অবহেলায় মেয়ের মৃত্যুর অভিযোগ বাবার, ভর্তির তথ্য জানতেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০২, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

বিএসএমএমইউ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএইউ) হাসপাতালে যার অধীনে মেয়েকে ভর্তি করানো হয়েছিল, সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ভর্তির পর থেকে একবারও রোগীকে দেখতে আসেননি, দুদিন পর মেয়ের মৃত্যু হয়। এমনটাই অভিযোগ চিকিৎসাধীন তাসমিয়া হক হিয়ার বাবা মো. মোজাম্মেল হকের। তবে সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দাবি, রোগী যে তার অধীনে ভর্তি হয়েছেন এ বিষয়ে তার কাছে কোনও তথ্যও ছিল না, রোগী ভর্তির পর তাকে বিয়টি অফিসিয়ালি জানানো হয়নি তাকে।

ঘটনার বিবরণ জানিয়ে মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পায়ে পানি আসায় এবং রক্তচাপ নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর একমাত্র মেয়ে তাসমিয়া হক হিয়াকে ভর্তি করানো হয় বিএসএমএমইউ-তে। উপ-উপাচার্য ও নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলমের পরামর্শে তার অধীনেই ভর্তি করানো হয়। কিন্তু ভর্তির পর থেকে মেয়েটা মারা যাওয়া পর্যন্ত একবারের জন্যও রফিকুল আলম হিয়াকে দেখতে আসেননি, এমনকি নেফ্রোলজি বিভাগের অন্যান্য চিকিৎসকরাও চিকিৎসাতে অবহেলা করেছেন। ভর্তি হওয়ার দুদিন পরই সাত সেপ্টেম্বর হিয়া মারা যান।’

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিএসএমএমইউতে অভিযোগ করেছেন মোজাম্মেল হক। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। বিএসএমএমইউ-ও এ বিষয়ে তদন্ত করছে।

জানা গেছে, হিয়ার মৃত্যুর ঘটনা তিনমাস আগের।

এতোদিন পর এসব অভিযোগের কারণ জানতে চাইলে হিয়ার বাবা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়ে, এত তীব্র মানসিক যন্ত্রণা মেয়েকে হারিয়ে, কোথাও কাউকে বলবো, সেই অবস্থাও ছিল না, এজন্য অভিযোগ দিতেও দেরি করেছি।’

ঘটনা কী হয়েছিল জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পাঁচ সেপ্টেম্বর মেয়েকে ভর্তি করানো হয় হিয়াকে, সাত সেপ্টেম্বর মারা যায়। কিন্তু এই তিনদিনে একবারের জন্যও যার অধীনে, যার পরামর্শে, ওই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়, তিনি দেখতে আসেননি।’

মোজাম্মেল হকের অভিযোগ, পাঁচ সেপ্টেম্বর মেয়েকে ভর্তি করানোর পর পরের দিন রাতের ডিউটিতে থাকা ডা. রাফিকে রাত ১টার পরে ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি, তিনি সেসময় নেফ্রোলজি বিভাগে চিকিৎসকদের বিশ্রাম কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন, পরে নক করার পরও তিনি বের হননি। কর্তব্যরত চিকিৎসক হিয়াকে কেবিন থেকে আইসিইউ অথবা সিসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পাইনি। পরদিন মেয়েকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়, সেখানে হিয়া দুপুরে খাবার খেয়েছে, বেডে বসে কথা বলেছে।

তিনি আরও জানান, তবে বিকালে হিয়াকে বেশ কিছু ওষুধ দেওয়া হয় এবং তার মধ্যে একটি ছিল কেটি ইনজেকশন।

যদিও তার হিস্ট্রিতে কেটি ইনজেকশনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই মেয়ের অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে এবং তাকে এইচডিইউ (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট)-এ স্থানান্তর করা হয়। মেয়েটার অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়, পরে সন্ধ্যা সাতটার কিছু সময় পরে মারা যায়।’

মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা আমাকে কেটি ইনজেকশন কিনে আনতে বলেন, আগের রাতে একটা দেওয়া ইনজেকশন দেওয়া হয়, তার উল্লেখ তারা ট্রিটমেন্ট শিটে করেছেন, কিন্তু পরের দিন সন্ধ্যায় আবারও ইনজেকশন দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।’

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক চিকিৎসক এ ধরণের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ঘটনা বলে জানিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনকে।

