X
রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২
৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

অধিকাংশ জঙ্গি হামলার কূলকিনারা পাচ্ছে না পুলিশ

জামাল উদ্দিন
১৫ মে ২০১৬, ২২:৫৩আপডেট : ১৬ মে ২০১৬, ১১:২৭

জঙ্গিদের হাতে নিহত লেখক-প্রকাশক-ব্লগার ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, বিদেশি ও শিক্ষক হত্যা মামলাগুলোর বেশির ভাগেরই কোনও কূল-কিনারা পাচ্ছে না পুলিশ। তবে, এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে দেড় শতাধিক। পুলিশ দাবি করছে, ভিন্ন মতাদর্শের কারণে আনসারুল্লাহ ও জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন কিংবা খুনিদের গ্রেফতার করাসহ এসব মামলায় এখনও চার্জশিট দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, খুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে না পারায় এসব মামলার চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে।
রাজধানীর কলাবাগানে গত ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যার কিছু সময় আগে দিনের আলোতেই বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় নামের দু’বন্ধুকে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড-এর কর্মকর্তা ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল অফিসার ছিলেন জুলহাজ মান্নান। একইসঙ্গে তিনি সমকামীদের পত্রিকা রূপবানের সম্পাদকও ছিলেন। জুলহাজ মান্নান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ঘটনার পরপরই এটি আনসারুল্লাহ’র কাজ বলে দাবি করেন। এ ঘটনার জন্য আনসার আল ইসলাম নামের একটি সংগঠন দায় স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাইট ইন্টেলিজেন্স নামের সাইটটির মাধ্যমে দাবি করা হয়, এ হত্যাকাণ্ড আইএস ঘটিয়েছে।

জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২০দিন পর এ জোড়া খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শনিবার রাতে কুষ্টিয়া থেকে শরিফুল ইসলাম শিহাব (২৮) নামের এক তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আনসারুল্লাহ’র সদস্য শিহাব অস্ত্র সরবরাহ করেছিল বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটি) প্রধান মনিরুল ইসলাম। শিহাব এ জোড়া হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন বলেও দাবি তার। এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের অগ্রগতি এ পর্যন্তই।

আরও পড়তে পারেন: বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী গ্রেফতার

এর আগে গত বছরের ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারের নুরানি আবাসিক এলাকায় খুন হন ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। এরইমধ্যে এ হত্যাকাণ্ডের একবছর অতিবাহিত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হলেও তিনজন জামিনে রয়েছেন। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া সিলেট বিমানবন্দর থানার মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।

সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ হেল বাকী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আনসারুল্লা বাংলা টিমের ছয়জন জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন তারা। তাদের সব তথ্য-উপাত্তও তাদের কাছে রয়েছে। ঘটনার পর গ্রেফতার করা হয়েছিল চারজনকে। তাদের মধ্যে ইদ্রিস আলী নামের এক ফটো সাংবাদিকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তিনি জামিনে রয়েছেন। অন্য তিনজন কারাগারে রয়েছেন। খুনিদের তিনজনকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে মামলাটির চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে।

একই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও পুলিশ আনসারুল্লাহ’র আট সদস্যকে গ্রেফতার করে। তবে অভিজিতের স্ত্রী বন্যার দাবি, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কেউই অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে ১১টি আলামত এফবিআই নিয়ে যায় তাদের ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তাদের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট এখনও হাতে না পাওয়ায় অভিজিৎ হত্যার চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের তদন্তে সংশ্লিষ্টরা।

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের এক মাসের মধ্যেই গত বছরের ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম নামের দুজনকে হাতে-নাতে ধরে ফেলেন স্থানীয়রা। হত্যাকাণ্ডের আগে গ্রেফতার হওয়া আরও একজনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার পর পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আর কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ মামলায় পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে গত ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে।

গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নিজ বাসায় খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় নীল। এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে সাতজনকে আটক করা হয়। তারা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান। আটক ৭ জনের মধ্যে দু’জনকে গত ২৭ আগস্ট পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তাদের কাছ থেকেও খুনিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩২ নম্বর দোকানে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিনে রাজধানীর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর মালিক আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক রণদীপম বসু ও কবি তারেক রহিমকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ দু’টি ঘটনাতেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জড়িত বলে দাবি পুলিশের। এ দু’টি ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার কিংবা আটক করতে পারেনি। তদন্ত কোনও পর্যায়ে সেটা বলতেও অনীহা সংশ্লিষ্টদের।

আরও পড়তে পারেন: বিএনপি কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক দলের ২ নেতাকে কুপিয়ে আহত

ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন হত্যা চেষ্টা মামলাটি নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাঁচজনকে গ্রেফতার করার পর তদন্ত শেষে তাদের অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর উত্তরায় আসিফকে হত্যার চেষ্টা করেন দুর্বৃত্তরা। আসিফ বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। একই বছর নিহত ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে আদালত দু’জনকে ফাঁসি ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজারকে গুলি করে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় জঙ্গিরা ছাড়াও স্থানীয় সন্ত্রাসীরাও জড়িত বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। যে অস্ত্রটি দিয়ে গুলি করে তাভেল্লাকে হত্যা করা হয়েছে সেটা উদ্ধার না হওয়ায় চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

গত ৭ এপ্রিল রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের ছাত্র ব্লগার নাজিম উদ্দিন সামাদকে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও অদ্যাবধি পুলিশ এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।  

গত কয়েকদিনে একাধিক সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ২০১৩ সাল থেকে কলাবাগানে জোড়া খুনের ঘটনা পর্যন্ত ৩৭টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে সুত্রাপুরে ব্লগার নাজিম, টাঙ্গাইলের হিন্দু দর্জি, বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলার ঘটনার রহস্য এখনও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বাকি সব ঘটনারই কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এসব হামলার সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ ও জেএমবি জড়িত। তবে তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনও জঙ্গি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

/এমএনএইচ/

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
আমার বাড়িতে সিবিআই গেলে কী করবেন, প্রশ্ন মমতার
আমার বাড়িতে সিবিআই গেলে কী করবেন, প্রশ্ন মমতার
ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ গ্রেফতার
ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ গ্রেফতার
এ বিভাগের সর্বশেষ
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
নবজাতক জিম্মি করে বকশিশ আদায়, তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন আটক
নবজাতক জিম্মি করে বকশিশ আদায়, তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন আটক
খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প, নির্মাণ কাজের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা
খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প, নির্মাণ কাজের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা
পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের প্রশিক্ষণ নিলেন ৩০ ব্যাংক কর্মকর্তা
পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের প্রশিক্ষণ নিলেন ৩০ ব্যাংক কর্মকর্তা
উত্তরের নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বসছে সাড়ে ৪ হাজার সড়কবাতি
উত্তরের নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বসছে সাড়ে ৪ হাজার সড়কবাতি