X
শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
উপন্যাস

মহাঘোরা ।। পর্ব—১১

আনিফ রুবেদ
০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০

[গলদ্বার থেকে মলদ্বার পর্যন্ত খেয়েও খাঁই মেটে না।]

অন্ধকার গলে গেল। পুব আকাশে টাটকা রসাল সূর্য উঠলো, রস চুয়ে চুয়ে পড়ছে যেন রসভর্তি গামলা থেকে এখনই তুলে আনা হলো।

আরতি ইউনিয়ন পরিষদের নতুন ভবনের সামনে যায়। ব্যানার টাঙানো আছে— ‘দারিদ্র্য বিমোচনের চালগম বিতরণ।’

চেয়ারম্যান তার চেয়ারে আসীন। গরীব নারী-পুরুষেরা সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তারপর পৌঁছতে পারছে চাল গমের কাছে। তারা সারিতে দাঁড়িয়েছে সেই শেষরাতের শুরুর দিকে। চেয়ারম্যান মেম্বাররা এসেছে আরো পরে।

এখন বেলা তো চড়ে গেছে আরো বেশি। রোদের ঝাপটা লাগছে বেশ। তাদের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে। লোকজন চালগমের কাছে কয়েকঘণ্টা পর পৌঁছতে পারলেও মণ খানেক গাল, তিরস্কার পাবার পর সের কয়েক চাল পাচ্ছে।

চেয়ারম্যান মেম্বার দফাদার ধটধারী সবাই-ই চালগম নেওয়াদের বাঁকা কথা বলছে— ‘এই এই ছোটোলোকের দল ভালো করে লাইনে দাঁড়া।’

‘এই এদিকে আসছিস কেন, চুরির ধান্দা করছিস নাকি? তোদের ধান্দাবাজি জানি, দূরে সরে দাঁড়া ঠিক হয়ে।’

‘এই মাগি, বেশ তো ডাঁটালো শরীর কাম করেও তো খেতে পারিস।’

‘হারামীরা মেম্বার চেয়ারম্যানদের উসিলায় গলদ্বার থেকে মলদ্বার পর্যন্ত ভর্তি করে খেতে পাচ্ছে তাও মেম্বার চেয়ারম্যানদের এতোটুকু সুনাম নাই।’

‘গলদ্বার থেকে মলদ্বার পর্যন্ত খেয়েও এদের খাঁই মেটে না।’

মানুষজন তাদের কাছে থেকে খারাপ কথা শুনেও দুখি দুখি চোখে হাসে; চাল পাওয়া হয়ে গেলে ফিরে।

ফিরতি পথে স্বচ্ছল লোকজনের সাথে দেখা হলে, তারা পরিষদ থেকে চালগম পাওয়া লোককে বলে— ‘বেশ তো বোঁচকা ভর্তি করে চাল পেয়েছ।’

আরতি ভাবে— আহারে মানুষ, ভিখারির বোঁচকা খুলে দেখে নিলে কতো কী পেয়েছে, বুক খুলে দেখলে না ভিখারির বোঁচকার প্রতিটা পয়সার গায়ে, চালের গায়ে কত লাঞ্ছনাময় কথা আর ব্যথা লেগে আছে।

ঘণ্টাখানেক পর আরতি পৌঁছতে পারে ধটধারী যেখানে চালগম মাপছে তার কাছে। এখনো চারপাঁচজন তার সামনে আছে। সে ধটধারীর ধটের দিকে তাকিয়ে আছে; প্রতি পাল্লা মাপেই সে কিছুটা করে কম দিচ্ছে। কেউ যদি কিছু বলছে তো চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে। তার চোখ পাকানো এমনই যে কেউ কিছু বলার আর সাহস পাচ্ছে না। এবার আরতি একেবারে ধটধারীর কাছে চলে এসেছে। সে তার আঁচল পেতে দেয় ধটধারীর সামনে। ধটধারী লোকটা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ারম্যানের দিকে তাকায়। চেয়ারম্যান আরতির দিকে তাকায় ত্যাড়া চোখে।

একজন মেম্বারের দিকে তাকিয়ে চেয়ারম্যান বলে— ‘কে এ রে? শ্রীদামের বেলেল্লা বউটা না, যে রমজান ডাক্তারের বিছানায় গেছিলো কয়েকমাসের জন্য?’

