X
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
১৯ মাঘ ১৪২৯
পথে নেমে পথ খোঁজা

লেখকের সহায়ক পেশা ।। পর্ব—৩

মঞ্জু সরকার
২৬ আগস্ট ২০২২, ০০:৫৫আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ০০:৫৫

আমেরিকান লেখক উইলিয়াম ফকনারের সেই সাক্ষাৎকারটি মনে পড়ে। লেখকের আর্থিক স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মহান লেখক কেবল তার শিল্পসৃষ্টির কাছে দায়বদ্ধ। লেখার জন্য প্রয়োজনে সে দাদির গয়নার বাক্স চুরি করবে। বড় কোনো বৃত্তি বা আর্থিক সুবিধা দিলেই সে ভালো লিখবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিজের জন্য ফকনার কাগজ, কলম ও সামান্য হুইস্কির বরাদ্দ যথেষ্ট মনে করেন। আর লেখালেখির জন্য ভালো পরিবেশ প্রসঙ্গে কোনো বেশ্যালয়ের ব্যবস্থাপকের চাকরি নিজের জন্য উত্তম ভেবেছিলেন। কারণ সেখানে লেখার জন্য সকালবেলাটা হবে নির্ঝঞ্ঝাট সময়, আর রাতে মিলবে বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং কাজ বলতে পুলিশকে তার প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া।

ঢাকায় অনিশ্চিত ভাসমান জীবনে নতুন করে চাকরি খুঁজতে গিয়ে মনে হলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত অভাবী দেশে বাঁচার মৌলিক চাহিদা পূরণ সম্পর্কে ফকনারের আসলে বিন্দুমাত্র বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। সামান্য হুইস্কি আর লেখার জন্য কাগজ-কলম নয়, বেঁচে থাকার জন্য আমার দৈনন্দিন ডালভাত আর গোটা কয়েক বিড়ির ব্যবস্থা করা জরুরি। এ জন্য চাই যেকোনো একটা কাজ। ভাসমান জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, লেখক হওয়ার জন্য মাথার উপরে মাথা গোঁজার মতো একটা ছাদ এবং হাতের কাছে একটা বাথরুম থাকাও জরুরি।

ভরসা হচ্ছে, মাস কয়েক পুরান ঢাকায় থেকে অনেকের সঙ্গে চেনাজানা হয়েছে। আমলিগোলায় ছোট একটি দোকানে সিগারেট বেচে, খাঁটি ঢাকাইয়া পোলাটি আমার নামে নাম বলে মিতা সম্পর্ক তার সঙ্গে। বাকিতেও কমদামি সিগারেট খাই তার দোকানে। বাড়ি থেকে ছোটভাই টাকা পাঠালে শোধ করে দেবো। না করে না কখনো। উল্টো পাশের চেনা বাখরখানি দোকান থেকে ফ্রি বাখরখানি খাইয়েছে দু-একদিন। এরকম ছোটখাটো পেশার লোকজন ছাড়াও গ্রন্থবিতান পাঠাগারের কল্যাণে মহল্লার শিক্ষিত অনেকের সঙ্গেই চেনাপরিচয় হয়েছে। পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মহল্লার বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবক ব্যক্তিরা। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা খন্দকার কেরামত আলী, যিনি বিখ্যাত রাজনীতিক রাশেদ খান মেননের শ্বশুর, পাঠাগার পরিচালনা কমিটির সভাপতি। পাঠাগারটির লাইব্রেরিয়ান ও ভবনের কেয়ারটেকার হিসেবে চাকরি পেয়েছিল তারই পরিচিত যশোরের এক বেকার যুবক মোহাম্মদ আলী। লাইব্রেরিসংলগ্ন ছোট রুমটায় থাকত সে। নিষ্ঠাবান পাঠক হিসেবে এবং একই পথের পথিক হওয়ার কারণেও বটে, লাইব্রেরিয়ান মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে অল্পসময়ে খাতির-বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মোহাম্মদ আলীকেই প্রথম আসন্ন নিরাশ্রিত হওয়ার সমস্যাটি বলি। সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান হলো সমস্যার।

