X
রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
উপন্যাস

মহাঘোরা

আনিফ রুবেদ
০৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১৫:১৯আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১৫:১৯

শেষপর্ব


মাধবী

[শিশ্নের সংসার। পায়জামা। গায়জামা। মাইজামা। নাইজামা।]
মাধবী শিশ্নের সংসারে পতিত হবার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম পায়নি। প্রতিদিন পায়জামা খোলে। গায়জামা খোলে। মাইজামা খোলে। নাইজামা দেহে পড়ে পড়ে ক্ষত হয়।
তার শরীরে প্রথম দিনে তৈরি হওয়া ক্ষতের ওপর আবার ক্ষত তৈরি হয়েছে। তারপর আবার। ক্ষত। আবার আবার। ক্ষত। আবারও আবার। ক্ষত। আবার আবারও। ক্ষত। তারপর আবারও। কত ক্ষত। শত শত ক্ষত। ক্ষতগুলো ক্ষত হতে হতে সেরে উঠছে। ক্ষতের তাহলে আসলে কোনো ওষুধ নেই, ক্ষতর ওষুধ আরেকটা ক্ষত। প্রচুর ব্যথা পেয়েছে সে। তার ব্যথা সারিয়ে দেবার মতো একটু কথা কেউ বলেনি। ব্যথাতে ব্যথাতে ব্যথা সেরে উঠছে।
যার ওপরে কেউ কোনো মমতা করে না সে তার নিজের ওপরেও মমতা করতে ভুলে যায়। সে মেনে নেয় মমতার অধিকার তার নেই। সে নিজে তার ওপর আর মায়া করে না। মায়া করে, মমতা করে কোনো লাভ নেই।
তার দেহ, দেহের পেলবতা শত শত পুরুষের পেশলতা দ্বারা পিষ্ট। নষ্ট হয়েছে তার ফুলের পেলবতা। সে এখন পেলব পাথর। শরীরে তুলোর পেলবতা, ভেতরে পাথরের নিষ্প্রাণতা। এই তুলোর পেলবতা নিয়েই বেশ্যাগামীরা খুশি আছে, এই লেপ তোষক আসবাবের মতো মাধবীর শরীর নিয়ে তারা খুশি আছে।

এ বেশ্যাখানাতে অনেক বেশ্যা থাকে। বেশ্যাখানা কামের কারখানা। বেশ্যাখানা মাংস-মাংসির কারখানা। এখানে যেসব নারীদের ধরে নিয়ে আসা হয়, তারা আর নারী থাকে না, তারা হয়ে যায় বারযোষিৎ—বেশ্যা। এ হিসেবে মানুষ তিন প্রকার, পুরুষ, নারী আর বেশ্যা। মাধবী এখন বেশ্যা—পণ্যাঙ্গনা।

তার চোখ থেকে থেকেই ছলছল করে ওঠে। তার পিঠে একটা হাত পড়ে। প্রথমে সে চমকে ওঠে, পরেই বুঝতে পারে এ হাত কোনো পুরুষের হাত নয়। সে পাশ ফিরে দেখে তার পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে শাপলা। তার মুখে স্নিগ্ধ হাসি। এ হাসিতে প্রশ্রয় আছে। এ প্রশ্রয় পেয়ে মাধবী একেবারে গলে পড়তে চাইল। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে আরো জল ঝরতে লাগল। দাঁড়ানো শাপলার মাজা এক হাতে ধরে তার পেটের কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে আরো জোরে ফুঁপিয়ে ওঠে মাধবী। শাপলার মিঠে হাত মাধবীর পিঠে স্নিগ্ধতা মেখে দিচ্ছে। মাধবীর ফুঁপানি থামে না। মাধবীর চোখের জল শাপলার পেটের নাভি গর্ত ভর্তি করার পর গড়িয়ে পড়ছে। শাপলার নাভিকে একটা চোখের মতো মনে হতে পারে। শাপলার পেটের ভেতর থেকে বের হওয়া চোখ কোন দূরের দিকে তাকিয়ে আছে। শাপলার পেট থেকে বের হওয়া নাভি-চোখ দিয়ে জল ঝরছে যেন। ধীরে ধীরে মাধবীর ফুঁপানো থামতির দিকে আসে।

