দিল্লিতে সহিংসতার নেপথ্যে বিজেপি নেতার উসকানি?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০৫:৩০, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৫, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে দিল্লির উত্তরপূর্বের মৌজপুরে সোমবার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের জেরে যানবাহন ও স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের ভজনপুর ও চান্দ বাগ এলাকাতেও। দিনভর এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত চারজন নিহত ও অপর প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছে। এনিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ওই এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটলো। ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভির এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এসব সহিংসতার নেপথ্যে উসকানি দিয়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র।উত্তর পূর্ব দিল্লিতে সোমবার ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে

বিতর্কিত সিএএ আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে অবস্থান নিয়ে টানা দুই মাস ধরে বিক্ষোভ করে আসছেন নারীরা। ওই অবস্থানের কারণে বন্ধ হওয়া সড়ক কর্তৃপক্ষ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পর গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে জাফরাবাদ মেট্রোস্টেশনে একই ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জবাবে পরদিন (রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল তিনটায় প্রায় এক কিলোমিটার দূরের মৌজপুর চকে সিএএ সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে টুইট করেন দিল্লির বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। ওই দিন সাড়ে চারটা নাগাদ উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও পরস্পরের দিকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেন বিজেপি নেতা কপিল। ওই ভিডিওতে তাকে দিল্লির উত্তরপূর্ব পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ভেদ প্রকাশকে পাশে নিয়ে সিএএ-বিরোধীদের হুমকি দিতে দেখা যায়। তাকে বলতে শোনা যায়, তার সমর্থকেরা শুধুমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে আর তারপর তারা দিল্লি পুলিশের কথাও শুনবে না এবং সিএএ বিরোধিতাকারীদের অবরোধ করে রাখা রাস্তা পরিষ্কার করে দেবে।পুলিশ পাশে নিয়ে দিল্লি পুলিশকে আল্টিমেটাম দেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র

রবিবার রাতে ছড়িয়ে পড়া অপর এক ভিডিওতে ওই অঞ্চলের রাস্তায় ট্রাক থেকে ইট নামিয়ে রাখতে দেখা গেছে। এসব ট্রাকের আশেপাশে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে শোনা যায়।

সোমবার জাফরাবাদ ও মৌজপুরে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ শুরু হয়। এদিন সকালে সিএএ সমর্থকদের মৌজপুর চকে লাউডস্পিকারে গান বাজাতে দেখা যায়। এসব গানের মধ্যে ছিলো ‘যারা আজাদি (স্বাধীনতা) চায়, তাদের পাকিস্তানে পাঠানো উচিত’, ‘হিন্দুরা ভারতের গর্ব, গেরুয়াধারীরা আসবে, ভারত মাতার ডাকে রক্তের রঙে সাজবে গুলি’।সংঘর্ষের সময় সিএএ বিরোধিতাকারীদের এক মুসলিম ধর্মাবলম্বীকে মারধর করতে দেখা যায়

মৌজপুর ও জাফরাবাদের আশেপাশে মোতায়েন করা হয় পুলিশ। তবে মৌজপুর চকে উসকানিমূলক গান বাজানো হতে থাকলেও তা থামাতে পুলিশের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।

বেলা বারোটার দিকে মৌজপুর মেট্রো স্টেশনের বাইরে সিএএ সমর্থক ও বিরোধীদের দুটি ছোট গ্রুপ পরস্পরের দিকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। তবে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তবে এর দুই ঘণ্টা পর বেলা দুইটার দিকে সিএএ সমর্থকেরা জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের দিকে রওনা দেয়। আর জাফরাবাদ থেকে সিএএ বিরোধীরা মৌজপুর চকের দিকে রওনা দেয়। পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কায় দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেওয়া শুরু করে পুলিশ। তবে পর্যাপ্ত পুলিশ পৌঁছানোর আগেই দুই পক্ষ পরস্পরের ওপর মারাত্মক পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করলে পদদলনের মতো ঘটনা শুরু হয়। ওই সময়ে একটি অটোরিকশাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে লাল শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তিকে এক নিরস্ত্র পুলিশ সদস্যকে তাড়া করতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্যদের থেকে দূরে সরে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে আকাশের দিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ পাথর নিক্ষেপ চলতে থাকলেও পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে পুলিশ। সহিংসতার পর জাফরাবাদ ও মৌজপুর এলাকায় প্রায় আটশো থেকে নয়শো পুলিশ সদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।সংঘর্ষে আহত এক মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে দেখা যায়

জাফরাবাদ ও মৌজপুর এলাকায় শুরু হওয়া সংঘর্ষ পরে আশেপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় কয়েকটি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করার পরেও সংঘর্ষ হওয়ার কথা জানিয়েছে এনডিটিভি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ৫৫ বছরের পুরনো নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন করে ভারত। সংশোধিত আইনে প্রতিবেশি তিন দেশ (বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, পার্সি ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হিন্দু জাতীয়বাদী দল বিজেপি সরকারের প্রণীত এই আইনটিকে মুসলিমবিরোধী ও ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়। এসব বিক্ষোভে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় সোমবারের আগেই নিহত হয় অন্তত ২৫ জন। তবে তবে বিজেপি সরকার বলছে, প্রতিবেশি দেশগুলোতে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত মানুষদের সুরক্ষা দিতে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

/জেজে/বিএ/

লাইভ

টপ
X