আমি ও আমার বইমেলা || সেলিনা হোসেন

Send
শ্রুতিলিখন : শিমুল জাবালি
প্রকাশিত : ১৫:২৮, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০

আমার যখন লেখালেখি শুরু তখন বইকেন্দ্রিক যে মেলা হতে পারে, এরকম ভাবনায় আসেনি। বাংলা একাডেমির চাকরির সূত্রে এ ব্যাপারে আমার ভাবনা-চিন্তা আরম্ভ হয়। নিজের চোখের সামনে একটু একটু করে মেলার পরিসর আজকের জায়গায় আসতে দেখেছি। চিত্তরঞ্জন সাহা কিছু বই নিয়ে বসতেন প্রাঙ্গণে, পাঠকরা সেইসব বই কিনতেন, এভাবে মেলা শুরু হওয়া থেকে আস্তে আস্তে মেলার পরিসর বেড়ে এখন এই পর্যায়ে চলে এসেছে।

প্রথমদিকে মেলা উপলক্ষে কোনো বই প্রকাশ হতো না। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৮১-৮২ সালে তখনকার ডিজি মেলার আকার অনেক বড় করলেন। প্রকাশনা সংগঠন, প্রকাশনা সংস্থা, মিডিয়া, পাঠক সবাই একত্রিত হয়ে মেলা জমিয়ে তুললেন, তারপর তো আরও অনেক কিছু!

১৯৮২ সালেই মেলার নামকরণ করা হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সেই থেকেই শুরু হলো। আর সেটা আমাদের চোখের সামনেই! ভাবতেই কেমন যেন লাগে।

তারপর শুরু হলো আরও নানা রকম নিত্য-নতুন কাণ্ড। মেলাকে কেন্দ্র করে বছরের দু’তিন মাস কী দফারফাই না হয়। প্রকাশকরা মেলাকে উপলক্ষ্য করে বই প্রকাশ শুরু করলেন। সেটাও ছিল লেখকদের জন্য আকর্ষণের জায়গা। দেখতাম প্রকাশকরা কীভাবে এই কাজগুলো করছেন, একটা উৎসবের আমেজ নিয়ে। আগে যেমন সারাবছর বই প্রকাশিত হত, আমাদের তেমন উদ্রেক থাকতো না, বইটা মেলার জন্য প্রকাশিত হচ্ছে কি না। সেই জায়গাটা থেকে আমরা বের হতে শুরু করলাম। আশি-নব্বইয়ে দশকে দেখলাম মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশের প্রবণতা। একটা উন্মাদনাও কাজ করত।

সে সময় অবশ্য এত বেশি লেখক ছিলেন না। নবীন লেখকের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগলো। তখন শুরু হলো প্রকাশককে টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করা। আমার নিজেকেও এ ব্যাপারে অনেককে সহযোগিতা করতে হলো। দেখা যেত, আমি একজন প্রকাশক জোগাড় করে দিয়েছি, বাকিটা লেখক-প্রকাশক নিজ দায়িত্বে সকল কিছু বুঝে নিতেন। কিন্তু এ টাকা-পয়সা লেনদেনে নানা রকম অসুবিধা হতো। ব্যক্তিগতভাবে এ পদ্ধতিতে কোনো রকম সম্মতি ছিল না আমার। প্রায় সকল নবীন লেখকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া শুরু হলো। যদিও প্রবীণদের কাছ থেকে নিত না। অনেকেকেই শুদ্ধ পথ অবলম্বনের পরামর্শ দিতাম। আমি যেমন কখনো টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করিনি। সেটা আমার চর্চার মধ্যেই ছিল না।

যখন এভাবে টাকার বিনিময়ে বই আসতে শুরু করলো, এরপর থেকেই বইয়ের মান কমতে থাকলো। শিল্প-সাহিত্যের মন-মানসিকতাশূন্য ব্যবসায়ীরা প্রকাশনা শিল্পে বাড়তে থাকলো ব্যবসার লোভে।

মেলা শুরু হওয়ার আগেই আমার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত অন্যতম 'হাঙর নদী গ্রেনেড'। তার আগেও গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশকদের ধীরে ধীরে শুধু মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশে আগ্রহ থাকায় প্রত্যেক মেলাতেই এক বা একাধিক বই প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিবারই একাধিক গল্প উপন্যাস ছিল। এবার অনেকটাই ব্যতিক্রম।

এবারের মেলায় কথাপ্রকাশ থেকে গবেষণার নতুন বই আসছে, সেই বই আসার উন্মাদনা আমাকেও পেয়ে বসেছে। যদিও বইটি নিয়ে আমি অনেকদিন ধরে কাজ করছি, কিন্তু এটা মেলা উপলক্ষে আসছে, তাই সেই উন্মাদনা আমার ভেতরেও কাজ করছে। বইটির নাম 'পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমান।' রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গকে কীভাবে দেখেছেন, সেসবের বিস্তারিত দেখানোর চেষ্টা করেছি।

আবার বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেসব আবেগ আর দর্শন তুলে ধরেছেন, সেসবও দেখানোর চেষ্টা করেছি। আবার আরেকটা অধ্যায় দিয়েছি, রবীন্দ্রনাথের জন্ম থেকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু, এই সময়ে কোন কোন লেখকেরা জন্মগ্রহণ করেছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন, নোবেল প্রাইজ পেলেন, উল্লেখযোগ্য বই, আবার বিশ্বে নানাসময় নানা ঘটনা, যেমন ১ম বিশ্বযুদ্ধ, ২য় বিশ্বযুদ্ধ সেসব তথ্যও দিয়েছি।

এবারের মেলায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটা আমাদের জন্য সুখবর। কিছু অন্যদিকে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন: বঙ্গবন্ধুর নামে যা-তা বই বের করে যাচ্ছে বেশকিছু অলেখক, অসাধু প্রকাশকরা। এতে জাতির জনকের ইতিহাস বিকৃতি হবার সম্ভাবনা আছে। এ বিষয়ে তদারকি প্রয়োজন।

মুজিববর্ষ উদযাপনের একটা কমিটিতে ইমদাদুল হক মিলন, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সাহিদা খাতুন এবং আমি আছি। এ কমিটি থেকেও মেলাকেন্দ্রিক কিছু উদ্যোগ আছে। আমরা বেশ কিছু বই সম্পাদনাও করছি। পাশাপাশি সংগ্রহ করছি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আদিবাসী লেখকদের আদিবাসী ভাষার গল্প। সেসব আমরা অনুবাদ করছি। বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে সেসব গল্পও পৌঁছে যাবে। আর এসব যাবতীয় বিষয়াদি নিয়েই মেলা কাটবে আমার।

এতকিছুর পরও আগের সেই শুরুর উন্মাদনা খুঁজে বেড়াই। মেলাপ্রাঙ্গণে হেঁটে হেঁটে পুরনো স্মৃতিটাকেই আওড়াই।

//জেডএস//

লাইভ

টপ