X
শনিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || শেষ পর্ব

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:১৩

রাস্তায় ফেলে যাওয়া ত্রাণ পূর্বপ্রকাশের পর

১৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার

রাতে অঘোরে ঘুমিয়েছিলাম। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুম ভাঙল রাজিব দা’র ফোনেই। তাড়াতাড়ি শাওয়ার নিয়ে নিচে নাস্তার জন্য নামতে নামতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। দেবদুলাল দা’কে আমরা ফোন দিলাম। দেবদুলাল দা জানালেন তিনি রুমে ঢুকে অফিসে একটি রিপোর্ট পাঠাবেন ই-মেইলে। এগারোটার আগে আসতে পারবেন না। শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। বেশি রোদ হয়ে গেলে কাজ ভালভাবে করা যাবে না। গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকাই পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা বলে আবহাওয়ার উত্তাপ ও আর্দ্রতা দু’টোই খুব বেশি।

নিচে নাস্তা করে হোটেলের সিঁড়ির কাছে আসতেই আগের রাতে দেখা হওয়া আরবা টাকা চাইল, ‘আঁরে টিঁয়া দে (আমাকে টাকা দাও)!’ আরে—আমিও দেখি এক দিন এক রাতেই খানিকটা চাটগাঁই ভাষা বুঝছি। সেটা .০০০০০০১ শতাংশ তো হবেই! যাহোক, আরবাকে মাত্র একশো টাকার একটি নোট দিলাম। আর একটু বেশি দিতে পারলে ভাল হত।

দেবদুলাল দা আমাদের হোটেলে এলেন সোয়া এগারোটা নাগাদ। সবাই মিলে আমরা একসাথে চা খেয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। রাজিব দা আর রহমান ভাই এক রুটে কক্সবাজার যাবেন আর আমি ও দেবদুলাল দা যাব উখিয়া হয়ে কক্সবাজার।

সিএনজিতে ওঠার পর নাফ নদীর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন দেবদুলাল দা’কে বলে সিএনজি থামিয়ে একটি ছবি তুললাম। রোদে ছবি ভাল এলো না। আগের বিকেলে লেদা ক্যাম্পে যাওয়ার সময় রাজিব দা এত টেনশনে ছিলেন যে নিজের একটা ছবি তোলার অনুমতি প্রার্থনা আর করা হয়নি। আজ দেবদুলাল দা’কে বলে ছবি তুললাম। তারপর আবার চলা। পথে পথে সেই একই দৃশ্য। শত শত পরিবার গাছের ছায়ায়, কোন যাত্রী ছাউনির নিচে অথবা খাঁ খাঁ রোদে পথে বসে। থ্যাংখালি, খারাংখালি, হ্লিলা বাজারের মতো জায়গাগুলো পেরিয়ে আমাদের সিএনজি ছুটতে থাকল।