আসলে পাঠাগারের কার্যক্রম লাইব্রেরিয়ান মোহাম্মদ আলী একা চালাতে পারছে না বলে তার একজন সহকারী নেওয়া হবে। পার্টটাইম চাকরি, বেতন মাসিক পঁয়ত্রিশ টাকা। আগ্রহী কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি রাজি হলে লাইব্রেরিতেই মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে থাকতে পারব। আর নিজে যেমন সে করে, আমাকেও দু-একটি টিউশনিও জোগাড় করে দিতে পারবে। তখন মোহাম্মদের সঙ্গে মেস করে খেতে পারব। পাঠাগার কমিটির সভাপতি আমাকে পছন্দ করলেন। ব্যাস, চাকরিটা হয়ে গেল। আলম ভাইয়ের বাসা ছেড়ে লাইব্রেরির আশ্রয়ে উঠে মনে হলো, এতদিনে স্বনির্ভর স্বাধীন লেখক হওয়ার পথে উঠেছি।

পাঠক সেবার চাকরি নিয়ে বিকেলে টেবিলে বসে নিজের বইপত্র পড়া বন্ধ হয় বটে। কিন্তু কাজের ফাঁকে পড়ার সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে কাজটা যখন বই ও পাঠকদের নিয়ে। আমি রাতে ঘুমাতামও লাইব্রেরির ভিতরেই। রিডিং টেবিলটাকে বিছানা বানিয়ে মোটা বইপত্রকে বালিশ বানাতাম। সারা রাত জেগে জেগে পড়ি কিংবা লেখি- বাধা দেওয়ার কেউ নেই। সামান্য চাকরিসূত্রে পাওয়া এমন আশ্রয় এবং লেখালেখির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আর কী হতে পারে? দিন কয়েকের মধ্যে দুটি টিউশনও জোগাড় হয়েছে। মোহাম্মদ আলী সহজে সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য বাংলা শর্টহ্যান্ড ও টাইপ শিখতে শুরু করেছিল। তার প্রেরণায় আমিও ভর্তি হলাম। দুজন শর্টহ্যান্ড-টাইপ শিখতে পায়ে হেঁটে মতিঝিল সাঁটলিপি একাডেমি যেতাম। আবার পায়ে হেঁটেই বিকেলের মধ্যে ফিরেও আসতাম কর্মস্থলে।

স্বাধীনতার আগে এবং বাহাত্তর-তিয়াত্তর সালেও গ্রন্থবিতান পাঠাগারটির একটি ভ্রাম্যমাণ ইউনিটও ছিল। তিন চাকার একটি অটো স্কুটার বিশেষভাবে নির্মিত বইয়ের র‌্যাকে বই সাজিয়ে নিয়ে, নগরীর বিভিন্ন মহল্লায় পাঠকদের ঠিকানায় যেত বই পৌঁছাতে। ড্রাইভার ছাড়াও ভ্রাম্যমাণের জন্য সহকারী লইব্রেরিয়ান ছিল রণজিত। সে সরকারি পিয়নের চাকরি পাওয়ায় তার স্থলাভিষিক্ত হলাম আমি। বেতন পঁয়ত্রিশ থেকে পঁচাত্তর হলো। তারচেয়েও বড়কথা, ঘরে বসে ডিউটি করার বদলে গাড়িতে ঘুরে ঘুরে ডিউটি করাটা অনেক মজার। ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের সদস্য প্রধানত মেয়েরা। বিকেলে ড্রাইভার জাভেদ আলী ভাইয়ের পাশে বসে এলিফেন্ট রোড, গ্রিনরোড, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন বাসায় গিয়ে লাইব্রেরির উপস্থিতি ঘোষণা করলে গৃহবধূ সদস্যরা বেরিয়ে এসে বই বদলে নিয়ে যান।

