লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা | আলেহো কার্পেন্তিয়ের

Send
তর্জমা : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৭:০০, জুন ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জুন ০৫, ২০২০

[জাদুবাস্তবতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আলেহো কার্পেন্তিয়ের দিয়েছেন ফ্রানৎস রোহ-এর রেফারেন্স, আর এ সম্পর্কিত বর্তমান তাত্ত্বিককরা এ তত্ত্বের আদি উদ্ভাবক হিসেবে রেফারেন্সে টেনে আনেন আলেহো কার্পেন্তিয়ের ও ফ্রানৎস রোহ-এই উভয় নাম। রোহ-এর মাথায় এই নাম বা এ সংক্রান্ত ভাবনা এসেছিল উত্তর ইউরোপিয় চিত্রকলার বিশ্লেষণ থেকে। এরপর তাঁর উদ্ভাবিত নামটি ‘রেভিস্তা দে অক্সিদেন্তে’ নামের স্প্যানিশ পত্রিকার মাধ্যমে ১৯২৭ সালে লাতিন আমেরিকায় প্রচারিত হয় এবং নামটি আলেহো কার্পেন্তিয়েরের বেশ মনে ধরে। তিনি দেখেন এই নাম যে বাস্তবতার নাম হতে পারে সে বাস্তবতা লাতিন আমেরিকার শত শত বছরের উত্তরাধিকার এবং সে বাস্তবতায় সত্যিকার অর্থে ইউরোপের কোনো হিস্যা নেই। এই কথা খুব দাপটের সঙ্গে তুলে ধরে তিনি দুটো প্রবন্ধ লিখলেন : একটির নাম De lo real maravilloso americano এবং অপরটি Lo barroco y lo real maravilloso। তাঁর দাবি অনুসারে—এ বাস্তবতাটি যেহেতু একচ্ছত্রভাবে লাতিন আমেরিকার উত্তরাধিকার, সেহেতু তিনি তাঁর প্রবন্ধে এর নামটিও একটু পরিবর্তন করে নিলেন। তিনি এর নাম দিলেন Lo Real Maravilloso Americano অর্থাৎ আমেরিকার অলৌকিক বা জাদুময় বাস্তবতা। তিনি এর নামকরণে ব্যাপক অর্থে ‘আমেরিকা’ নামটি ব্যবহার করলেও প্রবন্ধের অভ্যন্তরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি আমেরিকা বলতে এখানে লাতিন আমেরিকার অংশকেই বিশেষভাবে বুঝিয়েছেন। তাই তাঁর De lo real maravilloso americano প্রবন্ধটির এই বাংলা অনুবাদে একটু পরিবর্তন এনে শিরোনামটি করা হলো ‘লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা’। এ পরিবর্তন প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর প্রতি সুবিচার মর্মে গৃহীত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আরেকটি উল্লেখ্য বিষয় হলো, প্রবন্ধটির জাদুবাস্তবতা-বিষয়ক মূল বক্তব্য শুধু এর পঞ্চম পরিচ্ছেদে উপস্থাপিত হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধের পাঁচটি পরিচ্ছেদই যথাযথ মর্যাদায় এখানে অনুবাদ করা হয়েছে।

De lo real maravilloso americano শিরোনামের এ প্রবন্ধটি ১৯৪৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় প্রবন্ধ হিসেবে নয়, বরং কার্পেন্তিয়েরের উপন্যাস El reino de este mundo-এর ভূমিকা হিসেবে। পরবর্তী সময়ে ভূমিকার সেই লেখাটি তিনি আরও বিস্তৃত করেন এবং ১৯৬৭ সালে প্রবন্ধটি Tientos y diferencias নামক প্রবন্ধ-গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। উক্ত গ্রন্থ থেকে নিয়ে প্রবন্ধটি ইংরেজিতে On the Marvelous Real in America নামে অনুবাদ করেছেন যৌথভাবে Tanya Huntington এবং University of Houston-এর ইংলিশ অ্যান্ড কম্প্যারেটিভ লিটারেচার বিভাগের অধ্যাপক Lois Parkinson Zamora। তাঁদের এ অনুবাদ ১৯৯৫ সালে Magical Realism: Theory, History and Community নামক বিখ্যাত গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থ থেকে নিয়ে প্রবন্ধটি এখানে ‘লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা’ নামে বাংলায় অনুবাদ করা হলো।—অনুবাদক] 

 

