ইরানের সবচেয়ে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ খার্গ দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি ইরানের মোট তেল রফতানির ৯০ শতাংশের উৎস। মূলত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে তেহরানকে বাধ্য করতেই ট্রাম্প এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, এবারের বোমাবর্ষণে তিনি তেল স্থাপনাগুলোকে রেহাই দিয়েছেন এবং কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করা হয়েছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে তিনি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, শনিবার তারা মাইন ও মিসাইল স্টোরেজসহ ৯০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একটি রানওয়েতে হামলার ভিডিও চিত্রও তারা প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার আবারও হামলা চালানোর বিষয়টি মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ৮ বর্গমাইলের এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের তিন ভাগের এক ভাগ। ১৯৮৪-৮৫ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইরাকি বোমারু বিমানগুলো ইরানের এই অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করতে বারবার হামলা চালিয়েছিল। ৪১ বছর পর আবারও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রফতানিকারক ইউনিয়নের বোর্ড সদস্য হামিদ হোসেইনি ট্রাম্পের বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘তারা সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেছে। জেটি এবং তেলের মজুদাগারগুলো সুরক্ষিত আছে।’
কেন খার্গ দ্বীপ এত গুরুত্বপূর্ণ?
খার্গ দ্বীপকে ইরানি তেল শিল্পের ‘হৃদপিণ্ড’ বলা হয়। এখান থেকেই ইরানের উৎপাদিত তেলের সিংহভাগ মজুদ ও ট্যাঙ্কারে লোড করা হয়। ইরান নিজে অন্য রফতানিকারকদের জন্য হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করলেও খার্গ দ্বীপ থেকে নিজেদের তেল লোড করা অব্যাহত রেখেছে।
জেপি মরগানের বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার মতে, দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা ইরানের ১০ থেকে ১২ দিনের রফতানির সমান। দ্বীপটির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল। কানেভা সতর্ক করে বলেন, ‘যদি খার্গ দ্বীপ অকেজো হয়ে যায়, তবে বিকল্প রফতানি ব্যবস্থার অভাবে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে।’
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও ‘রেড লাইন’
ইরান আগেই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল যে, খার্গ দ্বীপে হামলা হবে তাদের জন্য চূড়ান্ত সীমারেখা। এর জবাবে তারা প্রতিবেশী তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে।
শনিবার ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো ‘অবিলম্বে ধ্বংস এবং ছাইয়ে পরিণত করা হবে’। বিবৃতিতে সরাসরি খার্গ দ্বীপের নাম না নিলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তেলের বাজারে প্রভাব
এখন পর্যন্ত কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হওয়ায় বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও, যদি তেলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বিশ্ববাজার থেকে দৈনিক আরও ১০ লাখ ব্যারেল তেল হারিয়ে যেতে পারে। ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তের পর এটি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা।
কে কিনছে ইরানের তেল?
ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীন। বিশেষ করে চীনের ছোট বেসরকারি শোধনাগারগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এই তেল কেনে। যুদ্ধের আগে চীনের সমুদ্রপথে আসা তেলের ১৩ শতাংশই ছিল ইরানি। তথ্য প্রদানকারী সংস্থা কেপলার-এর মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও গত শুক্রবার পর্যন্ত অন্তত ১০টি ট্যাঙ্কার খার্গ দ্বীপ থেকে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল সংগ্রহ করেছে।