কিছুদিন ডিউটি করে টের পাই, আমার পূর্বসূরি রণজিত ও ড্রাইভার নিয়ম ভেঙে একাধিক বই দেওয়া ছাড়াও সচ্ছল গৃহবধূ পাঠিকাদের নানাভাবে সেবা করত। খাঁটি গাওয়া ঘি, মধু কিংবা বাগানের ফ্রেশ চা ইত্যাদি নানা পণ্যের সাপ্লাই দিত তারা। বইয়ের ভ্যানে লুকিয়ে রাখত নিজেদের ব্যবসায়ী পণ্য। আমার কাছেও অনেক পাঠিকা রণজিতের সেবা আশা করত। কিন্তু ভবিষ্যতে হবে যে বিখ্যাত লেখক, তার এরকম চোরাকারবারের ধান্ধা থাকে? ফলে বই লেনদেনের বাইরে কারো সঙ্গেই খাতিরের সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। মনে পড়ে, বিখ্যাতদের মধ্যে অভিনেতা গোলাম মোস্তফার কন্যা ক্যামেলিয়া ও কিশোরী সুবর্ণা বই বদলে নিয়ে যেত। পরে তাদের টিভিতে দেখে চিনতে পেরেছিলাম বলে মনে আছে। গ্রাহকদের মাঝে হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরক’-এ উপন্যাসটির চাহিদা দেখে এবং বিদগ্ধ এক পাঠিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনে আমি বইটি এক রাতেই পড়ে ফেলেছিলাম। অভিজাত এলাকার সচ্ছল পরিবারের বাসিন্দারা আমার মতো সামান্য বেবিট্যাক্সির লাইব্রেরিয়ানকে আর কী দাম দেবে? তারপরও ক্ষমতা দেখাতে নিয়ম-বহির্ভূত একাধিক বইয়ের আবদার খারিজ করতাম। তবে একটি বাড়ির লনে গিয়ে লাইব্রেরির হর্ন বাজিয়ে উপস্থিতি ঘোষণা করলে, এক তরুণী পাঠক বই হাতে নিয়ে গটগট করে নেমে আসত। গাছপালাঘেরা নিভৃত প্রাঙ্গনে সবুজরঙা বুকভ্যানের পাশে তরুণীর ঝলমলে উপস্থিতি, তার সময় নিয়ে বই বাছাই করার দৃশ্য স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত। সে নিয়ম ভেঙে একাধিক বই নিতে চাইলেও আপত্তি দূরে থাক, উল্টো পুরো লাইব্রেরিটাই তাকে দেওয়ার উদারতা জাগত। ভাগ্যিস, অল্পদিনের মধ্যেই অচল হয়ে পড়ল ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার-ভ্যানটি। এর আগেও চলতি পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে কয়েকবার। ড্রাইভার জাভেদ ভাইয়ের নির্দেশে তখন ভ্যানটিকে পেছন থেকে ঠেলতে হতো আমাকেও। সন্দেহ জাগত, ড্রাইভার ইচ্ছে করেই আমাকে শাস্তি দিতে নাকি অন্য কোনো মতলবে ইঞ্জিন খারাপ করে দেয় সহসা? শেষবার এমনই বিগড়ে যায় ওটি, মেরামত করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ অত টাকা ব্যয়ের বদলে উল্টো ভ্রাম্যমাণ শাখা অচল এবং দুজনেরই বেতন বন্ধ ঘোষণা করল।

চাকরিটা যাওয়ার পরও মোহাম্মদ আলীর কারণে লাইব্রেরির আশ্রয়টা টিকে ছিল আরো কিছুকাল। টিউশনির ওপর নির্ভর করে টাইপ-শর্টহ্যন্ডের স্পিড বাড়ানোর প্রাকটিস চালিয়েছি দিনরাত। এরমধ্যে নতুন ধরনের কাজ বা চাকরির প্রস্তাব পেলাম একটা। মিউনিসিপ্যালিটির ফার্স্টক্লাস কন্ট্রাকটার কুতুবউদ্দিন ভাই, নওয়াবগঞ্জের ঘিঞ্জি গলিতে নিজের দোতলা বাড়ি। নিজেকে ঢাকাইয়া কুট্টি পরিচয় দেন সগর্বে। পারিবারিকভাবে জগাখিচুড়ি উর্দুতে কথা বলেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই লোকও বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক, গ্রন্থবিতানের ডবল মেম্বার। ভ্যাসপা মোটরসাইকেল চালিয়ে বই বদলে নেওয়ার জন্য পাঠাগারে আসতেন প্রতি সপ্তাহে। মোহাম্মদের মাধ্যমে আমার পরিচয় পেয়েই ভ্যাসপার পিছনে বসিয়ে একদিন বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের ক্লাস সিক্সে পড়া মেয়ে জেসমিন ও ক্লাস টুতে পড়া ছেলে টুটুলের টিউশন মাস্টার নিয়োগ করেছিলেন আমাকে। খামে ভরে মাসিক বেতনটি পাওয়া ছাড়াও মাঝেমধ্যে খেতামও তার বাড়িতে। আমার দেখা ভালো মানুষদের মধ্যে একজন কুতুবউদ্দিন ভাই। লাইব্রেরিতে আমার চাকরি নেই শুনেই আবারও আমাকে তার ভ্যাসপার পেছনে তুলে নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্যটা নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতে ব্যাখ্যাও করেছিলেন।