‘এই জায়গাগুলোর নাম লক্ষ্য করেছেন?’ দেবদুলাল দা বললেন।

‘হ্যাঁ—একটি নামও বাংলা নাম নয়। রাখাইন বা আরাকানি নাম।’হাসলাম আমি।

দেবদুলাল দা ২ সেপ্টেম্বর থেকে এখানে আছেন। নানা অভিজ্ঞতার কথা বললেন। প্রচুর মানুষ কিন্ত শরণার্থীদের সাহায্য করছে। প্রথমদিন হোটেলে এসে পরোটা খুঁজতে গিয়ে দেখেন পরোটা নেই। কোনো ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থা ৭০০ বা ১০০০ টি পরোটা অগ্রিম কিনেছে শরণার্থীদের জন্য। দুপুরে ভাত খেতে গিয়ে দেখলেন তরকারিতে আলু নেই। শরণার্থীদের জন্য আলুও কেনা হচ্ছে। আলু সেদ্ধ ভাতের ভাল বিকল্পও বটে। ভ্যান গগের ‘পটেটো ইটার্সে’র কথা মনে পড়ল আমার। বললেন কিভাবে ‘নয়াপাড়া’বা ‘কুতুপালং’ক্যাম্পের পাশে প্রতি সকালে কোন কোন গাড়ি এসে ক্যাম্পের সুন্দরী মেয়েদের তুলে কক্সবাজার পর্যটন শহরের বড় বড় অভিজাত হোটেল-মোটেলে নিয়ে যায়। টেকনাফ আসার আগে কক্সবাজারে প্রথম দু’দিন থাকার সময় এক রিকশাঅলা তাঁকে বার বার ‘বার্মিজ’ মেয়ে পাওয়া যায় এমন হোটেলে সিট নিতে বলছিল। একপর্যায়ে রিকশাঅলাকে তাঁর ধমক দিতে হয়। এমন নানা গল্পে গল্পে পথে যেতে যেতে আমরা দেখলাম বালুখালি থেকে কুতুপালং অবধি নানা শরণার্থী ক্যাম্প। বালুখালিতে নতুন ক্যাম্প হচ্ছে। এত এত শরণার্থীকে জায়গা দিতে বাধ্য হয়েই পাহাড় আর বন কাটতে হচ্ছে, গড়ে উঠছে ঘিঞ্জি বস্তি। শত শত শিশু আর মা রোদের ভেতর পলিথিনের কুঁড়ে বা তাঁবুতে পথের পাশে বসে। সত্যি বলতে জীবদ্দশায় আমার দেশেই আমি এমন দৃশ্য দেখব তা ভাবিনি। ২০০০-২০০০৪ সালের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদক জীবনে নানা কিছু নিয়ে প্রতিবেদন রচনা করলেও আজকের এই প্রতিবেদনকে নিজের কাছেই মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধ সময়ের প্রতিবেদন রচনা করছি।

কুতুপালং ক্যাম্পের পাশে নতুন যে ক্যাম্প এখন তৈরি হচ্ছে নতুন আসা শরণার্থীদের জন্য সেখানে আমরা সিএনজি থামালাম। অসংখ্য ত্রাণ ও নগদ অর্থসাহায্য বহনকারী ট্রাক বা ভ্যান থেকে টাকা, খাবার ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে। শিশু-কিশোররা দৌড়াচ্ছে সেসব নিতে। মংডুর চাইঙ্গ্যাপাড়া থেকে আসা ইউনুস (৬৮) জানালেন ‘দেশে’তাঁর ছত্রিশ বিঘা জমি আছে। এখানে কেনো মানুষজন তাদের টাকা ছুঁড়ে মারছে? তিনি কি ভিখিরি? তালু ফাটা রোদে আমি আর দেবদুলাল দা একবার সিএনজি থেকে নামছি আবার উঠছি। এভাবেই পথে যেতে যেতে দেখলাম তিন রোহিঙ্গা কিশোর। অন্যদের থেকে এরা দেখতে খানিকটা সম্পন্ন, সুন্দর আর শিক্ষিতও মনে হল। সিএনজি থামিয়ে কথা বলতে দেখলাম অনুমান সত্য। মিয়ানমারে ওরা পড়ত নবম শ্রেণিতে। বার্মিজ ভাষায় পড়ত বলে ওদের একজন আমার দিনলিপিতে নাম লিখে দিল বার্মিজ হরফেই। চলতে চলতে দক্ষিণ কুতুপালংয়ে মনোয়ার (৩১) নামে এক নারীর সাথে কথা হল, ‘আঁর বাড়ি আকিয়াব। মগে আর মিলিটারিতে মিলা ব্যাকগুন গর জ্বালাই দিছে।’অর্থাৎ রাখাইন আর বার্মিজ সেনা মিলে দক্ষিণ আকিয়াবে তার বাড়ি-ঘর সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেখানে প্রায় ২০০০ ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে বার্মিজ মিলিটারি। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা নারীদের অনেকের নামই শুনতে খানিকটা ছেলেদের নামের মতো শোনাবে আমাদের কানে । যেমন, রাজিব দা (রাজীব নূর) নাকি কয়েকদিন আগে টেকনাফের রাস্তায় ‘বদিউজজামাল’নামে এক নারীকে পেয়েছিলেন—সেই রোসাঙ রাজসভার একটি অন্যতম প্রেমকাহিনীমূলক পুঁথি ‘সায়ফুল মুলক-বদিউজজামাল’-এর নায়িকার নামে নাম। আজকের বাঙালী মুসলিম মধ্যবিত্ত যে নারীর নামে ‘আনোয়ার/জামিল/করিম’ইত্যাদি ইত্যাদির সাথে একটি আ-কার যুক্ত করে দেয়, সেটা এ অঞ্চলের নামায়ণের রীতি অনুযায়ী ‘অমর’-এর সাথে আ-কার যুক্ত করে ‘অমরা’বা  ‘অসীম’-এর সাথে আ-কার যুক্ত করে ‘অসীমা’ লেখার মতো কোনো রেওয়াজ নয় তো? মূল আরব বা মিশরে কিন্ত নারীর নামে সব সময় এমন আ-কার বসে না। এমনি সাত-পাঁচ নানা কিছু ভাবতে ভাবতে, আরো কিছু দূর যেতে যেতে পথে দেখা হল আলী জোহারের (৫০) সাথে। মিয়ানমারে তাঁর হোটেল ছিল। মাসে এক লাখ কিয়েট (বর্মী টাকা) বা বাংলাদেশি টাকায় ত্রিশ হাজার টাকা আয় হত তাঁর। 

