চীনকে টেক্কা দিতে বাংলাদেশকে হারাতে হবে ভারতকে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:২০, অক্টোবর ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৮, অক্টোবর ১৯, ২০২০

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৮৮ ডলার, একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৭৭ ডলার। এই তথ্য সামনে আসার পর ভারতের অর্থনীতি নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা, একইসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিরও প্রশংসা উঠে আসছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ-এ কলামিস্ট অ্যান্ডি মুখার্জির এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় উভয় দেশের অর্থনীতি, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া ও ভারতের পিছিয়ে পড়ার কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চীনকে টেক্কা দিতে হলে আগে বাংলাদেশকে হারাতে হবে ভারতকে। বৃহৎ শক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকার পর বাংলাদেশের মতো দেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকলে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর এলাকায় দিল্লির প্রভাব ম্লান হতে পারে। বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য লেখাটি তুলে ধরা হলো—



















প্রতিবেশী বাংলাদেশের চেয়ে ২০২০ সালের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের কম হতে পারে, এই খবরে দেশটির কোভিড-১৯ অর্থনৈতিক হতাশা এই সপ্তাহে আরও নিরাশায় পতিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক হালনাগাদ হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু টুইটারে লিখেছেন, যেকোনও বিকাশমান অর্থনীতির অগ্রগতির খবর ভালো। কিন্তু ভারতের জন্য তা বিরাট ধাক্কা। পাঁচ বছর আগেও যে দেশের চেয়ে ২৫ শতাংশ এগিয়ে ছিল, তারা এখন সেই দেশের পেছনে।
১৯৯০-এর দশকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর থেকেই চীনের দ্রুত সম্প্রসারণ ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে ভারত। তিন দশক এই লক্ষ্যে চলার পর বাংলাদেশের পেছনে পড়ার ফলে ভারতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। চীনকে মোকাবিলায় কার্যকর অংশীদারিত্ব চায় পশ্চিমারা। কিন্তু তারা চায় না সেই অংশীদার ভারত নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ুক।


এ বিষয়ে নিম্ন দক্ষতা আত্মবিশ্বাসেও ঘাটতি তৈরি করতে পারে। বড় শক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা দেশ যদি কোনও ছোট দেশের পেছনে পড়ে যায়, যে ছোট দেশকে স্বাধীন করা জন্য ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল তারা। তাহলে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত সাগরে সেই দেশের প্রভাব ম্রিয়মাণ হয়ে যায়।
কোথায় ভুল হলো? নিশ্চিতভাবে করোনাভাইরাস মহামারি দায়ী। বাংলাদেশে নতুন সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছে মধ্য জুনে। কিন্তু দৈনিক শনাক্তের রেকর্ডের পর ভারতে তা কমতে শুরু করেছে। সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে করোনায় ভারতের চেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে, ৫ হাজার ৬০০ জনের তো। ভারতের জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে আটগুণ বেশি হলেও করোনায় মৃতের সংখ্যা ২০ গুণ বেশি। সবচেয়ে ক্ষতি হলো করোনা ঠেকাতে জারি করা অর্থনৈতিক লকডাউনে ভারতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৩ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে বলে আইএমএফ জানিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার প্রভাবে যে ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে সেটির তুলনায় তা প্রায় আড়াইগুণ।
আর্থিক সংকট, পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকা আর্থিক ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভীতি ভারতের কোভিড পরবর্তী অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বিলম্বিত করবে। আরও খারাপ হলো, এমনকি করোনা মহামারি ছাড়াও ভারত হয়তো বাংলাদেশের পেছনে থাকতো। এই পিছিয়ে পড়ার সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ সৌমিত্র চ্যাটার্জি ও ভারতের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রামানিয়ানের একটি নতুন গবেষণায়। তারা এই গবেষণার নাম দিয়েছেন, ইন্ডিয়া’স ইক্সপোর্ট-লেড গ্রোথ: এক্সেমপ্লার অ্যান্ড এক্সেপশন (ভারতের রফতানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি: উদাহরণ ও ব্যতিক্রম)।
প্রথমে ভারতের প্রবৃদ্ধির ব্যতিক্রমবাদ বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশ ভালো করছে কারণ তারা আগের এশীয় টাইগারদের পথ অনুসরণ করছে। স্বল্প-দক্ষতায় উৎপাদিত পণ্য রফতানি দরিদ্র দেশের কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত। ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে একটু এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু মূলত, উভয় দেশই চীনের দেখানো একটি পথে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে চীন নিজেদের জিডিপি বেশি ধরে রেখেছে নিজেদের শ্রমশক্তির আকার নয়, বরং স্বল্প-দক্ষতার পণ্য উৎপাদনে নিজেদের একাধিপত্য বজায় রেখে।
কিন্তু ভারত হেঁটেছে অন্য পথে। তারা তাদের কর্মক্ষম ১০০ কোটি মানুষের জন্য কারখানায় চাকরি দিতে সক্ষম এমন পণ্য উৎপাদনে যায়নি। সৌমিত্র ও অরবিন্দ লিখেছেন, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বল্প-দক্ষতার টেক্সটাইল পোশাক খাতে উৎপাদন ঘাটতি ১৪০ বিলিয়ন ডলার। যা ভারতের জিডিপির ৫ শতাংশ।