তারা বলেন, ‘কেটি ইনজেকশন দেওয়ার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। কিন্তু সেই ইনজেকশন গাইডলাইন অনুযায়ী দেওয়া হয়নি বলেই আমরা জানতে পেরেছি। কেটি ইনজেকশন খুব ধীরে ধীরে লো-ডোজে দেওয়ার কথা স্যালাইনের মাধ্যমে। আমাদের ধারণা ইনজেকশনটা দ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এ কারণেই তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এই ইনজেকশন দেওয়ার কথা ট্রিটমেন্ট শিটেও উল্লেখ করা হয়নি।’

প্রতিটি ওষুধের কথা ট্রিটমেন্টে শিটে লেখা থাকার কথা উল্লেখ করে বিএসএমএমইউ-এর একাধিক চিকিৎসক বলছেন, ‘এটা সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ না, এরকম একটি স্পর্শকাতর ওষুধ যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, সেটি ট্রিটমেন্ট শিটে না থাকাটা স্পষ্ট অবহেলা।’

এদিকে মোজাম্মেল হকের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোগীকে আমার পরামর্শে ভর্তি করানো হয়, একদিনও দেখতে যাইনি, সবটুকু সত্যি। তবে এর পেছনে যে সত্যি প্রকাশ হয়নি, সেটা হচ্ছে- আমি জানতাম না যে তার মেয়ে আসলে ভর্তি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চার সেপ্টেম্বর ( ‍বুধবার) তিনি আবার আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা করতে। সেদিন তিনি আমাকে বলেন, চেষ্টা করছি, কেবিন পেলে ভর্তি করাবো।’

পরদিন বৃহস্পতিবার মেয়েকে তিনি ভর্তি করিয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘এগুলো সবই আমি মোজাম্মেল হক অভিযোগ দায়েরের পর জেনেছি। ভর্তি হওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক চিকিৎসা দেন। তাদের তিনি (মোজাম্মেল হক) বলেছেন- তারা আমার পরামর্শে গিয়েছেন, আমাকে জানানোর জন্য। চিকিৎসকরাও তাকে বলেছেন, তারা আমাকে জানিয়েছেন, কিন্তু আসলে আমি এসবের কিছুই জানতাম না, তারা আমাকে জানাননি।’

এসব চিকিৎসকদের পরিচয় জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সবার নাম এ মুহূর্তে আমার মনে নেই। তবে তদন্ত কমিটি তাদের ডেকেছে, তাদের বক্তব্যও শুনেছে। আমাকে না জানানোর বিষয়টি তারা  তারা তদন্ত কমিটিকে বলেছেন। আর এর কারণ হিসেবে তারা বলেছেন- রোগী স্থিতিশীল ছিল।’

তিনি আরও জানান, পরের দিন ছিল শুক্রবার। সেদিন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও চিকিৎসকের অধীনে নয়, ইউনিটের অধীনে ভর্তি করা হয় রোগীরা। আর অধ্যাপকদেরও নির্দিষ্ট দিন ভাগ করা থাকে রাউন্ড দেওয়ার জন্য। শনিবারে নেফ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আছিয়া খাতুন রোগীকে দেখেছেন। রোগীর প্রেসার খুবই কম বলে তাকে সিসিইউতে স্থানান্তরের জন্য বলেন। সেখানে যাওয়ার পর রোগীর অবস্থা খারাপ হয় এবং মারা যান।

অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলামের দাবি, ‘আমি কিন্তু বিষয়টি শুরু থেকেই কিছু জানতাম না, রবিবার রোস্টার অনুযায়ী যদি রাউন্ড দিতাম, তাহলেই আমি জানতে পারতাম। কতর্ব্যরত চিকিৎসক তাকে (মেয়ের বাবা মোজাম্মেল হককে) জানিয়েছিলেন, কিন্তু আমি যদি না জানি তাহলে আমি কী করতে পারি।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাকপ ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি কাজ করছে, আমরা সবার বক্তব্য নিয়েছি। শুধু ছেলে অসুস্থ থাকার কারণে মোজাম্মেল হক আসতে পারেননি, তিনি সময় চেয়েছেন। তদন্ত  কমিটির কাজ শেষ হলেই এর রিপোর্ট আমরা জানাতে পারবো।’

 

 

/জেএ/এএইচ/

লাইভ

টপ