X
বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

মসজিদে নারীদের নামাজের সুবিধা নিয়ে যা বললেন আলেমরা

বেলায়েত হুসাইন
২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:১৯আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:২৪

ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের দ্বিতীয়টি নামাজ। মুসলমানদের ওপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। একাকী নামাজ আদায়ের চেয়ে জামাতে নামাজ আদায় অধিক ফজিলতপূর্ণ। জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু করো’।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩)। অর্থাৎ জামাতে নামাজ আদায়কারীদের সাথে নামাজ আদায় করো।

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে নামাজের ফজিলত একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি।’ (মুসলিম-১৪৭৭) একইসঙ্গে তিনিও আজীবন জামাতে নামাজ আদায় করে দেখিয়েছেন, নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) সারা জীবন জামাতের সাথেই নামাজ আদায় করেছেন। এমনকি ইন্তেকালপূর্ব অসুস্থতার মুহূর্তেও জামাত ছাড়েননি। সাহাবায়ে কেরামের পুরো জীবনও সেভাবে অতিবাহিত হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৪)।

জামাতে নামাজ আদায়ের এই নির্দেশনা আমাদের সমাজে আশানুরূপ বাস্তবায়ন না হলেও যতটুকু হয়, তা শুধু পুরুষদের দ্বারা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ শূন্যের কোঠায়। কারণ, সাধারণত মসজিদগুলোতে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র নামাজের জায়গা বরাদ্দ নেই।

এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুমাইদ আল সাঈদি থেকে বর্ণিত, একবার উম্মে হুমাইদ নামের এক নারী সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করো। কিন্তু তোমার জন্য বড় কামরার চেয়ে ঘরের অন্দরমহলে নামাজ পড়া উত্তম। আবার বড় কামরায় নামাজ পড়া উত্তম বারান্দায় নামাজ পড়ার চেয়ে। বারান্দায় নামাজ আদায় করা উত্তম তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে। মহল্লার মসজিদ উত্তম আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) থেকে।’ এ কথা শোনার পর উম্মে হুমাইদ (রা.) তার ঘরের নির্জন স্থানে একটি নামাজের জায়গা বানাতে নির্দেশ দিলেন। সেখানেই আজীবন নামাজ আদায় করতে লাগলেন। এ অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭০৯০)

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নারীরা যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা যদি রাসুল (সা.) জানতেন, তবে বনি ইসরাইলের নারীদের যেমন নিষেধ করা হয়েছিল, তেমনি তাদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করে দিতেন।’ (সহি বুখারি, হাদিস : ৮৬৯)।

সুতরাং যারা মনে করেন- নারীদের প্রতি বৈষম্য থেকে তাদের জন্য মসজিদে নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হয় না। তাদের এ চিন্তা সঠিক নয়। বরং ইসলামই বলছে- নারীর নামাজের জন্য উত্তম জায়গা হলো ঘর; মসজিদ নয়। বিষয়টি জায়েজ হলেও রাসুল (সা.) থেকে শুরু করে, পরবর্তী সময়ে সাহবায়ে কেরামও তাদের মসজিদে এসে নামাজ আদায়ে নিরুৎসাহিত করেছেন।

তবে বর্তমান সময়ের বাস্তব চিত্র হচ্ছে— নারীদের বাইরে চলাফেরা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজকর্মের উদ্দেশ্য ছাড়াও অনেক নারী গ্রাম ছেড়ে শহরে স্বামী-সন্তানসহ বসবাস করছেন। তারা যখন গ্রামের বাড়িতে যান কিংবা ফেরেন, তখন যাত্রাপথে স্বামী-সন্তানেরা নামাজ আদায় করলেও তারা সে সুযোগ পাচ্ছেন না। যদিও কিছু মসজিদে নারীদের স্বতন্ত্র নামাজের জায়গা বরাদ্দ আছে, তবে সংখ্যায় তা খুবই অল্প।