হিন্দু শরণার্থী শিবির হিন্দু রোহিঙ্গাপাড়া
টেকনাফে আসার আগেই মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা কিছু হিন্দু রোহিঙ্গার খবরও পড়েছিলাম পত্রিকায়। সিএনজিতে ওঠার পরেই দেবদুলাল দা-ও বলছিলেন যে তিনি হিন্দু রোহিঙ্গাপাড়া ইতোমধ্যে একবার ঘুরেছেন এবং আবার ঘুরতে চান। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের পাশেই পশ্চিম পাড়ায় মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ৪৪৬ টি হিন্দু পরিবার নাকি রয়েছে। তবে, কুতুপালং ক্যাম্পের কাছে নেমে শুরুতে দেবদুলাল দা কেনো জানি রাস্তাটি চিনতে একটু ভুল করলেন। আমরা ঢুকে গেলাম ক্যাম্পের বেশ খানিকটা ভেতরে। সহসা দেবদুলাল দা বললেন, ‘অদিতি—দ্যাখেন, আফগান ব্লু বোরখা!’
তাঁর কথায় সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি আফগান নীল বোরখা পরে চলছে এক নারী।
যাহোক, ক্যাম্প থেকে বের হয়ে পুনরায় সিএনজিতে উঠে খানিকটা সামনে যেতেই আমারই চোখে পড়ল পাহাড়ি টিলার ঢালে ‘এখানে মিয়ানমার থেকে আগত হিন্দু শরণার্থীরা রয়েছে’ জাতীয় বাক্য লেখা একটি সাইনবোর্ড। সিএনজি থেকে নেমে আমি আর দেবদুলাল একটু ভেতরে যেতেই দেখি একাধিক হিন্দু ধর্মীয় সংস্থার গাড়ি এবং কিছু মানুষ ভেতর থেকে বের হয়ে আসছেন। এঁরা হিন্দু রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সাহায্য দিতে এসেছিলেন।
‘ভেতরে যান। হিন্দু রোহিঙ্গাদের বিষয়টি তো পত্র-পত্রিকায় অতটা আসছে না। আপাতত ওদের দুপুরের খাবার হিসেবে ডিমের ঝোল আর ভাত খেতে দেয়া হয়েছে।’ বললেন একজন।