‘লেখক হইবার চাও, মগর লেইখা কয় টাকা রুজি করবা? আমার লগে ঘোরো। আপাতত আমার অ্যাসিটেন্ট কি সাইট সুপারভাইজার হইয়া কাম করো। চক্ষুকান খোলা রাইখা দেখ মিয়া ঢাকায় মানুষ কেমতে টাকা ধরে। টাকা কামাইবার রাস্তা লাইন-ফাইন না সমঝাইতে পারলে টিকতে পারব না এই টাউনে।’

কুতুবউদ্দিন ভাই লক্ষ্মীবাজার মিউনিসিপ্যাল অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। তিনি নিজে সিগারেট না টেনেও দামি সিগারেট কেনেন কেন? কেন টেবিলে টেবিলে বিলান? কোন টেবিলের জন্য সিগারেটের সঙ্গে প্যাকেটে নগদ টাকাও গুঁইজা দেন কেন? এসব প্রশ্নের জবাব হাতেনাতে শেখাতে লাগলেন আমাকে। বিল পাওয়ার জন্য এবং নতুন টেন্ডার ধরার জন্য অফিসের ছোট-বড় সাহেবদের টেবিলে ধর্না দেওয়ার পাশাপাশি সাইটে মালমসলা ও লোকজন খাটাতে গিয়ে নিজের লাভের হিস্যা বাড়ানোর রাস্তা এবং ফাঁকফোকড়ও আমাকে চিনিয়ে দিতে চান তিনি। এই উদ্দেশ্যে প্রথম ধাপে আজিমপুর থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত আইল্যান্ড সংস্কারের একটা ছোট কন্ট্রাকটারের সুপারভাইজার নিয়োগ করলেন আমাকে। অল্প কয়েকজন রাজমিস্ত্রী-যোগাইলা এ কাজ করবে। তারা মিস্ত্রীরা যাতে ইট-সিমেন্ট চুরি না করে ঠিকমতো কাজ করে, এ জন্য সাইটে থাকতে হবে আমাকে।

সন্দেহ জাগত, আমার জন্য কুতুবুদ্দি ভাইয়ের এমন স্নেহ-উৎসাহের মূলে আমাকে হবু-জামাই বানানোর মতলব, নাকি অল্প বেতনে সুপারভাইজার নিয়োগের ধান্ধা? আসল সত্য যাই হোক, তার আন্তরিকতাকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। আমি যে টাকার লাইন খোঁজার যোগ্য লোক নই, তার রাজমিস্ত্রীও সহজে বুঝতে পারে, আর কুতুব ভাই কেন বুঝতে পারেন না? যা হোক, মিস্ত্রী আমাকে খাতির করে নীলক্ষেতের রেস্টুরেন্টে নিয়ে চা-সিঙ্গাড়া খাওয়ায়। তারপর পরামর্শ দেয়, ‘আমরা ঠিকমতো কাম করুম। আপনি ঘরে গিয়া রেস্ট লন। না হলি নিজের অন্য কামে যান। আমাগো পিছনে মাছির মতো লাইগা নাই থাকলেন।’