মাধবীর মনে পড়ে তার দিদিমা বলত—‘কেউ কেউ কেউটে, কেউ কেউ কেউ না, কেউ কেউ কেউ।’
তার দিদিমা আরো বলত—‘একটা মানুষ যত খারাপ অবস্থাতেই থাক না কেন কেউ তার থাকেই, একটা মানুষ যত ভালো অবস্থাতেই থাক না কেউ কেউ তার কেউই হবে না।’
একটা ছেঁড়া ফলের মতো এই বেশ্যাখানাতে পড়ার পর সবার দাঁতের তলে ছিঁড়ে যেতে যেতে তার দাদির কথাকে তার মিথ্যা মনে হতো। কিন্তু কয়েকদিন পর শাপলার সাথে মাধবীর পরিচয় হবার পর দিদিমার কথাকে ঠিক মনে হয়।
‘কেউ কেউ কেউ’ কথাটার ‘কেউ’ হলো শাপলা। ‘কেউ কেউ কেউটে’ কথাটার ‘কেউটে’ হলো তার মা আরতি, রমজান ডাক্তারের মেজো ছেলে, এখানের বেশ্যাওয়ালি প্রৌঢ়া। ‘কেউ কেউ কেউ না’ কথাটার কেউ না হলো, এখানে আসা বেশ্যাসক্ত সমস্ত পুরুষ।
পুরুষ বেশ্যাগামী। পুরুষ বিশ্বগামী। সব তারা ভোগ করবে কিন্তু ভোগ্যের কেউ হবে না তারা।

শাপলা ধীরে ধীরে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়; পিঠের ওপর মিঠে পরশ মাধবী গ্রহণ করে বিড়ালছানার মতো। এখানে আসার পর থেকে এই শাপলাই তাকে একটু একটু করে সান্ত¦নার কথা বলে। একটু আদর দেয়। মায়াদয়া করে।
শাপলা মাধবীর চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়ো। এখানে তার আসা হয়েছে চার পাঁচ বছর। এখন তার ওপর আর কড়াকড়ি নেই। ইচ্ছে করলেই এখান থেকে বের হয়ে চলে যেতে পারে। কিন্তু কোথায় যাবে সে। সে তো এখন কোনো মানুষ হয়ে নেই, নারী হয়ে নেই, সে হয়ে গেছে বেশ্যা— বারবিলাসিনী। বেশ্যাখানা ছাড়া আর কোথাও বেশ্যার গ্রহণযোগ্যতা নেই।

মাধবী একটু ধাতস্থ হয়।
সে শাপলাকে বলে—‘তুমি না বেরোও, আমি যেদিনই হোক না কেন এখান থেকে বেরুবই, মরণের একদিন আগে হলেও।’
শাপলা বলে—‘আচ্ছা বের হয়ে যেও।’
কখন যে তারা তাদেরকে তুই করে বলে, কখন তুমি করে বলে তার ঠিক নেুই। যখন যেভাবে মন লাগে তখন সেভাবে বলে।

আরো কিছুক্ষণ শাপলা তার সাথে বসে থাকে। তারপর ওঠে। শাপলার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। শাপলা গিয়ে প্রৌঢ়ার কাছে থামল। কী যেন বলছে তাকে। শোনা যাচ্ছে না।
কানের সীমা কী নির্মম। অল্প একটু দূরেই তোমার সম্বন্ধে কী বলছে কিছুই বুঝতে পারা যাচ্ছে না। তুমি তাকে বন্ধু মনে করছ বা শত্রু মনে করছে অথবা কিছু মনে করছ না। কিন্তু পৃথিবীর যে প্রান্তেই যখনই কোনো কণ্ঠ ক্রিয়া করে উঠছে তা তোমার বিপক্ষে বা পক্ষে যাচ্ছে। দেখ চোখের সীমার ভয়াবহতা, জগতের যে কোনেই কোনো হাত কোনো কাজ করে উঠছে তা তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে যাচ্ছে অথচ তুমি দেখতে পাচ্ছ না। মাধবীর সন্দেহ জাগে। শাপলা কি প্রৌঢ়ার হয়ে কাজ করছে যাতে মাধবী শান্ত থাকে। যাতে মাধবী বেশ্যাজীবন মেনে নেয়।
শাপলার দয়া দেখানো কি দেখানো দয়া?
শাপলার মায়ামমতা কি মিথ্যা?
ফিতাকৃমি পেটের ভেতর কী করে তার আন্দাজ পাওয়া যায় কামড়ে কামড়ে, ব্যথায় ব্যথায়, মিতাকৃমির পেটে কী থাকে কেউ জানে না; জানতে পারে একেবারে যখন আর ফেরার পথ থাকে না।
শাপলা মিতামর্মি না মিতাকৃমি কে জানে?
শাপলার মিতালি কি মিতালি না মিথ্যালি?
এখন থেকে সবকথা বলা ঠিক হবে না বলে মনে হয় মাধবীর। আবার মনে হয়, নাহ্ শাপলা ভালো, খুব ভালো। তাকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না। সে তো তার জীবনের সব কথা বলেছে তাকে। এখনো বলে। সর্দারনির বিরুদ্ধেও বলে। এখানে কিভাবে এসে পড়েছে সেটাও শুনিয়েছে।

