পুড়ছে পশ্চিমবঙ্গ, বিপাকে মমতা

Send
আশিষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ০০:১৯, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১০, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৯

ভারতের অন্য যেকোনও স্থানের চেয়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতা ও আন্দোলনের ঘটনা একটু অন্য দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাই এখানে তরুণদের বিজেপি বিরোধী প্রতিটি স্লোগান মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের জন্য ইতিবাচক। ফলে মোদির সিদ্ধান্ত যত বিতর্কে পড়বে তৃণমূল ততটাই তরুণদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।   

তবে মমতাসহ তার নেতারা এটাও জানতেন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের এই ক্ষোভ-বিক্ষোভের তীর প্রকারান্তরে ঘুরে আসতে পারে তাদের দিকেও। এই আন্দোলনে যে পাঁচটি ট্রেন পুড়িয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা কিংবা ১১টি রেল স্টেশনে অগ্নিসংযোগ করার ঘটনা ঘটেছে তার সবকিছুই চোখের সামনে ঘটার পরও তাদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নেননি মমতা। এ ঘটনায় অন্তত ২৮টি দূরপাল্লার ট্রেনসূচি বাতিল করা হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে রেল সংযোগ। টাকার অংকে এর ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি রুপি।

রাজ্য সরকার রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের সহায়তাও করেনি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই এমনটা করছেন মমতা। বিজেপি প্রধান অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে তৃণমূলের অঘোষিত বার্তা ছিল, ‘আপনারা সিএএ বানিয়েছেন, এখন আপনারা আপনাদের রেলওয়ে বাঁচান এবং এই সংকট সামাল দেন।’ 

তবে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য তা ছিল না। তৃণমূলের নীরব থাকাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আন্দোলনকারীরা সরকারি বাস, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পুলিশের গাড়িসহ অন্তত ১৭টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে। পুড়িয়ে দিয়েছে শত শত মোটরবাইক। ব্যক্তিগত গাড়ি, বাহন ও বাড়িতে হামলা চালিয়েছে তারা। পুলিশ থানা থেকে বের হয়নি। যেখানেই পুলিশ হস্তক্ষেপ করতে গেছে, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে। কয়েকটি থানাতেও আক্রমণ করেছে তারা। অর্থাৎ তারা তৃণমূল সরকারকেও খুব একটা ভালোবাসে না।

২০১১ সালের পর এবারই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা পেল মমতা। এটা এখন স্পষ্ট যে মমতা ব্যানার্জিকে আর নিজেদের উদ্ধারকর্তা মনে করে না পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা। মমতাও এখন এই আন্দোলন নিয়ে উদ্বিগ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কয়েকজন নেতা বলেন, এই বিক্ষোভ নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে যা দলের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিম ভোটারদের নিয়ে যতটা তুষ্ট ছিল, তা এখন আর নেই। এখন মুসলিমদের মধ্যে উগ্র একটি গোষ্ঠী তৃণমূলের রাজনৈতিক স্থানটি দখল করে নিয়েছে। ক্ষমতাসীনরা মুসলিমদের দাবি ও মনোভাবের সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। ৮-৩০ বছর বয়সী মুসলিমদের কাছে তৃণমূলের যে সমর্থন ছিলো তা ধরে রাখতে পারেননি মমতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান,এ আন্দোলনে বেশ কিছু নতুন বিষয় লক্ষ্য করেছেন তারা। মিদনাপুর থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত আন্দোলনে বাঙালি ও অবাঙালিরা সক্রিয়। তাদের সিএএ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। কী নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। অনেকেই ভারতের পতাকা বহন করলেও কয়েকজনের হাতে কালো পতাকাও ছিল। আর মুখে ছিলো পাক স্লোগান ‘লাড়কে লেঙ্গে আজাদি’ অর্থাৎ লড়াই করেই স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবো। কয়েকটি প্ল্যাকার্ডে ‘নো সিএএ, নো এনআরসি’ ও লেখাও ছিল।