মিস্ত্রীর ঘুষ খেয়ে তার পরামর্শ কিছুটা মানতে হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের কাজ দেখার বদলে নিউমার্কেটে ঘুরে মেয়েদের দেখতে আমার ভালো লাগে। তাছাড়া কাছেই সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি। সেখানে গিয়ে বই পড়তে পারি। লাইব্রেরির পাশে বিখ্যাত শরিফ মিয়ার ক্যানটিন। সেখানে ঢাকা শহরের সব বিখ্যাত ও উঠতি কবি-লেখকরা এসে আড্ডা দেন বলে শুনেছিলাম। আমিও তো ওদের একজন হওয়ার জন্যই ঢাকায় এসেছি। সময় পেলে শরিফ মিয়ার ক্যানটিনে আমিও যাই। যাদের নামের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত, বিশেষ করে কবিতা বা গল্প পড়ে ভালো লেগেছে যাদের, তাদের কাছে থেকে দেখা ও চেনাজানার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ-উত্তেজনা হয়। ক্যান্টিনের বেয়ারা রমজান মিয়াকে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। এভাবে কয়েকদিনের বসে থাকায় নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ ও হুমায়ুন কবিরসহ জানা অজানা অনেক কবি-লেখকদের দেখা হয়। পর্যবেক্ষক হিসেবেও তাদের ফ্রি আড্ডাও উপভোগ করা হয় খানিকটা। স্বভাবগতভাবে মুখচোরা লাজুক আমি। তার ওপর প্রকাশিত কবি-লেখক হতে পারিনি বলে উপযাচক হয়ে কথাবার্তা বলার সাহস হয়নি কখনো। আবুল হাসানের মতো দু-একজন কৌতূহলী দৃষ্টি আমার ওপর ফেলেছিলেন। কী লিখি, কী করি জিজ্ঞেস করেছিলেন কেউ কেউ।

একবার কী এক উপলক্ষ্যে একদিন টিএসসি মোড়ে কবিতা পাঠ হবে। মাইক আনা হয়েছে। তরুণ কবিরা স্বরচিত কবিতা পাঠ করবেন। আমি তো স্কুলজীবনেই উনসত্তর-সত্তরের আন্দোলনের সময় ছাত্রদের রাজনৈতিক সভায় দেশাত্মবোধক স্বরচিত কবিতা পাঠ করে প্রচুর হাততালি পেয়েছিলাম। ঢাকার কবিদের মাঝেও একটি স্বরচিত কবিতা পাঠের লোভ সামলাতে পারিনি। সমবয়সী অচেনা কবি আবিদ আজাদকে মনের ইচ্ছেটি ব্যক্ত করায়, সে আমার নামটিও লিস্টে ঢুকিয়ে ঘোষকের কাছে দিয়েছিল। মাইকে কবি হিসেবে আমার নামও উচ্চারিত হয়েছিল। মুখস্থ কবিতাও পাঠ করেছিলাম। কিন্তু তালি বাজেনি, কেউ মনেও রাখেনি। এমনকি নিজেও ভুলে গেছি একদার সেই ব্যর্থ কবিকে।

একদিন লালবাগ থেকে মতিঝিলে সাঁটলিপি একাডেমিতে যাওয়ার পথে রংপুরের পরিচিত কবি কায়সুল হককে দেখে চমকে উঠেছিলাম। সেই সময়ে বায়তুল মোকাররম পেরিয়ে ‘দৈনিক বাংলা’ যাওয়ার পথে রাস্তার ডানদিকে হলুদ রঙের একটি দোতলা বাড়ি ছিল। বয়স্কাউট ভবন। ভবনের দোতলায় লেখা ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ। ততদিনে বাংলা একাডেমির মতো বড় প্রতিষ্ঠান দেখা হয়ে গেছে আমার। গ্রন্থকেন্দ্র অফিসটি বাইরে থেকে অনেকবার দেখলেও ভেতরে ঢোকার গরজ হয়নি। কিন্তু সেদিন সেই ভবনের গেটে খদ্দের পাঞ্জাবি-পাজামার পরিচিত কায়সুল ভাইকে দেখে তার সামনে এগিয়ে যাই। আমি তার মুখচেনা এক তরুণ কবিলেখক। লেখা না পড়লেও রংপুরে সাহিত্যের আসরে দেখা হয়েছে কয়েকবার। তার ধাপের বাসাতেও গিয়েছিলাম একবার। তিনি আমাকে দেখে চিনতে পারেন। জানতে পারি, কায়সুল ভাই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবে বই পত্রিকাটি দেখেন। আমি বাংলা টাইপ-শর্টহ্যান্ড শিখছি শুনে অফিসে ডাকলেন একদিন। জানালেন, তাদের অফিসে একটি পোস্টে নেওয়ার জন্য বাংলা টাইপ-শর্টহ্যান্ড জানা লোক খোঁজা হচ্ছে।