শাপলা বলেছিল—স্কুলে যাওয়া-আসার পথে একটা ট্রাক-স্ট্যাণ্ড ছিল। ট্রাক টার্মিনালের কাছ দিয়ে আসার সময় প্রায়ই একটা লোক তার সাথে কথা বলতে চাইত। একটা দুটো করে কথা বলতে বলতে একসময় তার সাথে কথা বলাটা একটা নেশার মতো হয়ে যায়। এটা কি প্রেম? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজি। প্রশ্ন থাকেই উত্তর কোনোদিন পাইনি। এমনকি উত্তরের আভাসও পাইনি।’

শাপলা বলেছিল—‘লোকটা ছিল ট্রাক-ড্রাইভার। একদিন লোকটা বাড়ির সামনে ট্রাক নিয়ে হাজির হয়। বের হয়ে দেখে অবাক হই, খুশি হইও খুব। এতই উৎফুল্ল হয়ে যাই যে সে দৌড়ে তার কাছে চলে যাই তাকে জড়িয়ে ধরার জন্য।
কিন্তু ট্রাক ড্রাইভার তাকে বলেছিল—“থামো, এত উতল হলে কি চলব, এখানে তোমার বাসার আশপাশের লোক দেখে নিলে কী হবে বলো তো?”
চেতন ফেরে তাই তো, খুশির জ্বালায় এসব মনেও ছিল না। লোকটাকে আরো বেশি ভালো লেগে গেছিল।
ড্রাইভার বলেছিল—“আমি সন্ধ্যার দিকে আসব ট্রাক নিয়ে। আজ ট্রাক বসেই আছে, কোনো ভাড়াভুত্তি নাই। একবার হর্ন দিলেই তুমি বেরিয়ে এসো। তোমাকে নিয়ে আজ ঘুরতে যাব। কিছুক্ষণ ঘুরে তোমাকে রেখে যাব।”
এসব বলে সে ট্রাক নিয়ে চলে গেছিল।

শাপলা তার উচ্ছ্বাসের কথা বলেছিল—‘সন্ধ্যা হবার আগে থেকেই কানকে খাড়া করে রেখেছিলাম। সময় যেন পার হতেই চাচ্ছিল না। সন্ধ্যা লাগতে যে এত দেরি হয় ব্যাপারটা জানা ছিল না। সন্ধ্যাকে ডাকতেই ছিলাম। সন্ধ্যা আমার কথা শুনে বিরক্ত হয়ে এসেই পড়েছিল। সন্ধ্যা লাগার কিছুক্ষণ পরেই ট্রাকের হর্ন বেজে ওঠে। আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে ট্রাকে উঠেছিলাম। ভালো লাগছিল। ড্রাইভার বেশ কিছুদূর যাবার পর একটা ফাঁকা মতো জায়গাতে গিয়ে দাঁড় করে।’

শাপলা পরিবেশও বর্ণনা করেছে—‘সেখানে কোনো লোকালয় ছিল না। সামনে পিছনে পাশে শুধু ধান খেত। ট্রাক যেখানে দাঁড়ানো সেখান থেকে একটু দূরে একটা ঘাস বিছানো ফাঁকা জায়গায় দুজনে বসি। বসে থাকতে থাকতেই ড্রাইভারের হাত সরব হয়ে উঠেছিল আমার বুকের ওপর। ঠোঁট সচল হয়ে উঠেছিল ঠোঁটের ওপর। শরীর পাগল হয়ে গেছিল। শরীর গলে যেতে চাচ্ছিল। শরীর মিশে যাচ্ছিল ড্রাইভারের শরীরের সাথে। উন্মাতাল হয়ে গেছিলাম। চুম্বনের উত্তাপে ফুটতে থাকে শরীর। এতদিন ভেবে এসেছিলাম, ঠোঁটের কাজ শুধু কথা বলা। কিন্তু না, ঠোঁটের কাজ শুধু কথা বলা না। এতদিন ভেবেছিলাম, একজনের ঠোঁটের কাজ আরেকজনের কানের সাথে, কিন্তু দেখছি, একজনের ঠোঁটের সাথে আরেকজনের ঠোঁটেরও কাজ আছে। ঠোঁটে ঠোঁটে সেলাই আছে।’