এই আন্দোলনে রাজ্য প্রশাসনের তেমন কোনও পদক্ষেপ ছিল না। তারা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল না। সরকারি রেলপুলিশকে তো ১১টি রেল স্টেশনের কোথাও দেখা যায়নি। স্টেশনে হামলা ও লুটপাট চালানো হলেও পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি। শুধুমাত্র ‍তৃণমূল নেতা ও মন্ত্রীরা যেখানে ছিলেন, সেখানেই পুলিশ ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছেন যে রাজ্যের প্রত্যেক ৩০০ জনের ব্লকে তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকরা বিজেপিবিরোধী আন্দোলন করবে। কিন্তু সহিংসতা চললেও এই আন্দোলন খুব বড় রূপ ধারণ করেনি।

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলপন্থী সংবাদপত্রগুলোও মুসলিম তরুণদের মাঝে ক্ষোভ ও সহিংসতার মাত্রায় স্তব্ধ। দলের সিনিয়র নেতা ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তারা জানায়, এখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থাকতে পারে। মমতার আহ্বানের পরও ফিরহাদ হাকিমের মতো তৃণমূল নেতারা এই সহিসংতার সমালোচনা করেন। বুর্দওয়ান, হাওরা ও অন্যান্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তৃণমূল নেতারা বেশ কয়েকটি সভার আয়োজন করেছে।

সবশেষে প্রশাসন এই বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক উগ্রতার মুখে তৃণমূল পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৎকালীন সরকারও একইভাবে ভেঙে পড়ে। উগ্রবাদী কৌশলে আশ্রয় নিয়ে  বিপাকে পড়েছিল তারাও।

সেসময় অভিযোগের আঙুল ছিল সর্বভারতীয় মজলিস-ই-এত্তহাদুল মুসলিমিনদের ওপর-যাদের নেতৃত্ব দিতেন ড. আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।  সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়াচ্ছে। রাজ্য পুলিশ তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার শুরু করেছে এবং মিছিলের অনুমতি দিচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী কিশানগঞ্জে কয়েকটি আসন জিতেছে তারা আর এতেই  শঙ্কিত হয়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের একাংশ ইফতার মাহফিলে মমতার হিজাব না পড়ে আসা ও ভুল উচ্চারণে ইনশাল্লাহ ও আল্লাহ হাফেজ বলায় ক্ষুব্ধ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন মনোভাবের কারণে পাল্টা জবাব দেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে শুধু ভোট নেওয়া নয়,তাদের শিক্ষা ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিতে মমতার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাদেরকে ‘বেকারত্ব দূর করার আহ্বান জানিয়ে  ওয়াইসি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা পুরো ভারতের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র অবস্থায় আছে আর সেটা আপনার শাসনামলে। আপনি তাদের জন্য কী করেছেন? শুধু তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই তুলে ধরেছেন।’ তার অভিযোগ, অপ্রয়োজনীয়ভাবে সাম্প্রতিক সহিংসতায় তার দলের নাম জড়িয়েছেন মমতা।

এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণ ছাড়া কিছু বলা না গেলেও নতুন সহিংসতার ধারায় আভাস মেলে যে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিপাকে ফেলতেই এমনটা করেছে রাজ্য সরকার। আর সেটার ফল খুব একটা ইতিবাচক হয়নি।

এর মানে হচ্ছে মমতা কন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে বড় বিপদ আসছে। তারা অনেকদিন ধরেই মুসলিম ভোটের পর নির্ভর করছে। কিন্তু ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটার সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনের তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

২০২১ সালের নির্বাচন এগিয়ে আসছে। মুসলিম ভোটের একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি বিপক্ষে চলে যায় তবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ধস নামতে পারে। আর পুলিশি আক্রমণের শিকার এআইএমআইএম ড. ওয়াইসিকে নিয়ে এসে করতে পারে বড় জনসভা।

দলটির রাজ্য মুখপাত্র বলেন, তারা বাঙালি মুসলিমদের নিয়ে বিগত ৩-৪ বছর ধরে গোপনে কাজ করে চলেছেন। এখন তার ফলও পেতে শুরু করেছেন তারা।

এছাড়া রাজ্য পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতাও চোখে পড়ছে। কিন্তু কেউ অভিযোগ করছে না। কারণ পুলিশের প্রধান যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজেই।

/এমএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