আমি আর দেবদুলাল দা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে দেখি যে পাহাড়ের ঢালে একটি মন্দির প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেয়া এই কয়েকশ হিন্দু পরিবার হয়ত জনসংখ্যায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের চেয়ে অনেক কম হবার কারণেই ক্যাম্পের মতো ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর লাগছে না এই জায়গাটা। মন্দির প্রাঙ্গণ হলেও আমিষ খাবার মানে ডিমের ঝোল আর ভাত খেতে দেয়া হয়েছে শরণার্থীদের। দুপুর রোদে সার সার সিন্থেটিক কাপড়ের কালো বোরখার বদলে হাল্কা তাঁতের ছাপা নানা শাড়ি আর শাঁখা-সিঁদুরের মেয়েদের দেখে চোখে যেন একটু আরাম লাগল। খানিকটা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম এই হিন্দু রোহিঙ্গা বা বার্মিজ হিন্দুরাও মুসলিম রোহিঙ্গাদের মতোই চট্টগ্রাম থেকে গত কয়েক শতক ধরে ওপাড়ে ঠাঁই-গাড়া হলেও হিন্দু রোহিঙ্গা নারীরা গড়ে অনেকটা ফর্সা, যদিও তারা উচ্চবর্ণ নয় (জেলে বা নাপিত (শীল) সম্প্রদায়ভুক্ত)। যা কিনা সমুদ্র পাড়ে কড়া রোদে বসতি মুসলিম রোহিঙ্গা নর-নারীরা নয়। ভাষা ও নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে তো একই সম্প্রদায়—ধর্মটা যা আলাদা! তবে এমন কেনো? অবশ্য হতে পারে যে খাদ্য তালিকায় সস্তায় বিফ বা গোমাংস বাংলাদেশের মুসলিমের প্রায় প্রতিদিনের আহার্য বলে আজকের বাংলাদেশে গড় উচ্চতা বাঙালী মুসলিমের খানিকটা বেশি হলেও হতে পারে এবং একই কারণে ধনী-দরিদ্র বা উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ নির্বিশেষে বাংলার হিন্দুর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শাক-সব্জি, ফল-মূল বা দুধ ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে বলে একই নৃ-তত্ত্ব বা একই তামাটে বর্ণের ভেতরই ত্বকের টোনে স্বচ্ছতা বা লালিত্যের কিছু উনিশ-বিশ হলেও হতে পারে। মনে পড়ল বেশ কিছু বছর আগে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী আমার এক মুসলিম বান্ধবী ‘হিন্দু মেয়েরা সব ধবধবা সাদা—কোনো কালো মেয়ে নাই’ বলায় আমি মনে মনে বিরক্ত হয়ে তাকে ‘মূর্খ’ ভেবেছিলাম। তবে, পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম রোহিঙ্গা শিবির দেখার পর কেনো জানি মনে হল যে, একই নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির মাঝেও কয়েক প্রজন্মের খাদ্যতালিকায় হাই প্রোটিন মাংস এবং সব্জি-ফল-দুধ-মিষ্টি গ্রহণের তারতম্যের কারণে গড় উচ্চতা বা ত্বকের গড় স্বচ্ছতা কি উজ্জ্বলতায় খানিকটা পার্থক্য সৃষ্টি হলেও হতে পারে? এটা অবশ্য খুবই সাধারণীকরণই হয়ে গেল হয়তো। বস্তুত বাঙলীর মতো বারভাজা শঙ্কর জাতির ভেতর ধর্মাধর্ম বা বর্ণগত তারতম্য ভেদে সবার ভেতরেই কম-বেশি লম্বা-বেঁটে, ফর্সা-কালো রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো পুষ্টিবিদ এ বিষয়ে কৌতুহলোদ্দীপক গবেষণা করতে পারেন।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কুতুপালং গ্রামের পাশে পশ্চিমপাড়ায় হিন্দু পরিবারগুলোর সবাই অবশ্য দুপুরের খাবার খেতে তখনো বসেনি। কয়েকটি বেশ সুন্দরী ও সদ্য বিধবা, তরুণী নারী কাঁদছিল। এদেরই একজন পূজা শীল (বয়স : আনুমানিক ২২-২৫)। পূজা শীলের স্বামীকে দু’সপ্তাহ আগে কিংবা সঠিকভাবে বললে ২৫ আগস্ট যখন সমস্যা শুরু হয়, তখন কালো মুখোশধারী কারা যেন হত্যা করে। আমি যেহেতু পূজার চাটগাঁই বা রোহিঙ্গা ভাষা বুঝতে পারছিলাম না এবং দেবদুলাল দা’র বাড়িও বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের পিরোজপুর জেলায় ও তিনিও কিছু বুঝছিলেন না, কাজেই চট্টগ্রাম কলেজের এক ছাত্রের করা তর্জমার উপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছিল। সে জানাল যে গত পঁচিশ আগস্ট মংডুতে এই বার্মিজ হিন্দুদের বাড়িতে কালো মুখোশ পরা এবং মাথায় আরবি হরফে লেখা ব্যানার পরা কিছু মানুষ আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারা তাদের আনুমানিক ৮৬-১১৬ জন পুরুষকে হত্যাও করে। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রটি বলল, ‘বুঝতেই পারছেন—মাথায় যখন আরবি হরফের ব্যানার দেয়া, তখন নিশ্চয়ই আইএস হবে।’ আমি শঙ্কিত হয়ে ভাবলাম আইএস অথবা আরসা? 