শাপলা বলেছিল—‘এরপর থেকে কথা বলার নেশার চেয়ে বেশি ধরে গেল শরীরে শরীরে কথা বলার নেশা। মাঝে মাঝেই ড্রাইভারের সাথে বের হয়ে যেতাম। ঘাসের বিছানায় ওড়না বিছিয়ে শুয়ে থেকেছি দুজনে। কিন্তু খুব বেশিদিন চলতে পারে না ব্যাপারটা। লোকের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছিল। বাড়িতেও কথাটা পৌঁছে যায়। বাড়িতে বিয়ের জন্য কথা বলতে থাকে। কিন্তু আমি বাঁকিয়ে বসেছিলাম। বিয়ে করব না অন্য কাউকে।’
একদিন ড্রাইভারকে সব খুলে বলি। ড্রাইভার গা ছাড়া ভাবে কথা বলা শুরু করে। তার ভেতর খুব একটা ভালোবাসা আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। ভালোবাসা তার কাছে শুধু আমোদপ্রমোদের বিষয় ছিল যেন শুধু। ভালোবাসা তো আমোদপ্রমোদের বিষয় নয়।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শাপলা বলেছিল—‘তখনই আমার থেমে যাওয়া উচিত ছিল। যে ভালোবাসে না যার কাছে ভালোবাসা শুধু আমোদপ্রমোদের বিষয় তার কাছে ভালো কিছু আশা করাটা বোকামি ছিল আমার। কিন্তু থামার মতো বুদ্ধি ছিল না আমার। তাকে বিয়ের কথা বলতেই থাকি।
একদিন ড্রাইভার বলে—‘ঠিক আছে বিয়ে করব, সময়ক্ষণ ঠিক করি।’
আমি বলেছিলাম—‘দ্রুতই করিও।’
ড্রাইভারের আবার দেখা নেই। মহামুস্কিলে পড়ি। কয়েকদিন পর হঠাৎ দেখা হয় ড্রাইভারের সাথে। আমি তাকে গিয়ে ধরি।
ড্রাইভার বলেছিল—‘ঠিক আছে পরশু দিন সন্ধ্যায় প্রস্তুত থেক, আমি ট্রাক নিয়ে আসব।’
ভালো করে বিশ্বাস করতে পারিনি। ভেবেছিলাম—এও এক ফাঁকাপূর্ণ কথা। তবু একটা দোলাচলের ভেতর দিয়ে অপেক্ষা করে থাকি।’

শাপলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—‘নির্দিষ্ট দিনে ট্রাক নিয়ে হাজির হয় ড্রাইভার। আমাকে নিয়ে চলে যায় বহুদূর। ট্রাক চলে, চলতেই থাকে। থামবে না যেন কোনোদিন।
একসময় থামে। একটা জঙ্গলের ভেতরে গিয়ে একটা ভাঙা বাড়ির মধ্যে নিয়ে তোলে আমাকে। গা ছমছম করছিল। ড্রাইভারের মুখ কেমন শক্ত শক্ত। ভয় ভয় লাগছিল। ড্রাইভারের মেজাজের মতো চারপাশের রূপ।
একটা মোম জ্বালিয়ে ড্রাইভার বলেছিল—‘তুমি এখানেই কিছুক্ষণ থাকো আমি আসছি।’
সে যাবার কিছুক্ষণ পরেই অন্য একটা লোক আসে।
সে এসে ফিসফিস করে বলে—‘শোনো, তোমাকে খুন করার জন্য ড্রাইভার নিয়ে এসেছে। আমাকেও এনেছে খুনে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু আমি আসলে খুনি না, ড্রাইভারের বন্ধু বলেই এখানে এসেছি। আমি চাইছি তুমি খুন না হও। চলো তোমাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যায়। পরে, তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেব।’
আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ড্রাইভারের শক্ত শক্ত ভাব আমি দেখেছি। লোকটার কথা মিথ্যে নাও হতে পারে। লোকটাকে আমি অল্প অল্প চিনতাম। মাঝে মাঝে ট্রাকে দেখেছিলাম তাকে। হয়ত লোকটা তার হেলপার। ড্রাইভারদের একজন হেলপার থাকে। কিন্তু যখন আমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরুতো তখন এ লোকটা থাকত না কখনো।
আমার চোখে বিশ্বাস অবিশ্বাসের একটা দোলাচল খেয়াল করে লোকটা বলেছিল—‘তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না তো, এই দেখ আমার হাতে ছুরি, ড্রাইভারও তার ছুরি আনতে গেছে ট্রাকে।’
লোকটার ছুরি মোমবাতির আলোয় ফোঁস ফোঁস করে ওঠে। এতক্ষণ শেয়ালের ডাক, ঝিঝিপোকার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, ছুরি দেখার পর তা শুনতে পাচ্ছিলাম না। চারপাশ কেমন থম মেরে গেছিল। শুধু ছুরি দেখতে পাচ্ছিলাম, ছুরির গা থেকে পিছলে পড়া আলোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। গা হীম হয়ে গেছিল। কেঁদে উঠেছিলাম।
লোকটা বলেছিল—‘কেঁদো না, চলো তোমাকে নিয়ে চলে যায়। দেরি করা যাবে না। ড্রাইভার আসার আগেই আমাদের চলে যেতে হবে।’
আমি লোকটার কথা আর অবিশ্বাস করিনি। তার সাথে হাঁটতে থাকি। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতেই থাকি। হাঁটতেই থাকি। হাঁটতে হাঁটতে শরীর ভেঙে পড়তে চায়। আর ঘুম যখন ভাঙল তখন দেখি এখানে একটা বিছানায় শুয়ে আছি।’

