‘লিবিয়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা বাংলাদেশিদেরও শাস্তি দিতে হবে’

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ০২:৩০, মে ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, মে ৩১, ২০২০




লিবিয়ার একটি ডিটেনশন সেন্টারে বিশ্রামরত অভিবাসী শ্রমিকরালিবিয়াতে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা ও ১১ জনকে আহত করার নির্মম ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করে ত্রিপোলির সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন লিবিয়ার নাগরিকদের চেয়ে এসব ঘটনার জন্য বাংলাদেশের মানব পাচারকারী ও দালালদের বেশি দোষ। কারণ তারাই প্রলোভন দেখিয়ে হতভাগ্য লোকগুলোকে বিদেশে নিয়ে যায় এ ধরনের পরিণতির জন্য। এই দালালচক্রের সঙ্গে সরকারের যেসব ব্যক্তি জড়িত, তাদেরও গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা। আর তা নিশ্চিত হলে কেবল লিবিয়াতে নয়, অন্যান্য দেশেও মানব পাচার বন্ধ হবে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ফেলো মোহাম্মাদ শহীদুল হক বলেন, ‘ওই হতভাগ্য লোকগুলোর সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের অধিকাংশ এদেশ থেকে লিবিয়ায় গেছে।’

২০১৫ সালে এ ধরনের ঘটনা বেড়ে গেলে লোক পাঠানো বন্ধ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের নেওয়া নিদের্শকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে এখানকার রিক্রুটিং এজেন্সিরা যুক্তি দেখিয়েছিল যে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের মঙ্গলের দায়িত্ব সরকারের নয়।’

বাংলাদেশ সরকার এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় এবং এরফলে কোর্ট সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু লিবিয়াতে এখনও যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, ওই রায় এখনও বলবৎ আছে বলে আমার ধারণা।’

সাবেক ওই সচিব প্রশ্ন তোলেন, ‘ওই লোকগুলো সঠিক কাগজ ছাড়া দেশের সীমানা কীভাবে পার হয়?’

একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে মানবপাচার হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরসঙ্গে অনেকে জড়িত এবং তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

বিভিন্ন মানব পাচারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় বৈশ্বিক অভিবাসন ব্যবস্থাকে একটি নতুন রূপ দেওয়ার জন্য গ্লোবাল কমপ্যাক্ট দরকার এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘে এটি বাংলাদেশ প্রস্তাব করে এবং পরবর্তীতে এটি গৃহীত হয় বলে তিনি জানান।

একই মত পোষণ করে লিবিয়াতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল হক বলেন, ‘আমার সঙ্গে এক ব্যক্তির কথা হয়েছিল, যে এয়ারপোর্ট পার হয়েছিল। যে পাসপোর্ট নিয়ে সে পার হয়, সেটি তার নয়, ওই পাসপোর্টে লাগানো ভিসাও তার না এবং পাসপোর্টের ছবিও তার না। আরেকজন লোকের সঙ্গে কথা হয়েছে যার কাছে বিএমইটিয়ের সঠিক ছাড়পত্র ছিল।’

এই দালালচক্র মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলায় বেশি সক্রিয় এবং প্রায় প্রত্যেকের অফিস ঢাকার ফকিরাপুল এলাকায় বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য যে ২৬ জন মারা গেছে তারমধ্যে ১১ জনের বাড়ি মাদারীপুর এবং সাত জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনেক দালালের নাম, ফোন নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য পাঠিয়েছি এবং তখন কিছু গ্রেফতারও হয়েছিল।’

লিবিয়াকে ইটালি পাঠানোর একটি স্টেশন হিসাবে ব্যবহার করা জানিয়ে তিনি গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে বলেন, ‘এখানকার দালালচক্র এই প্রলোভন দেখায় যে ইটালি পৌঁছে তারপরে টাকা পয়সার লেনদেন হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ত্যাগ করার পরে ওই লোকগুলো তিন থেকে চারবার বিক্রি হয়।’

তাদের লিবিয়া বা অন্য কোনও সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে জিম্মি করা হয় এবং তাদের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে ও বিদেশে গোটা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশিরা জড়িত।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি নিজে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের কাছে সব তথ্য আছে। কে তাদের পাঠিয়েছে, কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়েছে, তাদের ফোন নম্বর কি ইত্যাদি।’

এসব তথ্য নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসে তবে এই ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সর্ষের ভূত আগে তাড়াতে হবে, তারপরে বিদেশিদের শাস্তির জন্য বলতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

/টিটি/

লাইভ

টপ