মেম্বার হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে।

চেয়ারম্যান বলে— ‘ওকে চাল দিও না। যৌবন জ্বালা তার মেলা। যৌবন আগে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাক, রস শুকিয়ে মাঠ হয়ে যাক, তারপর দেখা যাবে।’

লোকজন হেসে ওঠে নির্মম স্বরে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো এসব হাসি। লজ্জায় অপমানে ব্যথায় আরতির মাথা নুয়ে আসে। এই দুস্থ জীবন তুস্থ জীবন চলে গেলে খুব আরাম হতো এখন। সে সেখান থেকে চলে আসে।

কোনো স্থান থেকে চলে আসতে পারে কিন্তু লজ্জা থেকে, অপমান থেকে চলে যেতে পারে না। সে যে স্থানে যাবে সেখানেই রোদের মতো, বাতাসের মতো, চাঁদের কিরণের মতো, অন্ধকারের মতো লজ্জা-অপমান গায়ে এসে পড়ে তার। লজ্জা-অপমান তার পোশাকের মতো হয়ে গেছে।

এই মানবজঙ্গলে, মানবের নিন্দা-ঘৃণার জঙ্গলে ইঁদুরের মতো পায়ের তল থেকে পায়ের তলে পিষ্ট হতে হতে কতদিন বাঁচতে হবে কে জানে?

সত্যিকার জঙ্গলে যদি সে চলে যেতে পারতো, যদি বাঘের পেটে চলে যেতে পারতো?

কিন্তু বনও তো আর নেই, সব বন কেটে মানুষ বাগিচা বানিয়েছে। বনপালিত আদিম মানুষ এখন আধুনিক মানুষ হয়েছে; বনকে গৃহপালিত বানিয়েছে, চিড়িয়াখানা বানিয়েছে। বাগিচাতে, চিড়িয়াখানাতে বিড়ালের মতো বাঘ পুষে মানুষ-বাঘ।

 [কোন নাগের দংশনে আকাশ এতো নীল।]

সূর্য বেশ পেকে গেছে। উজ্জ্বলন্ত সূর্য। সূর্যের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার অন্তরে কোনো দয়ামায়া নেই। দাঁতে নখে শান দিয়ে বের হয়ে বাঘপনা দেখাচ্ছে।

সূর্যের দুর্জয় দাব ঠেলে সে পরিষদের ওখান থেকে চলে এসেছে নদীর দিকে। রোদে তাপে চাঁদি ফেটে যাবার অবস্থা। নদীর ধারে একটা আমগাছের নিচে বসে আছে। সে অভিমান করে বসে আছে। কার ওপর অভিমান তা সে জানে না। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে। শিশুর মতো ঠোঁট ফুলে ফুলে উঠছে।

অভিমানে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, কিছুই খাব না আর কোনোদিন। না খেয়ে খেয়ে মরে যাব।

আরতির শ্বাস-প্রশ্বাসের পিপাসা আর মোটেও নেই। বাতাস জোর করে তার ভেতর ঢুকছে বেরুচ্ছে, ঐ তো সেই লোকের মতো যে জল পান করতে নদীতে যায়, পাড় ভেঙে পড়ে যায় নদীতে, জলপান করতেই থাকে, সে নদীকে বলে আর জল পান করব না এবার ছেড়ে দাও, নদী হো হো করে হাসে, তাকে ছাড়ে না— নে জীবনের মতো জল পান করে। তেমনই যেন আরতি, পা হড়কে কোনো পৃথিবী থেকে বায়ুপানের আশায় এই বায়ুপূর্ণ পৃথিবীতে পড়ে গেছে। সে আর বায়ু পেতে চায় না কিন্তু বায়ু ছাড়ছে না তাকে। সে আর আয়ু চায় না কিন্তু আয়ু তাকে ছাড়ছে না।

সে বসে থাকে। কিন্তু তার পেট বসে থাকে না, পেট কাজ করতে থাকে। আরতির পেট আরতিকে গলা ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে হাঁটাতে চেষ্টা করে। এক সময় পেট সফলও হয়, যেমনভাবে তার যৌবন সফল হয়েছিল আপন পায়ে কুড়াল মারতে; বাড়ি ছাড়া হতে, সমাজ ছাড়া হতে, শ্রীদাম আর আদরের মাধবী ছাড়া হতে।

একেবারে খাঁখাঁ করা নিস্তল নীল আকাশ ওপরে।

আকাশকে তো কোনো সাপে দংশন করে না তো এতো নীল হয় কেন?

