দাঁত ঝকঝকে রাখলেই যে মুখের স্বাস্থ্য পুরোপুরি ভালো থাকে, তা নয়। মুখের ভেতরে বাস করে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীব। এদের কেউ দাঁত ও মাড়ির জন্য ক্ষতিকর, আবার কেউ মুখের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অণুজীবসমাজকেই বলা হয় ‘ওরাল মাইক্রোবায়োম’। গবেষণায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, মুখের এই মাইক্রোবায়োমের সঙ্গে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। আর এই অণুজীবের ভারসাম্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে প্রতিদিনের খাবারের ওপর।
মুখের ভেতরেই গড়ে ওঠে অণুজীবের জগৎ
মুখগহ্বরকে ছোট একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখানে থাকা বিভিন্ন অণুজীব নিজেদের পছন্দমতো জায়গা বেছে নেয়। কেউ দাঁতের উপরিভাগে থাকে, কেউ জিহ্বায়, আবার কেউ দাঁত ও মাড়ির মাঝের সরু ফাঁকে বসতি গড়ে।
সব ব্যাকটেরিয়া অবশ্য ক্ষতিকর নয়। স্ট্রেপ্টোকক্কাস মিউটান্সের মতো কিছু ব্যাকটেরিয়া চিনিজাতীয় খাবার ব্যবহার করে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে ক্যাভিটি তৈরি করতে পারে। অন্য দিকে ভেইলোনেলা, অ্যাক্টিনোমাইসিস, স্ট্রেপ্টোকক্কাসের কিছু প্রজাতি এবং নাইসেরিয়ার মতো ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর জীবাণুর সঙ্গে খাবার ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করে তাদের আধিপত্য কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই মুখের সব ব্যাকটেরিয়াকে দূর করার চেষ্টা না করে উপকারী ও ক্ষতিকর অণুজীবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
মুখের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে শরীরেরও যোগসূত্র
মুখের অণুজীবের ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু দাঁত বা মাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। গবেষণায় দুর্বল ওরাল মাইক্রোবায়োমের সঙ্গে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্ণতা, আলঝাইমার রোগ, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কিছু গবেষণায় মুখের অণুজীবের সঙ্গে কোলন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনও নিশ্চিত নয়। গবেষকেরা বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান করছেন।
বেশি করে রাখুন পাতাযুক্ত সবুজ সবজি
মুখের উপকারী অণুজীবের জন্য খাদ্যতালিকায় পাতাযুক্ত সবুজ সবজি রাখা যেতে পারে। পালং শাক, কেল, বিট ও মূলার মতো সবজিতে নাইট্রেট থাকে। মুখের কিছু ব্যাকটেরিয়া এই নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রূপান্তর করে। পরে শরীরে তৈরি হওয়া নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালি প্রসারণ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
একটি গবেষণায় নাইট্রেটসমৃদ্ধ বিটের রস পানকারী বয়স্ক ব্যক্তিদের রক্তচাপ কমার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে কোনও একটি খাবারকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে না দেখে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রসুনেও থাকতে পারে উপকার
রসুন খেলে মুখে গন্ধ তৈরি হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে থাকা অ্যালিসিন নামের যৌগ কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। দাঁতের ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের সঙ্গে যুক্ত কিছু জীবাণু নিয়ন্ত্রণে অ্যালিসিনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্ভিদজাত খাবারে থাকা পলিফেনলও মুখের মাইক্রোবায়োমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফল, বাদাম ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাবার থেকে পাওয়া এই যৌগগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কিছু ক্ষতিকর অণুজীবের কার্যকলাপ কমাতে সাহায্য করে।
চা, ফল ও মধুতেও মিলতে পারে উপকার
চায়ে থাকা পলিফেনল দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির রোগের সঙ্গে যুক্ত কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ কমাতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এসব উপাদান ব্যাকটেরিয়াকে একসঙ্গে জমাট বাঁধতে এবং দাঁতের গায়ে আটকে গিয়ে প্লাক তৈরিতে বাধা দেয়।
চা জিহ্বার পেছনে থাকা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী কিছু ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপও কমায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
পলিফেনলসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে গাঢ় রঙের বেরিও রয়েছে। ক্র্যানবেরির রস নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি দাঁতের প্লাক তৈরি এবং ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমাতে পারে। মধুতেও পলিফেনল রয়েছে। তবে মধুতে চিনি থাকায় উপকারী মনে করে অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়।