অভিযাত্রায় নেমে পড়ার জন্য চার্লস বোদলেয়ারের সেই বিখ্যাত আমন্ত্রণ : চলো না যাই, সেখানে রয়েছে ঐশ্বর্য, আরাম আর আনন্দ (la bas tout n'est que luxe calme et volupté)। সেই আমন্ত্রণ থেকেই ছুটে চলা—দূরে আর অন্যরকম সব জগতে। ছুটে চলা তাঁরই বর্ণিত ঘুম-পাওয়া এশিয়ায় (La langoureuse Asie) আর ঘাম-ছোটা আফ্রিকায় (la brûlante Afrique)। সেখান থেকেই এসেছি, এসেছি গণপ্রজাতন্ত্রী চায়না থেকে। দেখে এসেছি পিকিং-এর সত্যিকার সুন্দরকে। দেখে এসেছি তাদের কালো কালো ঘরবাড়ি আর কমলা রঙের সিরামিক টাইলসের চালা যেখানে দিদিমার গল্পের জন্তুরা দাপিয়ে খেলা করে। সে-সব জন্তুদের মধ্যে রয়েছে ছোট ছোট গৃহকল্যাণের ড্রাগন, ডানাওয়ালা সিংহ, বিভিন্ন গৃহস্থ ঘরের জন্তুদেবতা যাদের সকলের নাম আমার জানাই হয়নি। গ্রীষ্মকালীন এক প্রমোদভবনের বহিঃবারান্দায় আমি অনেক অলস সময় কাটিয়েছিলাম। সামনে ছিল পেডেস্টালের ওপর দাঁড় করানো বিশাল বিশাল পাথর, সবই নাকি বিভিন্ন শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। পশ্চিমা নকশা বা ফিগারধর্মী ভাস্কর্যকলার সংজ্ঞা দিয়ে সেসবের শিল্পরূপ বোঝার কোনো উপায় নেই। সেগুলো মানুষের দুর্বল হাতে সৃষ্ট কোনো শিল্পকর্ম নয়, স্বয়ং প্রকৃতির নিজহাতে সৃষ্ট শিল্পকর্ম। সেগুলোকে বলা যেতে পারে Marcel Duchamp-এর ‘রেডিমেড’ বলে কথিত শিল্পসম্ভারের অনুরূপ এক প্রকৃতি-নির্বাচিত শিলা-শিল্পের জাঁকালো প্রদর্শনী। নানজিঙ শহরের স্থাপত্যশৈলী আমাকে মুগ্ধ করেছে। নানজিঙের মধ্যযুগীয় শক্তিশালী প্রাচীর, সাগরের ঢেউ-ভাঙ্গা দুর্ভেদ্য দেয়াল—যার নিম্নাংশ গাঢ় কালো আর ঊর্ধ্বাংশে সাদা অদ্ভুত এক প্রাচীর—এক কথায় অসাধারণ। সাংহাইয়ের মনুষ্য-সমুদ্রে নিজেকে আমার বুদ্বুদের মতো হারিয়ে যাওয়া এক অস্তিত্ব মনে হয়েছিল। যেন বিশাল এক জিমনেসিয়ামে কসরত-রত সীমাহীন মানুষের এক সমুদ্র। তারা এমন এক শহরে বাস করে যেখানে শহরের ম্যাপে কোনো কর্নার নেই, সব গোল, সব চত্বর। পশ্চিমা মানুষ কোণাকারের কর্নারবিহীন এমন শহর ভাবতে পারে না। শহরের সমুদ্র-প্রাচীরের পাশে বসে আমি অনেক সময় ধরে দেখেছি বর্গাকার বাদাম-তোলা নৌকাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। আবার বিমানে অনেক নিচু থেকে দেখে বুঝতে পেরেছি মেঘ ও কুয়াশার অনড় ভেলারা চায়নার ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিঙের চিত্রকল্প নির্মাণে কী অসামান্য অবদান রেখেছে। কাঁচা-পাকা ধানক্ষেত আর ধানক্ষেতে কৃষকদের পোশাক দেখে আমি বুঝতে পেরেছি চাইনিজ শিল্পে কচি সবুজ, গোলাপি আর হলুদ রঙ কী কঠিন ভূমিকা পালন করেছে এবং সেই রঙ কীভাবে শিল্পীর হাতের শেড-তোলা চককে নিয়ন্ত্রণ করছে। সেখানে রাস্তার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, ফ্রি গরম জলে আপ্যায়িত হয়েছি। মৎস্য-কাউন্টারগুলোতে মাছের জলকেলি দেখেছি যেখানে মাছগুলোর কানকোর নড়ায় আপনা-আপনি পাল্টে যেত তাদের গায়ের রঙ। কথকদের কত গল্প শুনেছি যার কিছুই বুঝিনি। পিকিং জাদুঘরের মাস্টারপিসগুলোর সামনে থ’ হয়ে তাকিয়ে থেকেছি, দেখেছি এক বিস্ময়কর ব্রেসলেটের মতো গোলক দাঁড়িয়ে আছে চারটি ড্রাগনের ওপর আর গোলকটি এক চমৎকার জ্যামিতিক বিন্যাসে ধরে রেখেছে গ্রহ-নক্ষত্রের মতো কিছু জ্যোতিষ্ক আর পার্থিব কতিপয় দৈত্য যারা বরফের ওপর পাথর-ছোঁড়াছুড়ি খেলছে। আমি সেখানে প্রাচীন মানমন্দিরগুলোতে দেখেছি তারকারাজ্যের মাপ-পরিমাপের অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি যা নাড়িয়ে দেয় আমাদের কেপলারের মাপজোকের অনেক কিছু। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে নিজেকে অনেক কাপড়-চোপড়ে পেঁচিয়ে উপরে উঠে দেখেছি সাংহাইয়ের প্যাগোডা টাওয়ার, যার জানালাগুলো ভুট্টার মোচার মতো পেঁচানো সুন্দর আর সে জানালার বহিরাঙ্গ চোখা ও কৌণিক। দেখেছি ঘড়ির টিক-টকের মতো নিরন্তর নিখুঁত পুতুলনাচের পরিবেশনা। এই সব দেখে এই পশ্চিমা দেশে যখন ফিরে এসেছি তখন আমার মনটা যথেষ্ট বিষাদাক্রান্ত। ভেবে দেখলাম যা-সব দেখেছি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়েই দেখেছি, কিন্তু বুঝিনি তো তার অনেক কিছুই। আমি বুঝি আমি একেবারে যে-সে ট্যুরিস্ট নই এবং আমি একেবারে বোকা কিসিমের লোকও নই যে, বিষয়গুলো আমি বুঝবো না। অন্তরালের কথা হলো—ভাষা-জ্ঞান ছাড়া তো আসলে বোঝা যায় না। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন একটি জাতি-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি বুঝতে হলে তার ভাষা শেখা চাই। ঐ ড্রাগনের ভাষা, ঐ মাস্ক বা পুতুলের ভাষাটি সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে। একটি থিয়েটারে গিয়েছিলাম যেখানে পশ্চিমাদেরকে দেখানো হয় এমন কিছু যাকে চাইনিজরা পশ্চিমা অপেরার মতো একটা কিছু বলে মনে করে থাকেন। আমাদের পশ্চিমা নাট্যকার, পরিচালক, সেট ডিজাইনার প্রমুখ ব্যক্তিগণ ‘টোটাল থিয়েটার’ বলতে যে বিষয়টি কল্পনায় ধারণ করে থাকেন কিন্তু বাস্তবে কখনো পান না আমার দেখা সেই চাইনিজ থিয়েটারের অপেরায় কুশীলবদের কঠিন কসরত পশ্চিমা এই টোটাল থিয়েটারের কল্পনার অংশ মনে হচ্ছে পূরণ করে ফেলেছিল। যারা আমাদেরকে অপেরাটা বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্বে ছিল তারাও তা বোঝাচ্ছিল ব্যায়ামকুশলীদের মতো কঠিনভাবে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে, আর সেই হাত-পা ছোড়াছুড়িই ছিল আমার কাছে তাদের মুখে বলা সেই ভাষাটির বিকল্প যে ভাষাটি জীবনে কোনোদিন আর আমার বোঝা হবে না। লোকে বলে Judith Gautier নাকি মাত্র বিশ বছর বয়সে চাইনিজ নামে এই মস্ত ভাষাটির পাঠ আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। তবে আমার বিশ্বাস হয় না, ভদ্র মহিলা চাইনিজ বলতে পারতেন, কারণ সত্যিকার অর্থে চাইনিজ নামে কোনো ভাষাই চীনে বলা হয় বলে আমার মনে হয় না। আমার জানামতে পিকিং-এর ভাষাটি পিকিং থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে আর কেউ বলে না, একইভাবে সাংহাইয়ে কান্তোনিজ যে ভাষাটি আছে সেটিও কোনো সর্বজনগ্রাহ্য চাইনিজ নয়। এমনটাই পুরো চীনের ভাষা-বিষয়ক বাস্তবতা। তবে চাইনিজ লিখতে গেলে সবই নাকি একই কায়দায় লেখা হয়, তাই বলা যায় লেখার জন্য অখণ্ড একটি চাইনিজ ভাষা থাকলেও বলার জন্য এমন কোনো চাইনিজ ভাষা নেই। আমার নিজের বিষয়ে এইটুকু গ্যারান্টি আমার আছে যে, আমার যে-পরিমাণ হায়াত বাকি আছে তা দিয়ে এ জীবনে চাইনিজ ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার মতো সুযোগ আর নেই। সে শিখতে গেলে প্রথমত আমার দরকার হতো একটি টেক্সট, সেই টেক্সট যা স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে খোদাই করা আছে কচ্ছপের গায়ের কঠিন খোলসের মতো পাথরে। সে টেক্সট নিজে নড়ে না, খালি আমার মতো মানুষদেরকে নাড়ায়। সে এত প্রাচীন যে, কেউ তার জন্মতারিখ জানে না। সেই টেক্সট এখন রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে পিকিং থেকে দূর দূর সীমানায় পুলের পর পুল পার হয়ে প্রান্তরের পর প্রান্তর। চলবে

//জেডএস//

লাইভ

টপ