আমি রাহাত খানের স্কুলের ছাত্র

Send
রেজাউদ্দিন স্টালিন
প্রকাশিত : ০৩:৩৩, আগস্ট ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:৩৪, আগস্ট ২৯, ২০২০

আমি রাহাত খানের স্কুলের ছাত্র। ১৯৮৩ সালে প্রথম রাহাত খানের সঙ্গে আমার দেখা হয় দৈনিক ইত্তেফাকে। দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা নিয়ে আমি প্রায়ই যেতাম তখন। তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আল মুজাহিদী। তিনিই প্রথম আমাকে রাহাত খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এই বলে যে, ‘স্টালিন তরুণ সম্ভাবনাময় কবি’। রাহাত ভাই সেদিন বললেন, কাল আমার এখানে এসো।

আমি পরদিন গেলাম। রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে অনেক আলাপ হলো। প্রথম দিনের আলাপের পরেই তিনি দুপুরে আমাকে খেতে নিয়ে গেলেন। একটা রেস্টুরেন্ট ছিলো ‘সকাল-সন্ধ্যা’ নামে। সেখানে আমরা খেলাম। ওইদিন খাওয়ার টেবিলে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া ব্রজেন দাসও ছিলেন। সেদিনই জানলাম রাহাত ভাই পাঙ্গাস মাছের পেটি খুব পছন্দ করেন। এরপর তিনি আমাকে তার বই উপহার দেন। যদিও এর আগে রাহাত ভাইয়ের দু’একটি লেখা পত্রিকায় পড়েছি। এরপর আমি তার বই নিলাম এবং গভীরভাবে পড়লাম। আমি তার উপন্যাস ‘কোলাহল’ (পরবর্তীকালে ‘ছায়াদম্পতি’, ‘সংঘর্ষ’) পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

পড়ে আমার এতো ভালো লাগলো আমি তার উপরে লিখতে আগ্রহী হলাম। আমি সেটা জানালাম। এরপর দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পর তিনি আমার কাছে লেখার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। এরপর সেদিন রাতেই সারা রাত খরচ করে আমি তার পঠিত গ্রন্থের উপর একটি লেখা দাঁড় করালাম। লেখাটার শিরোনাম দিলাম ‘রাহাত খান : কাঙ্ক্ষিত কোলাহল’। পরদিন তাকে গিয়ে পড়ে শোনালাম। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, ‘তুমি আমাকে এত নিবিড়ভাবে পড়েছ? আজ থেকে তুমি আমার ভাই।’

ওই লেখাটা সম্ভবত ১৯৮৪ সালের দিকে ইত্তেফাকে ছাপা হয়। সে সময়ে ইত্তেফাক দারুণ জনপ্রিয় ছিলো। তখন এই লেখাটি ছাপা হওয়ার পর সারা দেশ থেকে ফোন আসতে থাকলো রাহাত ভাইয়ের কাছে। এভাবে ধীরে ধীরে রাহাত ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম।

তখন আমি কোনো চাকুরি করতাম না। ইত্তেফাকে লেখা দিতাম সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে। বিশেষ করে বইয়ের রিভিউ লিখতাম। এভাবে প্রায় নিয়মিতই রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হতো।তার অনুপ্রেরণা পেতাম সবসময়।

রাহাত খান বাংলা কথাসাহিত্যে বিরাট অবদান রেখেছেন বলে আমি মনে করি। তার বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় ‘অমল ধবল চাকরি’, ‘ছায়াদম্পতি’, ‘শহর’, ‘হে শূন্যতা’, ‘হে অনন্তের পাখি’, ‘মধ্য মাঠের খোলোয়াড়’, ‘এক প্রিয়দর্শিনী’, ‘মন্ত্রিসভার পতন’, ‘দুই নারী’, ‘কোলাহল’ ইত্যাদি। তার প্রতিটি উপন্যাস, প্রতিটি গল্প, প্রতিটি লেখার মধ্যে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের সংকট, আমাদের দৈন্য, আমাদের অভাব, যাপিত জীবনের প্রায় সবকিছুই গভীরভাবে উঠে এসেছে। কীভাবে গ্রাম ভেঙে নগর গড়ে উঠছে, শহরের মানুষের যে জীবন-দর্শন, নগরের যে মনভঙ্গি, নগরের উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্ত মানুষের যে বিভেদ সেসব তার লেখায় আমরা দেখতে পাবো।

রাহাত ভাই খুব দরদী মানুষ ছিলেন। আমি গভীরভাবে রাহাত ভাইকে দেখেছি। তার স্নেহ পেয়েছি। তিনি নারীদেরকে অসম্ভব সম্মান করতেন। তার অনেক নারী বন্ধু ছিলো। তিনি বলতেন, তুমি যদি নারীদের সঙ্গে মিশতে যাও প্রথমে তাদেরকে তোমার সম্মান করতে হবে।

রাহাত ভাইয়ের কাছে অনেক বই পড়ার যে পরামর্শ পেয়েছি তার মধ্যে অন্যতম ছিলো রুশ সাহিত্যের লেখকদের বই। তিনি লিও তলস্তয়কে খুব পছন্দ করতে। তিনি তলস্তয়কে ঋষি মনে করতেন। তাকে তিনি আদর্শ মানতেন। দস্তয়েভস্কির প্রায় সব লেখা তার পড়া ছিলো। তবে তিনি মোটেও কমিউনিজমে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না। তিনি একটি পূর্ণ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অসম্ভব পছন্দ করতেন।একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিলো সম্ভবত ১৯৭২ সালে, সেখানে রাহাত খানই একমাত্র কর্মবিধায়ক ছিলেন, এবং সেই দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু রাহাত খানকে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনা রাহাত ভাই প্রায়ই গল্প করতেন।

রাহাত ভাই মানুষকে খুব সহযোগিতা করতেন। কেউ কোনো প্রয়োজনে এলে তাকে খুব সহযোগিতা করতেন। রাহাত ভাই আমার আদর্শ, আমাদের আদর্শ। তিনি তার কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

শ্রুতিলিখন : মো. তানভীর

//জেডএস//

লাইভ

টপ