X
বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
৩ বৈশাখ ১৪৩১

মধ্য রাতে ইলিশ শিকারে নদীতে নামছেন জেলেরা

শফিকুল ইসলাম
০২ নভেম্বর ২০২৩, ২১:০০আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ২১:০০

বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। জেলেরা প্রস্তুত, নিষেধাজ্ঞার সময় শেষে রাতেই জাল ও ট্রলার নিয়ে ইলিশ শিকার করতে নদী ও সাগরে নামছেন তারা।

সাগরে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে মা ইলিশ রক্ষায় উপকূলের সাগর ও নদীতে ইলিশ ধরার ওপর গত ১২ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে শেষ হচ্ছে সেই সময়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে জেলেরা নৌকা ও জাল মেরামতসহ আনুষঙ্গিক কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছেন। এখন শুধুই প্রহর গুনছেন সাগরে কিংবা নদীতে নামার। তাদের আশা, এখন থেকে আবারও ঝাঁকে-ঝাঁকে ইলিশ ধরে ফিরবেন আড়তে। এ বছর এই নিষেধাজ্ঞা ছিল উপকূলীয় ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায়। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। 

জাল মেরামত শেষে ইলিশ ধরতে যাওয়ার অপেক্ষায় জেলেরা (ফাইল ফটো) সূত্র জানায়, মা ইলিশকে স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই এ সময়ে ইলিশসম্পদ সংরক্ষণে ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’ এর অধীন প্রণীত ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস, ১৯৮৫’ অনুযায়ী, সারা দেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ,কেনাবেচা ও বিনিময় নিষিদ্ধের  আদেশ জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত ছিল। এ সময়  ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকা ও সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলেদের সরকার খাদ্য সহায়তা হিসেবে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে। এবার ভিজিএফের পরিমাণ ২০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ২৫ কেজি করা হয়। এর আওতায় ৫ লাখ ৫৫ হাজার জেলে পরিবারকে ১৩ হাজার ৮৭২ মেট্রিক টন খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, আইন অনুযায়ী মোট ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিপণন নিষিদ্ধ ছিল। এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হলে আইনে কমপক্ষে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।

উল্লেখ্য, দেশের অভ্যন্তরীণ সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকা এবং নদ-নদীতে মা-ইলিশ রক্ষায় সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করেছে নৌবাহিনীও। গত দুই বছরের মতো চলতি বছরেও অভিযানের অংশ হিসেবে নৌবাহিনীর জাহাজ  সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া অঞ্চলে বিশেষ টহল দিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

নৌকায় জাল তুলছেন জেলেরা (ফাইল ফটো) সূত্রমতে, গত ১২ বছরে দেশে ইলিশ আহরণ বেড়েছে দ্বিগুণ। ২০০৮-০৯ সালে ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে আহরিত হয়েছে ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ। এ বছর এই পরিমাণ ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জেলেরা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞাকালে জেলেরা মাথাপিছু যে চাল বরাদ্দ পেয়েছেন তা চাহিদার চেয়ে খুবই নগণ্য। তাদের দাবি, চালের পরিমাণ যেন বাড়ানো হয় এবং প্রকৃত জেলেরা যেন চাল পান। বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা। দীর্ঘ দিন অবসর সময় কাটিয়ে জেলেরা নিজ নিজ এলাকা থেকে মৎস্য আড়তগুলোতে জড়ো হচ্ছেন। তারা কেউ কেউ ট্রলারে জাল তুলছেন। কেউ রসদ কেনাকাটা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে মোট ১৫ থেকে ১৭ দিন ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রধান মৌসুম মনে করা হলেও এখন সময় আরও বাড়িয়েছে সরকার। গবেষকদের মতে,  ইলিশ শুধু আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমায় নয়, অমাবশ্যায়ও ডিম ছাড়ে। সেজন্য ২ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়েছে। এ সময় সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ ছুটে আসে নদীতে। ফলে মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতি বছর তিন সপ্তাহ ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার।

কিন্তু সরকারের এতসব উদ্যোগের পরেও কিছু সংখ্যক দুর্বৃত্ত রাতের অন্ধকারে মেঘনাসহ বিভিন্ন এলাকার নদীতে ইলিশ শিকার করে। অভিযোগ অোছে,  দিনের বেলা নদীতে  ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হলেও রাতে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসন কোনও ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নদীতে যান না। এই সুযোগেই শত শত জেলে রাতের অন্ধকারে ইলিশ শিকারে নৌকা বা ট্রলার নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন। তারা অবাধে মা ইলিশ ধরেন। রাতের বেলা ঢাকা থেকে নৌপথে বরিশাল ও ভোলা আসা-যাওয়ার পথে সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায়।

রাতেই ইলিশ ধরা শুরু করবেন জেলেরা (ফাইল ফটো) নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে, আবার কোথাও কোথাও তাদের ম্যানেজ করে নদীতে ইলিশ ধরার উৎসব চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে রাতের বেলায় নদীতে অভিযান চালানো অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মুন্সীগঞ্জের পর ধলেশ্বরী থেকে শুরু করে পুরো মেঘনা নদী হয়ে মুলাদি এবং শিকারপুরের সন্ধ্যা নদীর মোহনা পর্যন্ত, অপরদিকে ভোলার তেতুলিয়া নদীতে রাতে বেলা শত শত ট্রলারে চলে ইলিশ আহরণ। এসব নৌপথে রাতের বেলায় চলাচলকারী একাধিক নৌযানের চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, মহিপুর মৎস্যবন্দর এখন হুমকির মুখে। বাংলাদেশের জেলেরা সরকারের সব নিয়মকানুন মেনে সাগরে মাছ শিকার করছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার যখন সমুদ্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টি সুরাহা হওয়া দরকার বলেও মনে করেন মহিপুরের জেলেরা।

জানতে চাইলে ভোলার জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, মা ইলিশ রক্ষায় যা যা করণীয় ভোলা জেলা প্রশাসন তা করেছে।’ 

অপরদিকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী শুরু থেকেই নদীতে দিনে এবং রাতে নৌ-পুলিশের পাশাপাশি আনসার, কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল চলেছে।

আবারও বাজারে দেখা মিলবে সুস্বাদু ইলিশের (ফাইল ফটো) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম বলেন, ‘ইলিশের নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে গত ১২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২২ দিন পর  বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) মধ্যরাত পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে জেলেরা আবারও সাগরে- নদীতে ইলিশ শিকারে নামবেন।’

তিনি জানান, নিষিদ্ধ সময়ে যারা নদীতে মাছ ধরতে নেমেছে, তারা সবাই মৎস্যজীবী নয়। তাদের নেপথ্যে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অনেক ধনী ব্যক্তি ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি থাকে। ইলিশসম্পদ রক্ষায় অতীতের মতো এবারও ইলিশ ধ্বংসকারী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। নিরাপদ প্রজননের মাধ্যমে ইলিশ ম্পদ উন্নয়নে যা যা করা দরকার, সরকারের পক্ষ থেকে তা করতে হবে বলেও জানান তিনি। 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সুন্দরবনের দুবলার চরকমেছে শুঁটকি উৎপাদন, কষ্টের কথা জানালেন জেলেরা
ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ, জেলেপল্লীতে ঈদের আমেজ
সেন্টমার্টিনে স্পিডবোট-ডুবি, ১৯ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার
সর্বশেষ খবর
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
সর্বাধিক পঠিত
ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন: সবাই সব জেনেও ‘চুপ’
ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন: সবাই সব জেনেও ‘চুপ’
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ১৩ জনের
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ১৩ জনের
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটে পর্যটকদের ভিড়
প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটে পর্যটকদের ভিড়