প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা বড় সময় কাটে অনলাইনে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটে সবচেয়ে বেশি সময়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অন্য যেকোনও সোশ্যাল হ্যান্ডেলের চেয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারী সংখ্যাই বেশি। চ্যাটিং, লাইক, কমেন্টের পাশাপাশি ফেসবুকে আমরা যে কাজটি বেশি করি, সেটি হলো “শেয়ার”। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, প্রয়োজনীয় টিপস, নিছক বিনোদন কিংবা আবেগতাড়িত হয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জিনিস ফেসবুকে শেয়ার করে থাকি।
তবে এই শেয়ার করার প্রবণতা যে সবসময় ইতিবাচক কিংবা অন্যের জন্য উপকারী বিষয়টি তেমন নয়, বরং কখনো কখনো আপনার একটি শেয়ার হয়ে উঠতে পারে অন্যের জন্য ক্ষতিকারক।
সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রল করতে করতেই অনেক সময় গণপিটুনি, হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা কিংবা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার ছবি-ভিডিও চোখে পড়ে যায় আমাদের। কেউ কেউ শুধুমাত্র বেশি ভিউয়ের আশায় এ ধরনের কনটেন্ট শেয়ার করে থাকেন। তবে অনেকেই আছেন, যারা সচেতনতা তৈরির” উদ্দেশ্যে এসব কনটেন্ট শেয়ার করেন। তাদের যুক্তি—এতে মানুষ সতর্ক হবে, বাস্তবতা বুঝবে। কিন্তু এই প্রবণতা নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। সত্যিই কি এসব দৃশ্য সমাজকে সচেতন করছে, নাকি অজান্তেই আমরা এক ধরনের অসংবেদনশীল সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলছি?
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নীরব প্রভাব
বীভৎস দৃশ্য মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে—এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এখন সেই দৃশ্যগুলো বারবার, হঠাৎ করেই সামনে চলে আসে। কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই যখন কেউ এমন ভিডিও দেখে, তখন তার মধ্যে অস্বস্তি, ভয় বা উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে অজান্তেই দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল—তাদের মানসিক বিকাশের ওপর এমন দৃশ্যের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
সহানুভূতি থেকে দূরত্ব তৈরি
একটি ভয়ংকর ঘটনা প্রথমবার দেখলে যে ধাক্কাটা লাগে, একই ধরনের ভিডিও বারবার দেখলে সেই অনুভূতি ধীরে ধীরে কমে আসে। একসময় যা আমাদের বিচলিত করত, সেটাই হয়ে ওঠে আরেকটি “ভিডিও” মাত্র।
এই পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে সহানুভূতি হারাতে শুরু করে। অন্যের কষ্ট বা মৃত্যুকে আমরা তখন বাস্তব ঘটনা হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের কনটেন্ট হিসেবে দেখতে শুরু করি। এর ফলে সমাজে মানবিক সংবেদনশীলতার জায়গাটি ক্ষয়ে যেতে থাকে।
ভিকটিমের মর্যাদা কোথায়?
বীভৎস ভিডিও শেয়ারের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—যাদের নিয়ে এই কনটেন্ট, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটা পালন করা হচ্ছে?
অনেক সময় দেখা যায়, আহত বা নিহত ব্যক্তির মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হচ্ছে, পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে, অথচ তার পরিবারের কথা কেউ ভাবছে না। তাদের ব্যক্তিগত শোক তখন জনসম্মুখে প্রদর্শিত এক ধরনের “দৃশ্য” হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে কোনও মানুষের শেষ মুহূর্ত বা দুর্দশাকে প্রকাশ করা শুধু নৈতিকতার প্রশ্নই নয়, এটি মানবিক মর্যাদারও লঙ্ঘন।
গুজব, আতঙ্ক আর উত্তেজনার ঝুঁকি
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো অনেক ভিডিওর সঙ্গে সঠিক তথ্য থাকে না। পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, ভিন্ন দেশের ঘটনা স্থানীয় বলে চালানো—এসবও প্রায়ই দেখা যায়।
এর ফলে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়। কখনও কখনও এসব ভিডিও সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়, এমনকি সহিংসতার পরিবেশও তৈরি করতে পারে।
ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা
ডিজিটাল দুনিয়ায় “ভাইরাল” হওয়ার একটি অদৃশ্য চাপ কাজ করে। কে আগে শেয়ার করবে, কে বেশি রিঅ্যাকশন পাবে—এই প্রতিযোগিতায় অনেকেই কনটেন্টের মানবিক দিকটি ভুলে যান।
ফলে কোনও দুর্ঘটনা বা সহিংসতার ঘটনাও হয়ে ওঠে “ট্রেন্ডিং পোস্ট”। এখানে মানুষের কষ্ট বা মৃত্যু নয়, গুরুত্ব পায় ভিউ ও শেয়ার।
সচেতনতা না ছড়িয়ে কীভাবে সচেতন হবেন?
সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটির পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঘটনার বর্ণনা, তথ্যভিত্তিক লেখা বা সতর্কবার্তাও মানুষকে সচেতন করতে পারে—বিভৎস দৃশ্য দেখানোই একমাত্র উপায় নয়।
বরং সংবেদনশীল বিষয় শেয়ার করার আগে ভাবা দরকার—এটি অন্যের ক্ষতি করছে কিনা, অপ্রয়োজনীয় ভয় বা কষ্ট তৈরি করছে কিনা।
সর্বোপরি, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাতে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তি দিয়েছে। কিন্তু সেই শক্তি ব্যবহারের দায়িত্বও আমাদেরই। বিভৎস ভিডিও শেয়ার করা যদি মানুষের মধ্যে সহানুভূতির বদলে অসংবেদনশীলতা বাড়ায়, যদি কারও ব্যক্তিগত শোককে জনসম্মুখে তুলে ধরে—তাহলে সেটি সচেতনতা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক বিপর্যয়।
তাই শেয়ার বাটনে চাপ দেওয়ার আগে একবার থামা দরকার—এটি কি সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি আমরা কেবল আরেকটি ভয়ংকর দৃশ্যকে ভাইরাল করতে যাচ্ছি?









