ভারতে শ্রমিকদের ওপর জীবাণুনাশক স্প্রে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, মার্চ ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৭, মার্চ ৩০, ২০২০

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ভারতজুড়ে চলছে ২১ দিনের লকডাউন। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের ঘরে ফেরার মরিয়া চেষ্টাকে ঘিরে এক অবর্ণনীয় ও চরম অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের বরেলি জেলায় সম্প্রতি একদল অভিবাসী শ্রমিকের ওপর রীতিমতো বৃষ্টির মতো করে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সুরক্ষা পোশাক পরিহিত একদল লোক অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর জীবাণুনাশক স্প্রে করছে। এই শ্রমিকদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। রাস্তায় বসে থাকা অবস্থায় এভাবে তাদের ওপর স্প্রে করা হয়।

গত শনিবার বিশেষ বাসে করে এই অভিবাসীদের দিল্লি, হরিয়ানা ও নয়ডা থেকে উত্তরপ্রদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা হয়। উত্তরপ্রদেশে হতদরিদ্র এই মানুষদের ওপর এভাবে স্প্রে করার সময় ঘটনাস্থলে হাজির ছিল পুলিশ সদস্যরা। তবে তারা ছিল দর্শকের ভূমিকায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘নিজেদের চোখ বন্ধ করুন। শিশুদের চোখ বন্ধ করে দিন।’

টুইটারে দেওয়া পোস্টে এ ঘটনার সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। তিনি লিখেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশ সরকারের কাছে আর্জি জানাচ্ছি, আমরা সবাই একসঙ্গে এই সংকটের মোকাবিলা করছি। দয়া করে এমন অমানবিক কাজ করবেন না। এই শ্রমিকরা ইতোমধ্যেই অত্যন্ত ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। তাদের ওপর এভাবে রাসায়নিক স্প্রে করবেন না। এটা ওদের রক্ষা করবে না। বরং তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।’

উত্তরপ্রদেশের একজন সরকারি কর্মী অবশ্য জানিয়েছেন, এতে তারা অমানবিকতার কিছু দেখছেন না। তিনি বলেন, আমরা অমানবিক হতে চাই না। সবাইকে স্যানিটাইজ করাটা অত্যন্ত জরুরি। ওখানে ভিড় ছিল। সুতরাং যেটা ঠিক মনে হয়েছে আমরা সেটাই করেছি।

তার দাবি, অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর ক্লোরিন ও পানি মিশিয়ে স্প্রে করা হয়েছে। এটি কোনও রাসায়নিক দ্রবণ নয়। তারপরও শ্রমিকদের চোখ বন্ধ করে নিতে বলা হয়েছিল।

এদিকে বিদ্যমান লকডাউনের ফলে রাজধানী দিল্লি কিংবা দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ, কোট্টায়ামের মতো বিভিন্ন শহরে কর্মরত বহু শ্রমিক নিজেদের গ্রামে ফিরতে চাইছে। সেজন্য তারা বাস, ট্রাক কিংবা ট্রেন; যে কোনও ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছে। দিল্লির আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনালে কাতারে কাতারে মানুষের ভিড় উপছে পড়ছে। কাঁধে ব্যাগ বা মাথায় মালপত্র নিয়ে, কেউ কেউ কোলের বাচ্চাকে নিয়ে যে কোনওভাবে একটা বাসে বসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজ্যকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের সীমান্ত সিল করে দিয়ে এই যাতায়াতের চেষ্টা যে কোনওভাবে রুখতে হবে। লকডাউনের নির্দেশ কঠোরভাবে বলবৎ করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক কেন এভাবে একযোগে ঘরে ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছে? এর প্রধান কারণ তারা আশঙ্কা করছে, বড় বড় শহরগুলোতে রুটিরুজি হারিয়ে তিন সপ্তাহের লকডাউনে তাদের এখন স্রেফ না খেয়ে মরতে হবে।

করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সরকারের নির্দেশ ছিল ‘স্টে পুট’ – অর্থাৎ যে যেখানে আছে আপাতত সেখানেই থাকুক। অসংগঠিত খাতের কোটি কোটি শ্রমিক, যারা ছোটখাটো দোকান-রেস্তোরাঁয় কাজ করে কিংবা নির্মাণ শিল্পে দিনমজুরের কাজ করে তারা এই নির্দেশ পালনের সাহস দেখাতে পারেনি। বস্তিতে বাড়িভাড়া কীভাবে দেবেন, এতগুলো দিন কীভাবে নিজের বা পরিবারের পেট টানবেন? এমন চিন্তা থেকেই তারা ‘যা হবে হোক’ ভেবে পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

ট্রেন, বাস নেই – তারপরও শত শত মাইল দূরে নিজের গ্রামের উদ্দেশে তারা হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিলেন সেদিন থেকেই। রাজস্থান থেকে বিহার – প্রায় ১২শ’ মাইল পথ হেঁটে পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসিক যাত্রা পর্যন্ত শুরু করেছেন কেউ কেউ। ভারতের বিভিন্ন হাইওয়েতে চোখে পড়ছে এ ধরনের অভুক্ত বা আধপেট খাওয়া মানুষের ক্লান্ত মিছিল।

রবিবার থেকে সেই বাস সার্ভিসও বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় সরকার সব রাজ্যকে কড়া নির্দেশ পাঠিয়েছে সীমান্ত সিল করে মানুষের এই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া আটকাতেই হবে। ৩০ মার্চ সোমবার দিল্লি পুলিশ শ্রমিকদের দিল্লি থেকে উত্তরপ্রদেশ যাওয়ার পথে বর্ডারে আটকে দিয়েছে। তারপরও কেউ কেউ মরিয়া হয়ে যমুনা নদী পেরিয়ে দিল্লি থেকে পাশের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে – এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। এমন বাস্তবতায় ভারতের বিভিন্ন বড় শহর থেকে এই লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক শেষ পর্যন্ত এই লকডাউনের ভেতর নিজেদের গ্রামে আদৌ পৌঁছাতে পারবেন, এমন সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তবে যারা এর মধ্যেই দুই তিনদিন হেঁটে ফেলেছেন, তারা হয়তো কেউ কেউ পারবেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও ভারতের অভিবাসী শ্রমিকদের এই চরম দুর্দশায় ফেলার জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রবিবারও তার মাসিক রেডিও ভাষণ ‘মন কি বাতে’ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ভারতের স্বার্থেই এই লকডাউন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নইলে অন্য বহু দেশের মতো আমাদেরও করেনাভাইরাসের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।’ সূত্র: এনডিটিভি।

/এমপি/

লাইভ

টপ