মহামারিতে চীনকে হটিয়ে ‘বিশ্বের কারখানা’ হতে চায় ভারত

মহামারিতে চীনকে হটিয়ে ‘বিশ্বের কারখানা’ হতে চায় ভারত

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২২:১০, মে ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৪৬, মে ১৯, ২০২০

করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বের ৪৭ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর অভুতপূর্ব বৈশ্বিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে চীন। এতে করে বিশ্বের কারখানা হিসেবে চলমান রাজত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী ভারত একটি সুযোগের হাতছানি দেখতে পাচ্ছে এবং চীনকে সরিয়ে বিশ্বের কারখানায় পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা করছে দেশটি।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভারতের পরিবহনমন্ত্রী নিতিন গাড়করি বলেছেন, বিশ্বে চীনের অবস্থা দুর্বল হওয়া মানে আরও বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ভারতের জন্য অভিশাপরূপী আশীর্বাদ। প্রায় ব্রাজিলের সমান জনসংখ্যার উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ এরই মধ্যে একটি অর্থনৈতিক টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে, যেটির কাজ হবে চীনকে বাদ দিতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য।

ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, লুক্সেমবার্গের মতো আয়তনের ভূমি প্রস্তুত করছে ভারত যাতে করে চীন থেকে কোম্পানিগুলো নিজেদের স্থানান্তর করতে পারে এবং এরই মধ্যে সহস্রাধিক মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

ভারতের জাতীয় বিনিয়োগ প্রসার সংস্থা ইনভেস্ট ইন্ডিয়া’র প্রধান নির্বাহী দীপক বাগলা বলেন, এই যোগাযোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোভিড এই প্রক্রিয়াকে শুধু দ্রুততর করবে এদের মধ্যে যেসব কোম্পানি চীন ছাড়তে চায়।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিনিয়োগ প্রসারে নিয়োজিত প্রভাবশালী লবি গোষ্ঠী ইউএস-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিল জানিয়েছে, ভারত এই প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নিশা বিসওয়াল বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি সাপ্লাই চেইনকে আকৃষ্ট করতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ে উদ্যোগ বাড়িয়েছে ভারত। যেসব কোম্পানির এখন ভারতে উৎপাদন করছে সেগুলো হয়ত চীনে কারখানা কমিয়ে ভারতেই উৎপাদন বাড়াতে পারে।

নিশা জানান, তবে সবকিছু এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতির এমন সময়ে পুরো সাপ্লাই চেইনের স্থানান্তর বলা যত সহজ বাস্তবায়ন করা ততো কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদ রুপা সুব্রামনিয়া বলেন, এসব কোম্পানির বেশিরভাগই নগদ ও পুঁজি সংকটে পড়েছে মহামারিতে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করবে।

দীর্ঘদিন ধরে চীনকে পর্যবেক্ষণ করা ফিনান্সিয়াল টাইমসের সাবেক হংকং ব্যুরো প্রধান রাহুল জ্যাকবের মতে, ভারত সরকার ভূমির ব্যবস্থা করার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা সঠিক পথেই রয়েছে। তবে শুধু ভূমি পাওয়াতেই বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের কার্যক্রম স্থানান্তর করে ফেলবে না। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যেমনটি মনে করে প্রডাকশন লাইন্স ও সাপ্লাই চেইন্স অনেক জটিল প্রক্রিয়া। খুব দ্রুতই সেটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কঠিন।

আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো উৎপাদনের যে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলে সেগুলোর জন্য বন্দর ও মহাসড়কের মতো চীনের সমন্বিত অবকাঠামো এবং উন্নতমানের শ্রম ও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে। যা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ভারতে কারখানা স্থাপন না করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে বিশ্বের সাপ্লাই চেইনের দেশটির অতোটা একীভুত না।

গত বছর এশিয়ার ১২টি দেশের সঙ্গে বহুপাক্ষিক একটি বাণিজ্য চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছে নয়া দিল্লি। রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকনোমিক পার্টনারসিপ নামের এই চুক্তি নিয়ে সাত বছর আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। এমন কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ভারতীয় রফতানিকারকরা ও বাণিজ্যিক অংশীদাররা বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে না।

‘দ্য ফিউচার ইজ এশিয়ান’ বইয়ের লেখক পরাগ খান্না বলেন, সিঙ্গাপুরে বিক্রি করতে চাই এমন কিছু কেন আমি ভারতে তৈরি করব? প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকা।

তিনি মনে করেন, আঞ্চলিক সংহতিকরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্য শুরুই হয় ‘কোথায় বিক্রি করা হবে’ মডেল অনুসারে। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো উৎপাদনের সময় দূরের উৎসের চেয়ে চাহিদার কাছাকাছি তথাকথিত কাছের উৎস ব্যবহার করতে চায়।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে ভারতের ভঙ্গুর সম্পর্ক ও অসম নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক কোম্পানির জন্য চিন্তার কারণ। একেবারে প্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্য বিক্রিতে ই-কমার্স কোম্পানিকে বাধা ও এফডিআই নীতিমালা ভঙ্গের কারণে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিনিয়োগ আসা কঠিন করে তুলেছে। আশঙ্কা রয়েছে, মহামারিতে নিজেকে রক্ষায় সুরক্ষার দেয়াল তৈরি করেছে ভারত।

জাতির উদ্দেশে দেওয়া সাম্প্রতিক এক ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘দেশের জন্য সরব হোন’। ভারতীয় ঠিকাদারদের জন্য বিদেশি কোম্পানির দরপত্রের সর্বোচ্চ পরিমাণ বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

নিশা বিসওয়াল বলেন, ভারত যত নজরদারির স্থিতিশীলতার উন্নতি করতে পারবে ততই ভারত নিজেকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করার দিকে এগিয়ে যাবে।

ভারত না হলে কোন দেশ?

জ্যাকবের মতে, এখন যা পরিস্থিতি তাতে করে চীনবিরোধী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সুফল পেতে পাওয়ায় এগিয়ে রয়েছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান।  শেষের দুটি দেশ এগিয়ে রয়েছে এবং পিছিয়ে আছে প্রথম দুটি দেশ।

প্রায় এক দশক আগে থেকে মজুরি ও আনুসাঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়াতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চীন থেকে এসব দেশে কারখানা স্থানান্তর শুরু করে। ধীরগতির এই স্থানান্তর চীন-মার্কিন বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি গতি পেয়েছে।

সাউথ চায়না মনিং পোস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস আগে ২০১৮ সালের জুন মাস থেকে ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। তাইওয়ানের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ। সূত্র: বিবিসি

/এএ/

লাইভ

টপ