চিজ ও কেফির কেন উপকারী হতে পারে
চিজ চিবোনোর সময় মুখে লালারসের পরিমাণ বাড়ে। লালারস মুখ ও দাঁতের অতিরিক্ত চিনি পরিষ্কার করতে সাহায্য করে এবং মুখে তৈরি হওয়া অ্যাসিডের প্রভাবও কিছুটা কমাতে পারে।
ইতালির একটি ছোট গবেষণায় নয় জনকে টানা পাঁচ দিন গ্রানা পাদানো চিজ খাওয়ানো হয়েছিল। পরে তাদের মুখের অণুজীবের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। ক্যাভিটির সঙ্গে যুক্ত এস. মিউটান্সের উপস্থিতি কমে এবং তুলনামূলকভাবে সুস্থ মুখে বেশি দেখা যায় এমন এস. স্যাঙ্গুইনিসের উপস্থিতি বাড়ে। তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব কম হওয়ায় এ বিষয়ে আরও বড় গবেষণা প্রয়োজন।
ফারমেন্টেড খাবারও মুখের মাইক্রোবায়োমের জন্য সহায়ক। যেমন কেফিরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া কিছু ক্ষতিকর রোগজীবাণুর কার্যকলাপ কমাতে এবং দাঁতের গায়ে আঠালো বায়োফিল্ম তৈরিতে বাধা দিতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
কমাতে হবে চিনি ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার
মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম পছন্দের খাবার চিনি। বারবার চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় খেলে অ্যাসিড তৈরি করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াগুলো বাড়ার সুযোগ পায়। তাই মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত স্ন্যাকস কম খাওয়াই ভালো।
শুধু চিনি নয়, অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটও সীমিত করা দরকার। সাদা পাউরুটি, বিস্কুট, কেক, ক্র্যাকার ও এ ধরনের খাবার মুখে সহজেই চিনিতে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাবারের পরিবর্তে শাকসবজি, গোটা ফল, ডাল, গোটা শস্য ও আঁশসমৃদ্ধ খাবারকে খাদ্যতালিকায় বেশি জায়গা দেওয়া ভালো।
ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসেও মিলতে পারে সুফল
ফল, সবজি, গোটা শস্য ও স্বাস্থ্যকর চর্বিকে গুরুত্ব দেওয়া ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস মাড়ির স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস বেশি মেনে চলেছেন, তাদের মাড়ির রোগ তুলনামূলকভাবে কম তীব্র ছিল।
অন্য দিকে, নিয়মিত বেশি পরিমাণে লাল মাংস খাওয়ার সঙ্গে গুরুতর মাড়ির রোগের একটি সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এই সম্পর্কের সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। একটি ধারণা হলো, মাংসের প্রোটিন মুখের এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে পোরফাইরোমোনাস জিঙ্গিভালিসের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
খাবারের পাশাপাশি দাঁত পরিষ্কার রাখাও জরুরি
শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই মুখের মাইক্রোবায়োম ভালো থাকবে না। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা এবং দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করাও জরুরি। ফ্লস ব্যবহারের সঙ্গে ক্যাভিটির জন্য দায়ী এস. মিউটান্সের পরিমাণ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। দাঁত ও জিহ্বা নিয়মিত পরিষ্কার করলেও দাঁত ও মাড়ির রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর অণুজীব কমাতে সাহায্য করে।
মাউথওয়াশের ক্ষেত্রে অবশ্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। সাধারণ মাউথওয়াশ দীর্ঘমেয়াদে মুখের মাইক্রোবায়োমে কী প্রভাব ফেলে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। আবার ক্লোরহেক্সিডিনযুক্ত কিছু মাউথওয়াশ মুখের অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। তবে মাড়ির রোগসহ নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো স্বল্পমেয়াদে ব্যবহার করা হয়।
কোনও ‘সুপারফুড’ নয়, দরকার সুষম খাদ্যাভ্যাস
মুখের স্বাস্থ্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট খাবারকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে বেছে নেওয়ার চেয়ে প্রতিদিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর করে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, গোটা ফল, ডাল, গোটা শস্য, পরিমিত প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি খাদ্যতালিকায় রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে।
অর্থাৎ মুখের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ রাখার সবচেয়ে সহজ পথ হলো বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, চিনি কমানো এবং নিয়মিত দাঁত ও জিহ্বার যত্ন নেওয়া। এতে শুধু মুখের অণুজীবের ভারসাম্যই নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যও উপকৃত হতে পারে।