নাকি দংশন করে?

কোন সাপের দংশনে আকাশ এমন নীলাক্ত?

এমন নীরস নীলের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না আরতি। তপ্তোজ্জ্বল সূর্যের আলোয় চোখ ঝলসে ওঠে। দশদিগন্ত নগ্নকারী সূর্য আরো ওপরে উঠে গেছে। প্রচণ্ড তাপমাখা তার আলো। আরতির পেটে ক্ষুধা। সূর্যের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। কে খেতে পাচ্ছে, কে পাচ্ছে না তা দেখে না সূর্য। সে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আকাশ পথে বিন্দু বিন্দু গতিতে এগিয়েই যাচ্ছে। সূর্য গান গাইছে দেখে আরতির রাগ হয়। আরতির রাগ হচ্ছে দেখে সূর্য শয়তানি করে তার গানের সুর আরো এক পর্দা চড়িয়ে দেয়, সুরে আরো বৈচিত্র্য আনে। সূর্য পাড়ার বখাটের মতো, মস্তানের মতো আরতিকে জ্বালায়; আরতির সাথে বখামি করে।

নদীর তীর থেকে উঠে আরতি কাছের বাজারের কাছে যায়। একটা ফলের দোকানের সামনে দাঁড়ায়। রাশি রাশি আপেল, আনার, কাজু, কলা, কমলা, থোকা থোকা আঙুর ঝুলছে দোকানে। দোকানটা যেন একাই একটা হরেক ফলের গাছ।

সে বাইরের কারো কাছে কিছু চাইনি কখনো। এটা তার মনে হলে সাথে সাথে মনে প্রতিবাদী কথা ভেসে আসে, মিছে কথা বলিস না আরতি।

তুই রমজান ডাক্তারের কাছে টাকা চাসনি, থাকা চাসনি, শিশ্নাঘাত চাসনি? পরধনে খাবার খেলি, পরধোনে যৌবন চালালি আর এখন বলছিস কারো কাছে কিছু চাসনি।

চাইতে চাইতে তুই তোর ধর্ম বিলিয়ে দিলি, রামের বাড়া শ্রীদাম বিলিয়ে দিলি, জাত বিলিয়ে দিলি, সোনার চাঁদ মাধবী বিলিয়ে দিলি। রমজান ডাক্তার তোর কেউ হলো না। ইসলামধর্ম তোর কেউ হলো না। হিন্দুধর্মও কেউ হলো না। তুই এখন হিন্দুও না, মুসলমানও না।

সে ভেবে দেখে কথাটা সত্য। মুসলমান ধর্মের প্রতি কোনো লোভ বা টান থেকে সে মুসলমান হয়নি। সে মুসলমান হয়েছে, গৃহত্যাগী হয়েছে যৌবনের জ্বালায়, খাদ্যের থালায় বন্দী হয়ে। হায়রে জীবন, হায়রে যৌবন।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার দীর্ঘশ্বাসের ফলে কোনো কুয়াশা তৈরি হলো না। সে চায় তার দীর্ঘশ্বাসের বাষ্পে চারদিকে কুয়াশা নেমে আসুক, সবকিছু ঢেকে যাক। কিন্তু কিছুই হয় না, তার দীর্ঘশ্বাস বিশাল বিপুল বাতাসের কাছে অতি সামান্য। তার কাছে যা দীর্ঘশ্বাস, বাতাসের কাছে তা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তার দীর্ঘশ্বাস বাতাসের শরীরকে একটু হিলাতেও পারে না।

দোকানে আরেকরকম ফল ঝুলছে; অক্ষরফল— ‘বাকি চাহিবেন না। বাকির নাম ফাঁকি।’

সে ভাবে— দোকানি ভাবছে বাকির নাম ফাঁকি। কিন্তু যে বাকি নেয় সে বাকিকে কী ভাবে?

দোকানি ভাবে চুরি করা পাপ কিন্তু যে চুরি করে সে চুরিকে প্রকৃতই কী ভাবে?

কোনো দোকানে তো লেখা থাকে না— এখানে চুরি করবেন না। কেন লিখে রাখে না কেউ?

তাহলে চুরি করা কি ঠিক আছে?

অথবা এজন্য কি লিখে রাখে না, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি?