যদি ভারতের ২০১৯ সালের কম্পিউটার সফটওয়্যার রফতানির অর্ধেক বাতিল হতো তাহলে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়তো। কিন্তু ওই ৬০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি তেমনই হতো যা প্রতি বছর স্বল্প-দক্ষতার পণ্য উৎপাদনে হয়। এটিই প্রকৃত অবস্থা কিন্তু কেউ তা নিয়ে কথা বলতে চায় না। নীতিনির্ধারকরা কখনও স্বীকার করতে চান না যে জুতো ও পোশাক কারখানা কখনও গড়ে উঠেনি বা জোর করে বন্ধ করা হয়েছে। এগুলো থেকেও ডলার উপার্জন করা এবং সাধারণের কর্মসংস্থান সম্ভব ছিল। এই খাত গ্রাম থেকে নগরে অভিবাসনের স্থায়ী পথ দেখাতে পারতো, যা কখনও উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এমন চাকরিতে সম্ভবপর না। বাংলাদেশে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে দুজন নারী রয়েছেন। যা ভারতের অংশগ্রহণের হার ২১ শতাংশের চেয়ে দ্বিগুণ।
ভারতের জন্য আরও বড় বিপদ হলো সঠিকতর পদক্ষেপ না নিয়ে রাজনীতিকরা অতীতের ভুল অগ্রাহ্য এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার মধ্যে সমাধান খুঁজতে পারেন: ‘বাংলাদেশের চেয়ে গরিব? কিছু মনে করবেন না। আমরা আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি এবং দেশের অর্থনীতির জন্য পণ্য উৎপাদন করতে পারি। আসুন এভাবেই কর্মসংস্থান তৈরি করি।’ আচমকাই, ভারতের অর্থনৈতিক নীতিতে ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের স্বনির্ভরতার স্লোগান ফিরে আসছে।
এই হতাশাবাদকে দূর করতে চ্যাটার্জি-সুব্রামানিয়ানের গবেষণা আবারও কাজে লাগছে: জনপ্রিয় মতের বিরুদ্ধে, ভারত রফতানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন ও ভিয়েতনাম ছাড়া সব দেশের চেয়ে ভালো করছে। গ্লাস অর্ধেকের চেয়ে বেশি ভর্তি।
ভারত কম্পিউটার সফটওয়্যারের মতো প্রচুর উচ্চ-দক্ষতায় উৎপাদিত পণ্য ও সেবা রফতানি করে। কিন্তু বিশ্বের কারখানা চীন এক্ষেত্রে নিম্ন সারির পণ্য উৎপাদনে অন্যদের সুযোগ দিচ্ছে। এখানেই ভারতের সুযোগ, প্রতিযোগিতামূলক সস্তা শ্রমের মধ্যেই নিহিত। বছর বছর ৮০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রাখলে করোনা-পরবর্তী সময়ে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।

/এএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