একেই বলে বোধকরি দৈবচক্র। পরদিনই কায়সুল ভাইয়ের অফিসে গিয়েছি। কায়সুল ভাই গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। তার ‘নয়ানঢুলি’ গল্পটি পড়া ছিল। পাঠক পেলে কোন লেখক না খুশি হন? কিন্তু চাকরিটা অত সহজে হয়নি। মাসখানেক অপেক্ষার পর ইন্টারভিউ দিয়ে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হয়েছিল। অবশেষে সরদার জয়েনউদ্দীনের স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র পেলাম। স্টেনো-টাইপিস্ট পদে ১৮০ টাকা স্কেলে বেতন, সব মিলিয়ে প্রায় তিনশত টাকা পাব। কাজ মূলত পরিচালকের একান্ত সহকারীর। ফলে তার অফিসকক্ষের সামনে, কায়সুল ভাইয়ের পাশেই একটি টেবিলে বসার ব্যবস্থা হলো। আমার আগেই অবশ্য টেবিলে মুনীর অপটিমা টাইপরাইটারটিও বসে গেছে।

অফিসের বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে দুকাঠা আয়তনের সবুজ প্রাঙ্গন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের নিচে। এই জায়গাতে চেয়ার বিছিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রের নিয়মিত প্রকাশনা উৎসব এবং বইবিষয়ক অনুষ্ঠান হয়। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত কবি-লেখকরা আসেন। আমি হবুলেখক, গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরির নিয়োগপত্রখানা হাতে পেয়ে সবুজ লনটিতে এক প্যাকেট সিগারেটসহ বসে একা একাই আনন্দোৎসব করেছিলাম প্রথমদিন। মনে হয়েছিল, আমাকে বড় লেখক বানাবে বলেই আমার ভাগ্যদেবতা নানা ঘাটের জল খাইয়ে বই এবং বিখ্যাত কবি-লেখদের সংস্পর্শে রাখার উদ্দেশ্যেই সরকারি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছে। এবার আমাকে ঠেকাবে কে? কিন্তু আমার এই ধারণা যে কত বড় ভুল ছিল, অর্থাৎ লেখক হওয়ার জন্য সরকারি কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চাকরি কিংবা প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত কবি-লেখকদের সংসর্গ মোটেই দরকারি জিনিস নয়, বরং পরিত্যাজ্য হওয়াই উচিত- এই সহজ সত্যটি বুঝতে আমাকে আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে, পাড়ি দিতে হবে আরো বিস্তর বন্ধুর পথ। চলবে

সাহিত্যের চেয়ে জীবন বড় ।। পর্ব—২

/জেডএস/
সর্বশেষ খবর
সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে পারবে তো দ. আফ্রিকা?
সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে পারবে তো দ. আফ্রিকা?
জাপানি মায়ের কাছে নয়, বাংলাদেশি বাবার কাছে থাকতে চায় মেজো মেয়ে
জাপানি মায়ের কাছে নয়, বাংলাদেশি বাবার কাছে থাকতে চায় মেজো মেয়ে
২২০০০-৫৩০৬০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরি দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২২০০০-৫৩০৬০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরি দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জেলা জামায়াতের আমিরসহ গ্রেফতার ২
জেলা জামায়াতের আমিরসহ গ্রেফতার ২
সর্বাধিক পঠিত
বগুড়া-৪ আসনের উপনির্বাচনে ৬৩ কেন্দ্রে এগিয়ে হিরো আলম
বগুড়া-৪ আসনের উপনির্বাচনে ৬৩ কেন্দ্রে এগিয়ে হিরো আলম
২৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দিচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক
২৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দিচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক
‘এবারের জয় ছিল স্মরণকালের, সরকারের প্রতি সমর্থন থাকবে’
‘এবারের জয় ছিল স্মরণকালের, সরকারের প্রতি সমর্থন থাকবে’
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রে এগিয়ে নৌকার প্রার্থী, হিরো আলম তৃতীয়
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রে এগিয়ে নৌকার প্রার্থী, হিরো আলম তৃতীয়
সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও এমপি হলেন সাত্তার ভূঁইয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উপনির্বাচনসংসদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও এমপি হলেন সাত্তার ভূঁইয়া