তাহলে যার এখন টাকা নেই কিন্তু খাবারের দরকার আছে এবং কয়েকদিন পরেই হাতে টাকা আসবে সে কেন ‘বাকি চাহিবেন না। বাকির নাম ফাঁকি।’ জাতীয় ধর্মের কাহিনি শুনবে?

সে খেয়াল করল ফলের দোকানদার তাকে হাতের ইশারা করছে। ইশারাতে ডাকছে না। বিপরীতমুখী ইশারা। ইশারাতে চলে যেতে বলছে। সে এতক্ষণ অক্ষরফলগুলোর দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো। সূর্যের হাঁটা দেখতে পায়নি, তার দীর্ঘশ্বাস সামান্য একটা খড়ের মতো বাতাস সমুদ্রে ভেসে গেছে, সেটা দেখতে পায়নি, দোকানদারের ‘চলে যা’ নির্দেশক হাত নাড়া দেখতে পায়নি।

সে আরো দেখতে পাচ্ছে না, তার পরনের কাপড়ের একটা জায়গা ফুটো হয়ে রোদ ঢুকছে।

দেখতে পাচ্ছে না, তার জন্য কোথাও কোনো খাবার রাখা আছে কিনা। সে দেখতে পাচ্ছে না কতো কিছু।

শুধু দেখতে পাচ্ছে, পেটের ভেতর ক্ষুধার চলাচল। ক্ষুধার শ্বাসপ্রশ্বাস সে শুনতে পাচ্ছে। ক্ষুধার চড়-থাপ্পড় সে অনুভব করতে পারছে চরমভাবে। দোকানদারের আচরণে সে আহত হয়।

দোকানদার কি তাকে চোর ভেবে নিলো?

দোকানদার কি তাকে বাকির গ্রাহক ভেবে নিয়ে এমন করলো?

আরতি ফলের দোকানের সামনে থেকে সরে আসে, দূরে গিয়ে ফাঁকা মতো একটা জায়গায় বসে। তার সামনে কতকালের বা গতকালের একটা পেপারের খণ্ড পড়ে আছে। সে বিড়বিড় করে পেপার পড়ার চেষ্টা করে।

বহুদিন আগে সে হাইস্কুলে পড়তো। কয়েকঘর ওপরে পড়ত শ্রীদাম। শ্রীদামকে দেখে এতো সুন্দর লাগতো! আরতি তার প্রেমে পাগল হয়ে গেল। কিন্তু শ্রীদামের আরতির দিকে কোনো মনোযোগই নেই। সে শুধু পড়া নিয়ে থাকে। আরতি তাকে আকারে ইঙ্গিতে কতো কী বলার চেষ্টা করে, শ্রীদাম বুঝতেই পারে না। তার খুব রাগ হতো। কিন্তু আরতি চেষ্টা ছাড়েনি। চেষ্টা করতে করতে তার চেষ্টা কেষ্টা হয়েছিলো।

শ্রীদাম একদিন ঠিকই মজে যায় তার প্রেম্বনে, চুম্বনে, যৌবনে। শ্রীদামের পড়াশোনার চেয়ে আরতিতে মতি বেশি করে নিয়োজিত হয়ে গেল। পরে তারা বিয়ে করে। শ্রীদাম কলেজ পাশ করে কেবল বিএ ভর্তি হয়েছিলো।

বিয়ে করার ফলে পড়াশোনা ছেড়ে প্রেসে কাজ নেয় শ্রীদাম, টাইপ বসানোর কাজ। এসব ভাবতে ভাবতে আরতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আহারে, শ্রীদামটা তার জন্যই মজে গেল। সেই তাকে মজিয়ে দিল নইলে সে কিই-না হতে পারত। তার পড়াশোনার প্রতি যে ঝোঁক ছিল তাতে নিশ্চয় সে ভালো কোনো চাকুরি করতে পারতো; উকিল হতে পারতো, হাকিম হতে পারতো, কোনো অফিসের হর্তাকর্তা হতে পারতো। কিন্তু সেসব দিক তখন একবারও ভাবেনি আরতি। শ্রীদামের জোর ছিল না আরতির ওপর দিয়ে কথা বলার। কারণ চুম্বনের প্রতি, সঙ্গমের প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়ে গেছিল। এই আকর্ষণ আরতিই তৈরি করেছিলো ইচ্ছে করে। তাতেই রসে ভেসে গেল শ্রীদামের জীবন তৈরির স্বপ্ন।

আরতি আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার দীর্ঘশ্বাসের বাতাসে মাটিতে পড়ে থাকা পেপারটা নড়ে ওঠে। পেপারে ছাপানো ছবি-মানুষটা নড়ে ওঠে। ছবি-মানুষের নড়ে ওঠা দেখে প্রথমে চমকে ওঠে আরতি, ছবির মানুষ নড়ে কী করে!