অসহায় মানুষ পশ্চিম পাড়ার এই হিন্দু রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেল যে রেজু আমতলা হয়ে তারা প্রায় ৪৫৩টি পরিবার বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। আরো প্রায় ২০০টি হিন্দু পরিবার বাইশফাঁড়ি, চাকঢালা ও তম্ব্রুতে ‘নো ম্যানস্ ল্যান্ড’ এলাকায় অবস্থান করছে। আগস্টেও ২৫ তারিখ বর্মী সেনাবাহিনীর উপর হামলা হবার একই সময়ে হিন্দুদের উপরও মুখোশ পরা একদল সশস্ত্র মানুষ আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা ও ছুরি সহ আক্রমণ করে। কালো মুখোশ পরা সেই লোকগুলো নাকি ফকিরা বাজার, রিক্তপাড়া ও চিকনছড়ি নামে রোহিঙ্গা হিন্দু গ্রামগুলো আক্রমণ করে ও প্রায় ‘৮৬ থেকে ১১৬’ জন হিন্দু পুরুষকে আক্রমণ করে। এদের ভেতর বকুলবালা রুদ্র নামে এক নারী ইতোমধ্যে হারিয়েছেন তাঁর স্বামী কানু রুদ্র, কণ্যা ও জামাতাকে। চিকনছড়ি গ্রামের নিরঞ্জন রুদ্রও মুখোশধারী এক বাহিনী কর্তৃক তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেবার কথা বলেন। দু/একটি হিন্দু শিশু এখনো সীমান্তের ওপাড়ে রয়ে গেছে।
‘বার্মায় আঁরা ব্যাকগুণ পুরুষ আঁছি। আঁরা বার্মিজ হিন্দু’ বললেন চিত্ত রঞ্জন পাল। কথাটার মানে যে তারা কয়েক প্রজন্ম বার্মায় ছিলেন এবং তাঁরা বার্মিজ হিন্দু। তিনি বর্মী ভাষায় লেখা তাঁর ‘আইডি কার্ড’ দেখালেন যেখানে তাঁকে ‘ভারতের হিন্দু’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুরা এ আইডি কার্ডের সাহায্যে মংডু থেকে আকিয়াব স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারত। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বা উচ্চশিক্ষায় বর্মীরা বাধা দেয় না ও বর্মীরা হিন্দুদের খুবই পছন্দ করে বলেও তিনি জানান।