এসব গল্প শাপলা একদিনে বলেনি। কয়েকদিনে বলেছে। কখনো মাধবীই প্রশ্ন করে জেনেছে।
মাধবী তাকে একদিন বলেছিল—‘আচ্ছা শাপলা, ড্রাইভার হয়তো তোমাকে খুন করত না। লোকটা তোমাকে ভুলিয়ে এনেছে।’
শাপলা বলে—‘সেটাও ভেবেছি আমি, তবে আমার মনে হয়, আমাকে নিয়ে যা পরিকল্পনা করার তারা দুজনেই করেছে। তারা হয়ত খুন করার জন্য আমাকে আনেইনি, তারা এভাবে একটা নাটক তৈরি করে বিক্রি করার জন্যই এনেছিল।’
শাপলা বলে—‘অন্যজনকে পেতে গিয়ে নিজকে হারালাম। অন্যজনকেও পেলাম না নিজেকেও পেলাম না। আহা কিভাবে বাপমা ছাড়া হলাম। কিভাবে নিজ ছাড়া হলাম।’
শাপলা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলে—‘তারা সেদিন যদি খুন করেই দিত সেটাই হতো সব থেকে ভালো, প্রতিদিন এভাবে খুন হতে হতো না।’

শাপলা এখন আর কাঁদে না। কান্না হজম হয়ে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোজ। দীর্ঘশ্বাসও একদিন হজম হয়ে শরীরের হাড় মাংস হয়ে যাবে। তখন দীর্ঘশ্বাসও আর ফেলতে হবে না।

উপন্যাসের অংশবিশেষ সমাপ্য

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সংকট থেকে উত্তরণে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান মেননের
সংকট থেকে উত্তরণে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান মেননের
কানে ঝুলছে বাংলাদেশের দুল!
কান উৎসব ২০২৪কানে ঝুলছে বাংলাদেশের দুল!
ধোনি-জাদেজার লড়াই ছাপিয়ে প্লে অফে বেঙ্গালুরু
ধোনি-জাদেজার লড়াই ছাপিয়ে প্লে অফে বেঙ্গালুরু
হীরকজয়ন্তীর পর সংগঠনে মনোযোগ দেবে আ.লীগ
হীরকজয়ন্তীর পর সংগঠনে মনোযোগ দেবে আ.লীগ
সর্বাধিক পঠিত
মামুনুল হক ডিবিতে
মামুনুল হক ডিবিতে
৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের
৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের
আমেরিকা যাচ্ছেন ৩০ ব্যাংকের এমডি
আমেরিকা যাচ্ছেন ৩০ ব্যাংকের এমডি
নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভালো সড়ক কেটে ২ বছর ধরে খাল বানিয়ে রেখেছে
নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভালো সড়ক কেটে ২ বছর ধরে খাল বানিয়ে রেখেছে
গরমে সুস্থ থাকতে কোন কোন পানীয় খাবেন? ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় কখন জরুরি?
গরমে সুস্থ থাকতে কোন কোন পানীয় খাবেন? ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় কখন জরুরি?