আরতি পেপারটা হাতে নেয়। বিড়বিড় করে পড়ে। খুনের খবর। লোকটাকে খুন করেছে আরো কয়েকজন লোকে। আরতি ছবিলোকটার দিকে তাকায়। পড়ে থাকা পেপার পড়ে তার মন খারাপ হয়ে যায়। কোথাকার কোন লোকে? কোথাকার কোন লোকেরা তাকে খুন করেছে? কিছুই জানে না অথচ তার জন্য তার মায়া হচ্ছে।

অন্য মানুষের প্রতি মায়া থেকে মায়াটা তার নিজের দিকে ঘুরে আসে। তার মনে হয়, কতো আর নিজেকে নিজের মাথায় করে নিয়ে বেড়াবে, এখন তারই মৃত্যুর বেশি প্রয়োজন। প্রতিদিন কতো লোকই তো খুন হচ্ছে, তাকেও কি কেউ খুন করতে পারে না? কেউ কি খুন করে তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে না? যদি এমনটা হয় তবে সে খুব খুশি হবে। যদি পরপারে স্বর্গ বলে কিছু থাকে, বেহেশত বলে কিছু থাকে তবে সে প্রার্থনা করবে তার খুনি যেন ঐ স্বর্গে বা বেহেশতে যেতে পারে।

এসব ভাবতে ভাবতে সে এমনভাবে বসে যেন অপেক্ষা করছে, খুনির জন্য, যেন এক্ষুনি কোনো খুনি চাকু ছোরা হাতে এসে তাকে খুন করবে, সে আনন্দ নিয়ে দেখবে তার খুন হওয়া, খুশি হয়ে দেখবে খুনির খুন করা। কিন্তু কোনো খুনি আসে না তাকে খুন করার জন্য।

আরতি বিড়বিড় করে— ‘ও এখন যে খুনি আমার জন্য প্রয়োজন তাই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনের জিনিস পাওয়া যায় না। এখন তার খুনি প্রয়োজন, এখন তার কাছে খুনি আসছে না।’

সে পেপারটা ফেলে দিল। কতজনের পায়ের ছাপ এ পেপারটার ওপর আছে। কতজন চলে গেছে এই খুন হওয়া লোকটার মুখে পা মাড়িয়ে। হয়তো লোকজন এ লোকটার মুখমাখা পেপারটার ওপর বাদাম ভাজা বা গজা বা বাতাসা বা জিলাপি খেয়েছে। জিলাপির রস লাগা লোকটার মুখছাপা কাগজে পিঁপড়ারা দল বেঁধে খেয়েছে জিলাপির রস। অন্যদিকে লোকটার বউ বা মা বা বাবা বা সন্তান এই পেপারটাকে বুকে চেপে ধরে বসে বসে কাঁদছে।

আরতি সূর্যের দিকে তাকাল। সূর্য মাঝ আকাশে একটা ডিমের কুসুমের মতো ফুটছে। এ কদিনে যতবার সে সূর্যের দিকে তাকাল সারাজীবনে আর কখনো তাকায়নি।

সে আবার সূর্যের দিকে তাকাল। ডিমের কুসুমের মতো সূর্য-বাঘের মতো হয়ে গেছে।

ডিমের ভেতর থেকে বাঘ বেরোয়?

ও ডিম কি বাঘের ডিম ছিল?

বাঘের ডিম থেকে বাঘ বেরিয়ে এলো?

