ঘরে-বাইরে চাপের মুখে ইরান সরকার

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:০০, জানুয়ারি ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৫, জানুয়ারি ১৩, ২০২০

ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর চাপের মুখে পড়েছে ইরান। বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে জনগণ। রবিবার রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ করেছে তারা। বিক্ষোভ থেকে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পদত্যাগেরও দাবি ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বিরুদ্ধে তাজা গুলি ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে টুইট করে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া ঘটনায় দায়ীদের বিচার চেয়েছে ইউক্রেন ও কানাডা। কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, দোষীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেবেন না তারা।








গত ৮ জানুয়ারি (বুধবার) জেনারেল সোলাইমানি হত্যার বদলা নিতে মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দিনেই ১৭৬ আরোহীসহ বিধ্বস্ত হয় ইউক্রেনগামী বিমান। ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ উইক তাদের অনুসন্ধানে দাবি করে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রথমে অস্বীকার করলেও এক পর্যায়ে তেহরান বিমান ভূপাতিত করার কথা স্বীকার করে। এরপর থেকেই সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়।
রবিবার রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তা উপেক্ষা করে তারা নিহতদের স্মরণ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেখানেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে গুলি চালায় পুলিশ। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই বাজে পরিস্থিতি ছিলো। তারা বারবার টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করছিলো। ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। সবাই চিৎকার করছিলো। আমার পাশে থাকা এক মেয়ের পায়ে গুলি লাগে।’
এছাড়া বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তেহরানের শহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে স্লোগান দেওয়া হয়, ‘তারা আমাদের মিথ্যা বলে, আমেরিকার কথা বলে। কিন্তু আমাদের শত্রু তো আসলে এখানেই।’ এছাড়া ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীকে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে তুলনা করে তারা। স্লোগানে বলা হয়, ‘আমাদের কাছে তোমরাই আইএস।’
সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়িকে আজাদ স্কয়ারে যেতে দেখা যায়। অনেকগুলো গাড়িতে আটক ব্যবস্থাও ছিলো। কিন্তু তারপরও কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী সামনে এগিয়ে যেতে থাকে এবং স্লোগান দিকে থাকে, ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক।’ আয়াতুল্লাহ খামেনিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলে, ‘তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। তুমি দেশ ছেড়ে দাও।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি তিন দশক ধরে তার আসনে রয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী তার ক্ষমতার কোনও সময়সীমা নেই।


সম্প্রতি আরও একবার পুরো দেশ এক হয়েছিলো। ইরান জেনারেল কাশেম সোলেইমানির মৃত্যুতে শোক জানাতে জড়ো হয়েছিলো লাখ লাখ মানুষ। ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। গত ৩ জানুয়ারি বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান এই সামরিক কর্মকর্তা। এরপর তার সম্মানে তেহরানের রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। সব রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে সবাই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, এবার নতুন করে এক হয়েছে ইরানিরা। এএফপি জানিয়েছে, কয়েকজায়গায় সোলেইমানির পোস্টার ছিড়ে ফেলা হয়েছে। বিক্ষোভ অনেক জায়গায় সহিংস হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
এর আগে গত বছর গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিলো ইরানি জনগণ। সেসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইন্টানেট বন্ধ করে দিয়েছিলো সরকার। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টির হিসেব অনুযায়ী, পুলিশের অভিযানে প্রাণ হারিয়েছিলো ২০৮ জন বিক্ষোভকারী। এছাড়া জাতিসংঘও জানায় যে ইরান গুলি করে হত্যা করতে চায় এমন ভিডিও তাদের কাছে ছিলো।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ
ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে ইরান। রবিবার দেশটির পার্লমেন্টে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান কমান্ডার হুসেন সালামি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেন এবং ক্ষমা চান। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ভিুল করেছি। আমাদের ভুলে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। তব এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো না। আমি আমার সারাজীবনে এতটা অনুতপ্তবোধ করিনি।’
হুসেন সালামি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমিও যেন বিমানে তাদের সাথে পুড়ে মরতাম।’
এছাড়া ইরানে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, এই মারাত্মক ভুলে তিনি খুবই ব্যাথিত। তিনি শুধু নিহতদের পরিবারের কথাই ভাবছেন ও প্রার্থনা করছেন।
তবে ইরানের পদচ্যুত শাহ এর সন্তান রেজা পাহলাভি এক টুইটে বলেন, ‘এটা কোনও মানুষের ভুল নয়। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। খামেনি ও তার সরকারের পদত্যাগ করা উচিত। তবে ইরানি আইনপ্রণেতারা এই ভুল স্বীকারকে স্বাগত


এর আগে নিজেদের ভুলে বিমান বিধ্বস্তের কথা অস্বীকার করেছিলো ইরান। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও তাকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলো তারা। ভুল স্বীকার করার পর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে নেতৃত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও পড়ে ইরান। বিমানটিতে ইরানি ছাড়াও ৫৭ জন কানাডীয় ছিলো। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন টুডো বলেন, ‘দোষীরা শাস্তি না পাওয়া পর্যন্ত কানাডা বিশ্রাম নেবে না। প্রত্যেক পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আটক
এছাড়া ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে ‘অস্থায়ী আটক’ করায়ও সমালোচনার শিকার হয়েছে ইরান। দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের মতে, রাষ্ট্রদূত ম্যাককেইরকে তেহরানের আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উষ্কানির অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তি পেয়ে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এক টু্ইটবার্তায় জানান, তিনি কোনও উষ্কানি দেননি। বরং নিহতদের সম্মান জানাতে গিয়েছিলেন সেখানে। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব বলেন, এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। একই মন্তব্য করা হয় জার্মান ও ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও।
ঘটনার পর রবিবার ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে দেশটির একটি পতাকা পুড়িয়ে দেয় ইরানপন্থী সমর্থকরা। সেসময় তাদের হাতে কাশেম সোলেইমানির ছবি ছিলো।
এদিকে বর্তমানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র দুর্নীতি করে উপস্থিত থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছ।’ এই অবস্থায় আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে বৈঠক শেষে খামেনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে পূর্বের যেকোনও সময়ের চেয়ে পারষ্পরিক সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিদেশি আগ্রাসন ও প্রভাব ঠেকাতে আমাদের এটা করতে হবে।
বিমান বিধ্বস্তের কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো ইরান। কাসেম সোলাইমানির হত্যার প্রতিশোধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো বলে জানায় তারা। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে ইরানের হামলায় কোনও মার্কিন সেনা হতাহতের শিকার হয়নি।


ট্রাম্পের টুইট ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ইতোমধ্যে বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক টুইটবার্তায় তিনি বলেন, ‘ইরানের নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলছি বিক্ষোভাকরীদের হত্যা করবেন না। বিশ্ব দেখছে, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নজর রাখছে।
টুইটের কয়েকঘণ্টা আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাতকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার দাবি করেন, ট্রাম্প এখনও ইরানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠবের অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, আমরা কোনও পূর্বশর্ত ছাড়াই বসতে রাজি আছি। আমরা কয়েকটি ধাপে অগ্রসর হতে চাই যেন ইরান আরও স্বাভাবিক একটি দেশে রুপ নেয়।’

/এমএইচ/

লাইভ

টপ