তবে, বর্মীরা যদি হিন্দুদের এতই পছন্দ করে থাকে, তবে তারা এখানে চলে এলেন কেনো জিজ্ঞাসা করলাম। দোভাষীর মাধ্যমে যতটুকু বোঝা গেল তা হচ্ছে বর্মীরা চাইত হিন্দুরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর হামলা করুক। তবে, একই ভাষা ও চেহারাগত সাদৃশ্যের কারণে তারা সেটা করেনি। এতে বর্মীরাও তাদের উপর একটু রেগে যায়। আর হামলা,  গোলাগুলি, অগ্নিসংযোগ বেড়ে গেলে ভয়ে তারাও পালিয়ে আসে। চিত্তরঞ্জন পালের বক্তব্য আমি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছিলাম না যতক্ষণ না পর্যন্ত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে দেখলাম যে রাখাইন রাজ্য থেকে খোদ মঙ্গোলয়েড বৌদ্ধরা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে। মুসলিম রোহিঙ্গাদের মতোই হিন্দু রোহিঙ্গাদেরও আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এপাড়ে থাকে বলে তারা এখানেই চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রাজকুমারী নামে বছর বিশেকের একটি অবিবাহিত মেয়ের বুদ্ধিমত্তারও প্রশংসা করেন হিন্দু রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে সেই মুখোশ পরা মানুষগুলো যখন তাদের ধর্মান্তরিত হতে বলছিল, তখন রাজকুমারীই বলেছিল যে তারা (হিন্দুরা) ‘জাত-ধম্মো’ বিসর্জন দেবে তবে সেটা বাংলাদেশে আগে নিরাপদে পৌঁছনোর পর। বাংলাদেশে আসার পর স্থানীয় হিন্দুরা কুতুপালংয়ে কিছু শাঁখা-সিঁদুর পাঁ নারী দেখে (কিছু নারী ইতোমধ্যে শাঁখা-সিঁদুর খুলে ফেলেছিল ধর্মান্তরিত হবার চাপের মুখে) তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে বা মন্দির চত্বরে নিয়ে আসে। এভাবে রাজকুমারীর একার বুদ্ধিতে মিয়ানমারের মংডুর তিনটি হিন্দু রোহিঙ্গা গ্রামের বাদবাকি পুরুষ ও নারীরা প্রাণে বেঁচে যায় বলে তারা জানান।
এদিকে পালিয়ে আসার পথে ১২ জন হিন্দু নারীকে চিকনছড়ি এলাকার আব্দুল হাকিমের পুত্র ছৈয়দ হোছন কৌশলে কুতুপালংস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং তাদের ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ছৈয়দ হোছন। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করা হয় বলে জানায় পশ্চিম পাড়ার স্বপন শর্মা।

উদ্ধারকৃত নারীরা বর্তমানে তাদের নিকটত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে আছে বলে জানা যায়। ধর্মান্তর করার চেষ্টায় অভিযুক্ত ছৈয়দ হোছন আল ইয়াকিনের সক্রিয় সদস্য এবং বর্তমানে সে কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করছে বলেও জানায় সুরধন পালের পুত্র মধু রাম পাল।

মিয়ানমারে নাগরিক সুবিধা পাওয়ায় সনাতনধর্মীদের ভারতীয় হিন্দু বলে নির্যাতন করেছে আল ইয়াকিন বা আরএসও সদস্যরা এমনটি জানিয়েছে হিন্দু শরণার্থীরা।

আশ্রয় নেওয়া এসব হিন্দু শরণার্থীগুলো বর্তমানে কুতুপালংস্থ একটি অব্যবহৃত মুরগীর খামারে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছে। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে শিশুগুলো। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনও তাদের আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ট্রাক ভরে ত্রাণ আসছে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার

পশ্চিমপাড়া হিন্দু রোহিঙ্গা শিবির হয়ে আমরা সিএনজিতে চললাম কক্সবাজারের পথে। দেখতে দেখতে সমুদ্র সৈকতের পথ ধরে কলাতলী পয়েন্টে এসে আমাদের সিএনজি থামল। সারা দিনের টো টো ঘোরার পর আমার ভয়ানক ব্যাক পেইন শুরু হয়েছে। দেবদুলাল দা’র কাছে আবার কে জানি একজন এসেছে যার সাথে তিনি কিছুটা সামনের এক হোটেলে উঠবেন। আমি কলাতলী মোড়ে নেমেই প্রথম মোটেলটির পর দ্বিতীয় যেটি পেলাম (প্রথমটায় সিট ছিল না), সেই ‘ডাইনামিক’-এর রিসেপশনে ঢুকে গেলাম। দেবদুলাল দা’কে বললাম, ‘আর এক পা হাঁটতে পারব না।’তিনি হেসে, শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিলেন।
‘ডাইনামিক’-এ আমাকে বলল যে সিঙ্গল এসি রুম এক রাতের ভাড়া ১২০০ টাকা আবার তিন/চার ঘণ্টা থাকলেও ভাড়া সেই বারোশো টাকাই দিতে হবে। দিব্যি লিফট সহ আট বা দশ তলা বিল্ডিং। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ‘রূপচাঁদা’ হোটেল আবার বাসের টিকিট কাটার কাউন্টারও আছে। তীব্র ব্যাক পেইনে মনে হল রাতটা বিশ্রাম নেয়াই ভাল। ছ’তলায় লিফটে উঠে রুমে যেতে না যেতে বান্ধবী আফসানা কিশোয়ার লোচনের ফোন। অশ্রাব্য গালাগালি, ‘তোর এত সাহস? তুই কুতুপালং যাইস মানবতা করতে? এদিকে আমি ভয়ে মরি!’ এই প্রথম কারো গালিও এত মিষ্টি লাগল। তার গালিগুলোর ৯৯ ভাগই ছাপার জন্য দেয়া গেল না। নাহ্, লোচনের মতো বন্ধু সত্যি পাওয়া কঠিন।

