনড়। ‘ভীতু আমেরিকান-জায়নবাদী’ বাহিনী সাধারণ মানুষকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ তুলে আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আশপাশ থেকে সরে যান যাতে আপনাদের কোনও ক্ষতি না হয়।” এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিল।
ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘শত্রু’ বন্দরগুলোর উদ্দেশ্যে যাতায়াতকারী সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি ‘বন্ধ’ রাখা হয়েছে। শুক্রবার সকালে তিনটি ভিন্ন দেশের কন্টেইনার জাহাজকে তারা সতর্ক করে ফিরিয়ে দিয়েছে। এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, ভোরে একটি ড্রোন হামলায় তাদের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও শেয়ার বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপান সরকার তাদের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর থেকে সাময়িকভাবে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম জ্বালানি তেলের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করেছে।
ফ্রান্সে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার বলেছেন, “ইরান এভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখতে পারে না। এই সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”
পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফার একটি প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, তেহরান এই প্রস্তাবের জবাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের ‘সার্বভৌমত্বের’ স্বীকৃতি দাবি করেছে। এছাড়া ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা বন্ধের দাবিও জানিয়েছে তারা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাবি করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর তথ্যমতে, মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট আঘাতে ওই স্কুলটি ধ্বংস হয়েছিল।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এক মাসের যুদ্ধে তেহরানের ইউনেস্কো স্বীকৃত গোলেস্তান প্যালেসসহ ১২০টি জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবারও তেহরান, পবিত্র শহর কোম এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উরমিয়াতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
টানা যুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের মাশুল অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনী তাদের সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। তবে সামরিক মুখপাত্র এফি ডেফরিন জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরির জন্য আরও সেনা প্রয়োজন। শুক্রবারও বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, যার জবাবে উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ।