সূর্যটাকে একটা বাঘের মুখই তো লাগছে, রশ্মিগুলোকে সূর্যবাঘের গোঁফের মতো লাগছে, রোদগুলোকে গরম লালার মতো লাগছে। বাঘসূর্য আলোকনখরে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে।

আরতি বসে আছে। তার ক্ষুধা শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে। ক্ষুধা যখন পেটের ভেতর জন্ম নেয় তখন শাবক বাঘের মতো থাকে, তারপর ধীরে ধীরে পূর্ণযৌবনা বাঘের মতো দাপাদাপি শুরু করে, হাঁকডাক শুরু করে, তোলপাড় তুলে দেয় পেটের ভেতর। পরে যখন দাপাদাপিতেও কাজ হয় না তখন ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগেও যখন খাবার পায় না তখন সেটা চোর হয়ে যায়, চোরের মতো চুপি চুপি অল্প অল্প করে প্রাণ কাটতে শুরু করে। আরতির ভালো লাগছে যে ক্ষুধাটা এখন ঘুমিয়ে আছে। পেটের ভেতর তেমন আর দাপাদাপি করছে না। তবে তার জেগে যেতে কতক্ষণ। জেগে গিয়ে আবার দাপাদাপি শুরু করবে।

দুপুর পার হয়ে চলে গেল নূপুর বাজাতে বাজাতে। তবু চরম রোদ। চ্যাটচেটে আঠালো লেইয়ের মতো রোদ; যেন বীর্য; সূর্যের সোনালি বীর্য। একেবারে গায়ের সাথে লেগে যাচ্ছে রোদের গরম সোনালি লেই। রোদের গায়ে আলো আছে, রং আছে, তাপও আছে।

রোদের গন্ধ আছে কি?

প্রশ্নটা মনে জাগতে জাগতেই সে রোদের মৃদু গন্ধ পায়। এতই মৃদু যে কিসের মতো গন্ধটা তা বুঝতে আরো একটু গাঢ় গন্ধ দরকার। গন্ধটা আরো গাঢ় আর গভীরভাবে পাবার জন্য গভীরভাবে শ্বাস নেয়। যত গভীরভাবে শ্বাস নেয় তত পাতলা হয়ে যায়, তত হারিয়ে যায় রোদের গন্ধ। রোদের ভেতর নাক ডুবিয়ে রোদের গন্ধ পেতে শ্বাস নিচ্ছে। শ্বাস নিতে নিতে হাঁপিয়ে ওঠে, গাঢ়ভাবে রোদের গন্ধ পাওয়া হয় না।

খুন হওয়া লোকের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বহুটা সময় কেটে গেছে। ‘আমাকে যদি কেউ খুন করে তবে সেটা খুব ভালো হবে’ মনে হবার পর থেকে আরতির ক্ষুধা আর জাগেনি। হয়তো ক্ষুধার মনে হয়েছে— যে খুন হবে তাকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ কী?

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলা করতে চাই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলা করতে চাই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
বইমেলার কবিতার বই: পাঁচ বছরে বাজারে এসেছে প্রায় ছয় হাজার, মান নিয়ে বিতর্ক
বইমেলার কবিতার বই: পাঁচ বছরে বাজারে এসেছে প্রায় ছয় হাজার, মান নিয়ে বিতর্ক
‘বুড়ো, কিন্তু নট আউট’
মুশফিক-মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে তামিমের বার্তা‘বুড়ো, কিন্তু নট আউট’
আগুনে পোড়া শহরে এসে বলিউড বাদশাহ’র নীরবতা
আগুনে পোড়া শহরে এসে বলিউড বাদশাহ’র নীরবতা
সর্বাধিক পঠিত
দুই ছেলের আবদার মেটাতে গিয়ে লাশ হলেন মা’সহ ৩ জনই
দুই ছেলের আবদার মেটাতে গিয়ে লাশ হলেন মা’সহ ৩ জনই
আগুন কেড়ে নিলো ইতালি প্রবাসী মোবারকের পরিবারের সবাইকে
আগুন কেড়ে নিলো ইতালি প্রবাসী মোবারকের পরিবারের সবাইকে
নতুন ৭ প্রতিমন্ত্রী: কে কোন দফতরে
নতুন ৭ প্রতিমন্ত্রী: কে কোন দফতরে
তুরস্কের কাছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্তে অটল যুক্তরাষ্ট্র
তুরস্কের কাছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্তে অটল যুক্তরাষ্ট্র
বেইলি রোডের আগুনে প্রাণ গেলো অতিরিক্ত ডিআইজির বুয়েট পড়ুয়া সন্তানের
বেইলি রোডের আগুনে প্রাণ গেলো অতিরিক্ত ডিআইজির বুয়েট পড়ুয়া সন্তানের