ঘণ্টাখানেক পর রাজিব দা’র ফোন। তিনি ‘প্রিশাইন’ হোটেলে উঠেছেন যেখানে ‘ডেইলি স্টার’-এর পিনাকি রায়ও উঠেছেন। আমি কি শহর দেখতে বেড়াব? আমি তখনো ব্যাক পেইনে কঁকাচ্ছি। ঘন্টা খানেক পর নেমে রাতের খাবার খেয়ে তাঁকে যখন ফোন করলাম এবং বললাম যে আমরা সবাই মিলে (আমি, রাজিব দা ও পিনাকি) সমুদ্র সৈকত দেখতে বের হব কিনা, তিনি উত্তরে জানালেন যে ইতোমধ্যে তাঁর সি-বিচ ঘোরা শেষ। পিনাকি মন দিয়ে রিপোর্ট লিখছে।পরে কখনো আবার আমরা একসাথে না হয় সমুদ্রতটে যাব। এবার বাসের টিকিট খোঁজা! পনেরো মিনিট আগে খেতে বসার সময় দেড় হাজার টাকার টিকেট সব বিক্রি হয়ে গেছে। দু’হাজার টাকায় একটি এসি বাসের টিকেট কেটে, লিফটে উঠে রুমে ফিরলাম। তখন প্রবল ঝড় শুরু হয়েছে এই ছোট্ট সমুদ্রশহরে। পরদিন সকাল দশটায় বাস।

ভোরবেলায় বাসে উঠলাম ঠিকই কিন্ত মাথার ভেতর রয়ে গেছে টেকনাফ রোডে হাজার হাজার নিরাশ্রয় শিশু ও মায়ের মুখ। মনে পড়ে গেল অ্যালেন গিন্সবার্গের সেই চির অমর, মর্মস্পর্শী পংক্তিগুলোই।

‘Millions of souls nineteenseventyone
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan

Taxi September along Jessore Road
Oxcart skeletons drag charcoal load
past watery fields thru rain flood ruts
Dung cakes on treetrunks, plastic-roof huts

Wet processions Families walk
Stunted boys big heads don't talk
Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise’

এই কবিতার অসাধারণ অনুবাদ করেছেন খুব সম্ভবত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যা সুরের ছোঁয়ায় অনন্যতর করেছেন মৌসুমী ভৌমিক।

শত শত চোখ আকাশটা দেখে

শত শত শত মানুষের দল

যশোর রোডের দু-ধারে বসত

বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল

কাদামাটি মাখা মানুষের দল

গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে

আকাশে বসত মরা ঈশ্বর

নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে

সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর

এতো এতো শুধু মানুষের মুখ

যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন

ফসলের মাঠে ফেলে আসা সুখ

কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা

কাকে বলি করো করো করো ত্রাণ

কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও

মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ

শত শত মুখ হায় একাত্তর

যশোর রোড যে কত কথা বলে

এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে

পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে

এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে

পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে!


 

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ 

 

জেড.এস.
সম্পর্কিত
বিষয় ও শৈলির সোনালি সমন্বয়
বিষয় ও শৈলির সোনালি সমন্বয়
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
বিষয় ও শৈলির সোনালি সমন্বয়
কামাল চৌধুরীর কবিতাবিষয় ও শৈলির সোনালি সমন্বয়
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
সমকালীন অস্ট্রেলিয়ান গল্পদুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
© 2022 Bangla Tribune