X
শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪
২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসন কম কেন?

সাদ্দিফ অভি
১৮ জুন ২০২৪, ২৩:৫৯আপডেট : ১৮ জুন ২০২৪, ২৩:৫৯

করোনা মহামারির পর থেকে কমেছে বিদেশে বাংলাদেশি নারীদের অভিবাসন। মহামারির আগে দেশের মোট অভিবাসনের ১০ শতাংশ নারী কর্মী ছিল, তবে মহামারির পর তা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে নারী কর্মী অভিবাসনের হার হঠাৎ বেড়ে গেলেও পরের বছর ২০২৩ সালে আবার কমে গেছে। গত বছর কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া নারী কর্মীর হার কমেছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, নারী কর্মীর সুরক্ষা নিশ্চিত না করা, দক্ষতা না থাকা, বিদেশে নির্যাতনের শিকারসহ নানা কারণে তাদের অভিবাসনের হার কমেছে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০২৩ সালের ‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি প্রকৃতি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া নারী কর্মীর হার কমেছে ২৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৭৬ হাজার ৫১৯ জন নারী কর্মী বিদেশ গেছেন, যেখানে ২০২২ সালে বিদেশ যাওয়া নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬। গত বছরে মোট আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ হলেন নারী কর্মী, যা ২০২২ সালে ছিল ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রেও নারী অভিবাসন ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নারী অভিবাসন ১ লাখের বেশি ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে নারী অভিবাসনের ধারা কমে গিয়েছিল।

প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী কর্মী কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। ২০২১ সালের তুলনায় নারী অভিবাসনের হার ওই বছর ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ে।

ফিরে আসা নারী কর্মীর সংখ্যা জানে না কেউ

শুধু সৌদি আরবে ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নারী কর্মী গেছেন ৫ লাখ ২৪ হাজার। তবে সেখান থেকে নানা কারণে ফেরত এসেছেনও বেশি। বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের কোনও হিসাব নেই সরকারি সংস্থার কাছে।

তবে যারা পাসপোর্ট হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে আউটপাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে ফিরে আসেন, তাদের হিসাব রাখে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিভিন্ন দেশ থেকে খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছেন ৮৬ হাজার ৬২১ জন কর্মী। এর মধ্যে নারী কর্মী আছেন ২ হাজার ৯০২ জন।

বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়া, ঠিকমতো বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ না খাওয়া, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা ফেরত আসেন।    

নারী কর্মীর বেশিরভাগই গৃহকর্মী হিসেবে যান সৌদি আরবে

বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে যেসব নারী কর্মীর লাশ আসে তার মধ্যে ৭৯ শতাংশই গৃহকর্মীর। বাকিরা পোশাক কারখানা বা অন্যত্র কাজ করেন। রামরু গত বছরের ৩১ জানুয়ারি 'ডেথ অব ফিমেল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স ইন ডেস্টিনেশন কান্ট্রিজ' শিরোনামের এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।

দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীরা গন্তব্য দেশের কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ করেন। কেউ কেউ নির্যাতন-নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কেউ কেউ ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে। কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হন বলে জানান তারা।

১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো শুরু হয়। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। নারী কর্মীদের বেশিরভাগই যায় সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে। কর্মী বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতা, বাড়ির জন্য কাতর হওয়া, কম বেতন কিংবা বিনা বেতনে কাজ করা, খাদ্যাভ্যাস ও ভাষার সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ বাড়তে থাকে ব্যাপক হারে।

বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে নারী কর্মীরা যান তার মধ্যে আছে– সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, লেবানন, জর্ডান ও যুক্তরাজ্য।

এছাড়া মরিশাস ও সিঙ্গাপুরে নারী কর্মী অধিক হারে গেলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। ওমানে ভিসা বন্ধ করে দেওয়ায় কর্মী যাওয়া আপাতত বন্ধ আছে। জর্ডানে ২০২২ সালে ১১ হাজার নারী কর্মী গেলেও ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ৭ হাজারে। 

