ইরানের অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিবাদে দেশটিতে বসবাসরত ইরানি নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই অভিযানের অংশ হিসেবে হাজার হাজার ইরানি নাগরিকের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে এবং বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে কয়েক দশকের পুরোনো ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
দুবাইয়ে বসবাসরত বেশ কয়েকটি ইরানি পরিবার জানিয়েছে, তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ভিসা হুট করে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে দশকের পর দেশটিতে বসবাস করে আসছিলেন। এমনকি ভ্রমণের সময় অনেকের ভিসা বাতিল হওয়ায় তারা এখন আর আমিরাতে ফিরতে পারছেন না।
চলতি সপ্তাহে আমিরাত সরকার ইরানি পাসপোর্টধারীদের দেশটিতে প্রবেশ বা ট্রানজিটের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কয়েক দশকের পুরোনো ইরানিয়ান হসপিটাল। শুধু হাসপাতালই নয়, একটি ইরানি সোশ্যাল ক্লাব এবং বেশ কয়েকটি ইরানি স্কুলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা সেখানে বসবাসরত পরিবারগুলোর জন্য টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় পাঁচ লাখ ইরানি নাগরিকের বসবাস। দীর্ঘকাল ধরে এই দুই দেশের মধ্যে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ইরান বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আরব আমিরাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য দুবাই ছিল একটি নিরাপদ আর্থিক কেন্দ্র। বিনিময়ে, ইরানি পুঁজি দুবাইয়ের বাণিজ্যিক উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
দুবাইয়ের ৪৬ বছরের পুরোনো রেস্তোরাঁ আল ওস্তাদ স্পেশাল কাবাব-এর মালিক মাজিদ আনসারি সরকারের এই কড়াকড়ি নিয়ে বলেন, ‘তারা নিরাপত্তা চায়, আমি সেটা বুঝতে পারছি।’ ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা টেনে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের সম্মান করে, আমরাও তাদের করি।’ তবে রেস্তোরাঁর উল্টো দিকের মুদি দোকানদার আলিবিন আলির কণ্ঠে ভিন্ন সুর। তিনি বলেন, ‘দুবাই এখন আমার ঘর, আমি দেশ ছাড়তে ভয় পাচ্ছি; যদি আর ফিরতে না পারি!’
আরব আমিরাত ও ইরানের সম্পর্কের টানাপোড়েন সবসময়ই ছিল, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমিরাতের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। দুবাইয়ের পাম আইল্যান্ড, বুর্জ আল-আরব হোটেল এবং বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ ড্রোন ও মিসাইল ছুড়েছে তেহরান, যা ইসরায়েলে ছোড়া হামলার চেয়েও অনেক বেশি।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব আমিরাত এখন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সহায়তা করবে। যদিও আমিরাতি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের অবস্থান এখনও আত্মরক্ষামূলক। এ ছাড়া ইরানি সম্পদ জব্দ করার মতো কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপও বিবেচনা করছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালির দুই তীরের পারস্য ও আরব জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক শত বছরের পুরোনো। এমনকি বর্তমান আমিরাতের অর্ধেক নাগরিকের পূর্বপুরুষের শেকড় দক্ষিণ ইরানে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মীরা আল হুসেইন বলেন, “যারা অনেক আগে এসেছেন তারা গর্বের সঙ্গে তাদের পারস্য পরিচয় বহন করেন। কিন্তু পরে যারা এসেছেন, তারা এখন ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ সন্দেহে পড়ার ভয়ে নাম পর্যন্ত বদলে ফেলছেন।”
বর্তমানে যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগরের লড়াইতে আটকা পড়া অনেক শিক্ষার্থী মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিরতে পারছেন না। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস এয়ারলাইনস জানিয়েছে, ইরানি নাগরিকদের প্রবেশ বা ট্রানজিট এখন নিষিদ্ধ।
দুবাইয়ের তৌহিদ ইরানিয়ান বয়েজ স্কুল-এর সামনে এখন সুনসান নীরবতা। ভবনের গা থেকে স্কুলের নাম মুছে ফেলা হয়েছে এবং ছাদে উড়ছে আমিরাতের চারটি পতাকা। অন্যদিকে, ইরানিয়ান হসপিটাল-এর জরুরি বিভাগসহ সব প্রবেশপথ বন্ধ। হাসপাতালের একজন নিরাপত্তা প্রহরী জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে অনেক ডাক্তার ও নার্স কাজে এসে দেখেন তারা আর ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
ইরানি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী সাইফ সাবেত বলেন, ‘আমি এবার ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছি। আমার পরিবার, ব্যবসা, জীবন সবই এখন এখানে।’ তবে সবাই তার মতো নিশ্চিন্ত নন। সৈকতে পরিচয়পত্র দেখাতে না পারায় এক ইরানিকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকে ভয়ে মুখ খুলছেন না; একদিকে আমিরাত থেকে বহিষ্কারের ভয়, অন্যদিকে ইরানের সমালোচনা করলে দেশে থাকা পরিবারের ওপর নেমে আসতে পারে তেহরানের কোপ।
আমিরাতি উদ্যোক্তা ও লেখক মিশাল আল গেরগাবি বলেন, “এই যুদ্ধের প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী। ইরানি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সহাবস্থানের যে জায়গা ছিল, সেখানে এখন বড় ধরনের সংশয় তৈরি হবে। ইরান আসলে একজন সহনশীল প্রতিবেশীকে হারালো।”