এই বাস্তবতা সামনে রেখে বর্তমানের সচেতন আলেমরা মসজিদে নারীদের আলাদা জায়গা বরাদ্দ রাখার বিষয়ে মত দিয়ে থাকেন। রাজধানীর উত্তরার জামিয়া আরাবিয়া বাইতুস সালামের (বাইতুস সালাম মাদ্রাসা) মুহতামিম মুফতি মানসুর আহমাদ বলেন, ‘নারীরা স্বাভাবিক অবস্থায় শুধু নামাজের উদ্দেশে ঘর ছেড়ে মসজিদে যাবেন না। হাদিসে স্বাভাবিক অবস্থায় ঘরকে নারীর সর্বোত্তম মসজিদ বলা হয়েছে। কিন্তু সফর বা বিশেষ প্রয়োজনে তারা বাইরে বের হলে তাদের নামাজ যেন কাজা না হয়ে যায় সে উদ্দেশ্যে হাসপাতাল, স্টেশন ও বড় রাস্তার পাশের মসজিদগুলোতে সীমিত পরিসরে হলেও নামাজ, ওজু ও টয়লেটের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী বলেন, ‘ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদেরকে জামাতে শরীক হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, তা মূলত শর্তসাপেক্ষে ছিল। সেখানে বর্তমান যুগের মতো নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও ফিতনা-ফাসাদের ভয় ছিল না। তাছাড়া তারা নতুন মুসলমান, সেহেতু দ্বীন শিক্ষার জন্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা জেনে তা নিজে আমল করা ও অপরের কাছে প্রচার করার তাকিদও ছিল। তবে তখনও নারীদের মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে নিজ ঘরে নামাজ পড়া অধিক উত্তম বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নারীদেরকে মসজিদগুলোতে নিষেধ করো না, তবে তাদের জন্য নিজ ঘরে নামাজ পড়াই অধিক উত্তম।’ (আবু দাউদ, ১/৮৪) অধিকন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদের আশঙ্কা থাকার দরুন নারীদের জন্য মসজিদে না যাওয়ার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে নারীদের মসজিদের জামাতে উপস্থিত হওয়ার কোনও যুক্তি থাকতে পারে না। বিশেষ করে তারা তো মসজিদে যাবেন অধিক ফজিলত লাভের জন্য। অথচ তাদের ক্ষেত্রে ঘরে নামাজ পড়া মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ বলে হাদিসে বলা হয়েছে। সুতরাং নারীদের অধিক ফজিলতের জন্য মসজিদে না গিয়ে ঘরের অন্দরে নামাজ পড়াই কর্তব্য, এতেই তাদের জন্য অধিক সওয়াব।’

‘কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের কারণে বিভিন্ন মহাসড়কে, দূরপাল্লার যাত্রীদের যাত্রাবিরতিস্থলে, বড় বড় বাস ও ট্রেন স্টেশনে এবং শহরের বড় শপিং মলে মসজিদ বা নামাজের নির্ধারিত জায়গার পাশে নারীদের জন্য নামাজের পৃথক জায়গা রাখার পক্ষে ফুকাহায়ে কেরাম মত দিয়ে থাকেন। তবে এ পর্যায়ে নারীদের নিরাপত্তা ও শরয়ি পর্দা বজায় রাখার দিকটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। অজু ও ইস্তিঞ্জার জায়গাও পুরুষদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখতে হবে।’ যোগ করেন মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী।

এ বিষয়ে রাজধানীর দারুল উলুম ঢাকার মুহতামিম মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘নারীদের জুমার নামাজে শরিক হওয়া ওয়াজিব নয়। মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে শরিক হওয়াও তাদের দায়িত্ব নয়। মানে সুন্নাত কিংবা ওয়াজিব নয়। মসজিদের চেয়ে নিজবাড়িতে তাদের নামাজ আদায়ে বেশি সওয়াব। এ বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে মার্কেট, কলেজ-ইউনিভার্সিটি, হাসপাতাল, অফিস-আদালত, দর্শনীয় স্থান এবং এমন সব জায়গা, যেখানে নানা কারণে নারীরা আসেন, সেখানে অবশ্যই তাদের নামাজ পড়ার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে নামাজের ওয়াক্ত আসলে তারা নামাজ কোথায় পড়বেন? এজন্য এসব জায়গায় নারীদের নামাজের জন্য আলাদা জায়গা রাখা একান্ত আবশ্যক।’

এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকররমের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে নারীদের নামাজের সুন্দর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং সৌদি আরবের যে মসজিদগুলো বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে অবস্থিত, সেসব মসজিদে খুব সুন্দরভাবে নারীদের জন্য পৃথক ও পর্দার সঙ্গে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে। তাই আমাদের মতামত হলো- যেখানে যেকোনও প্রয়োজনে নারীরা আসেন, সেসব জায়গার মসজিদে অবশ্যই অবশ্যই তাদের নামাজের সুন্দর ব্যবস্থা রাখতে হবে। এটা একান্ত কর্তব্য।’

উপরোল্লিখিত স্থানগুলোতে নামাজের জায়গা যে কতটা প্রয়োজনীয়, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন রাজধানীর মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ ঢাকার সিনিয়র শিক্ষক তরুণ আলেম মুফতি যোবায়ের খান। তিনি জানালেন, কিছু দিন আগে সস্ত্রীক নিউমার্কেটে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে নামাজের সময় হলো। সেখানে দুই তলায় পুরুষদের নামাজের জায়গা আছে। কিন্তু তার সঙ্গে তো স্ত্রীও আছেন। দুজনেরই নামাজ পড়তে হবে। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারলেন- নিচে নারীদের জন্যও নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। পরে তিনি দুই তলায় ও তার স্ত্রী নিচে তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নামাজ আদায় করলেন।

মুফতি যোবায়ের খান বলেন, ‘বিষয়টি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। ওই দিন যদি আমরা দুজনেই নামাজ পড়তে না পারতাম, তাহলে নিজের কাছে নিজেকেই ‘ছোট’ অনুভব করতাম। নারীদের নামাজের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা রাখার জন্য নিউমার্কেট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ধন্যবাদ।’

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী; শিক্ষক, মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ঢাকা।

/এসটিএস/এমএস/
সম্পর্কিত
আসকের আলোচনা সভায় বক্তারাযৌন হয়রানি প্রতিরোধে পূর্ণাঙ্গ আইনের দাবি
নারী সমাজকে জাগ্রত করতে হবে: নানক
‘দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতে নারীর অংশগ্রহণ খুবই জরুরি’
সর্বশেষ খবর
জনগণের সংগ্রাম থামানো যাবে না: গণতন্ত্র মঞ্চ
জনগণের সংগ্রাম থামানো যাবে না: গণতন্ত্র মঞ্চ
মোহামেডানকে হারিয়ে ফাইনালে মেরিনার্সকে পেলো আবাহনী
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ‘হাতাহাতি’মোহামেডানকে হারিয়ে ফাইনালে মেরিনার্সকে পেলো আবাহনী
আর্জেন্টিনায় ম্যারাডোনার পরই মেসির অবস্থান: জামাল ভূঁইয়া
আর্জেন্টিনায় ম্যারাডোনার পরই মেসির অবস্থান: জামাল ভূঁইয়া
কৌতূহল থেকে খতনা, প্রাণ গেলো শিশুর
কৌতূহল থেকে খতনা, প্রাণ গেলো শিশুর
সর্বাধিক পঠিত
ডাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে? জেনে নিন ৫ টিপস
ডাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে? জেনে নিন ৫ টিপস
বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাবে জানালো বিসিবি
বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাবে জানালো বিসিবি
গাজায় যুদ্ধবিরতি: কী বলছে হামাস, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র
গাজায় যুদ্ধবিরতি: কী বলছে হামাস, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র
বিদ্যুতের বর্ধিত দাম কার্যকর হবে ফেব্রুয়ারি থেকেই
বিদ্যুতের বর্ধিত দাম কার্যকর হবে ফেব্রুয়ারি থেকেই
কেন চালু হচ্ছে না ফাইভ-জি?
কেন চালু হচ্ছে না ফাইভ-জি?