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একজন নারী কর্মীর বিদেশে শোভন কাজ, বেতন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত আমরা করতে পারিনি। বিদেশে যেতে নারী কর্মীর প্রশিক্ষণ এবং যাওয়ার পর কেমন আছেন কর্মী তা যথাযথভাবে মনিটর করার বিষয় আমরা দেখতে পারিনি। নারী কর্মী বিদেশে যাওয়ার অনীহার অনেক কারণের মধ্যে একটি বড় কারণ হলো, আমরা তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারিনি, তার সঙ্গে বেতন বৈষম্য তো আছেই।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নারী কর্মীরা যেসব অসুবিধা ভোগ করছেন তার মধ্যে আছে নিয়োগকর্তার কাছে বন্দি অবস্থায় থাকা, এক বাসার কথা বলে একাধিক বাসায় কাজ করা, কাজের অনির্দিষ্ট সময়—এসব কারণে অনেকের মধ্যে যাওয়ায় অনীহা তৈরি হয়েছে। আমরা সবসময় বলি নারী কর্মীর সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা, সেটা না হলে কর্মী কেন যাবে। এ কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দিয়ে অভিবাসন খাতকে যাচাই করা ঠিক হবে না। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে আমাদের পুরুষ কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সর্বোপরি রেমিট্যান্স কমেছে। আমাদের নারী কর্মীর অভিবাসন বেড়েছিল মূলত ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর। এখন যেটা হচ্ছে, কয়েক বছর ধরে সৌদিগামী নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ এমনভাবে করা হয়েছে যেন, সেই কর্মী বাধ্যতামূলক সেটি নেন। না হলে সার্টিফিকেট পাবেন না। আগে অনেকেই প্রশিক্ষণ পুরোপুরি না নিয়ে বিদেশ চলে যেতেন। এখন সেই সুযোগ কিছুটা কমেছে। এ কারণে নারী কর্মী যাওয়া কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে কিন্তু শোষণের হারও কমেছে।     

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আমাদের নারী কর্মীরা বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যে যান, সেখানে তাদের সুরক্ষা মেকানিজম, কাজের মান ও পরিবেশ কতটা উন্নত হয়েছে সেটি আমাদের নজরদারি করা উচিত। আমাদের যদি প্রশিক্ষণ ভালো হয় তাহলে ধারাবাহিকভাবে আগামী কয়েক বছরে নারী কর্মীর হার অনেক বাড়বে। সৌদি আরবে নানারকম শোষণের ঘটনার একটা সামাজিক প্রভাব তো দেশে পড়ে। আবার যখন স্বাভাবিক হবে তখন সেটারও একটা ইতিবাচক প্রভাব আগামী কয়েক বছরে এখানে পড়বে। তবে আমাদের মনোযোগী হতে হবে দক্ষ কর্মী তৈরির দিকে। নারী কর্মীদের একটা বড় সম্ভাবনা আছে কেয়ার গিভার হিসেবে, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নারী কর্মী তৈরির মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় আরও বেশি উদ্যোগী হবে।

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
লক্ষ্মীপুরে গৃহবধূর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার
অবৈধ অভিবাসীদের জরিমানা মওকুফের কথা ভাবছে ওমান
‘বিদেশে শ্রমবাজারের টেকসই উন্নয়নে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা বাড়াতে হবে’
সর্বশেষ খবর
অ্যান্টিভেনমেও সাপে কাটা রোগীকে বাঁচানো যাচ্ছে না কেন
অ্যান্টিভেনমেও সাপে কাটা রোগীকে বাঁচানো যাচ্ছে না কেন
কমতে শুরু করেছে যমুনার পানি, এখনও পানিবন্দি এক লাখ মানুষ
কমতে শুরু করেছে যমুনার পানি, এখনও পানিবন্দি এক লাখ মানুষ
মস্কোর কাছে রুশ জেট বিধ্বস্ত, তিন ক্রু নিহত
মস্কোর কাছে রুশ জেট বিধ্বস্ত, তিন ক্রু নিহত
উজানে কমছে, ভাটিতে এখনও হাজারো পরিবার পানিবন্দি
উজানে কমছে, ভাটিতে এখনও হাজারো পরিবার পানিবন্দি
সর্বাধিক পঠিত
ভিটামিন বি-১২ কমে গেলে যেসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে
ভিটামিন বি-১২ কমে গেলে যেসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে
দুই টাইলসের মাঝে দাগ পড়লে কী করবেন
দুই টাইলসের মাঝে দাগ পড়লে কী করবেন
রাশিয়াকে সহযোগিতা নিয়ে ন্যাটোর অভিযোগে চীনের পাল্টা আক্রমণ
রাশিয়াকে সহযোগিতা নিয়ে ন্যাটোর অভিযোগে চীনের পাল্টা আক্রমণ
পুলিশ কর্মকর্তা কামরুলের স্ত্রীর নামে আছে পাঁচ জাহাজ
পুলিশ কর্মকর্তা কামরুলের স্ত্রীর নামে আছে পাঁচ জাহাজ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে ইতিবাচক মিয়ানমার
বিমসটেক রিট্রিটরোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে ইতিবাচক মিয়ানমার