কারিগরি বোর্ড পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস সরদারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১৩:৪৬, জানুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৫, জানুয়ারি ২১, ২০২০

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুপারভিশন না করা ও পরিদর্শন ছাড়াই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি নবায়নসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস সরদারের বিরুদ্ধে। নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় শিক্ষা বোর্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে খোদ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট থেকে প্রেষণে শিক্ষা বোর্ডে পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন প্রকৌশলী আব্দুল কুদ্দুস সরদার। যোগদানের পরই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি ঠিকমতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও অ্যাকাডেমিক সুপারভিশন করছেন না।

এছাড়াও শিক্ষা বোর্ড থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিলে তা দীর্ঘ সময়েও শেষ করেন না এই কর্মকর্তা–এমন অভিযোগে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে আব্দুল কুদ্দুসের প্রেষণ বাতিল চান। সচিবের কাছে পাঠানো লিখিত চিঠিতে বলা হয়,  যোগদানের পর থেকেই আব্দুল কুদ্দুস সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় বোর্ডের এই বিভাগটি অবহেলিত রয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, তাকে জরুরি যেসব কাজ করতে বলা হয় তা সঠিকভাবে সম্পাদন না হওয়ায় বোর্ডের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। এ ব্যপারে তাকে শোকজ করা হলেও কোনও উন্নতি হয়নি। চিঠিতে তার প্রেষণ বাতিল করে মূল পদ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের জন্য অনুরোধও জানানো হয়। তবে এমন অভিযোগের এক বছর পার হলেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে নিজ পদে বহাল আছেন পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস।

ওই বছরের ২ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব কাজী ফয়সালের সই করা আদেশে এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানকে। তবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান এর আগেই বদলি হয়ে যান। আর শিক্ষাবোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মো. মোরাদ হোসেন মোল্ল্যা। নতুন চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিয়য়টি সম্পর্কে পরিষ্কার কোনও তথ্য দেননি তিনি।

জরুরি নথি উপস্থাপনেও দেরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস সরদারের বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের মকসুদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভুয়া জমির দলিল ও ভাড়াবাড়িতে স্থানান্তর সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের জন্য জরুরিভাবে নথি উপস্থাপন করতে ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর বোর্ড চেয়ারম্যান নির্দেশ দেন। কিন্তু আব্দুল কুদ্দুস ২০১৮ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত ৫ মাসেও এর নথি উপস্থাপন করেননি। এই বিষয়টি উল্লেখ করে চেয়ারম্যান তাকে শোকজ করেন ওই বছরের ১২ মার্চ। তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানের কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, ‘আপনার এহেন আচরণের জন্য কেন আপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা পত্র পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হলো।’

তবে সাবেক চেয়ারম্যান বদলি হওয়ায় এই নোটিশও ধামাচাপা পড়ে যায়।

পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ,তার মূল কাজ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও মনিটরিং ঠিকমতো না করলেও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে তিনি নিজে থাকেন। গত বছর ৭ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার তাবিউল মুরসালিন নগর কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষসহ কয়েকটি পদে নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটি গঠন করেন পরিদর্শক। তার সই করা আদেশে গঠন করা ওই কমিটিতে তিনি নিজেই সদস্য হিসেবে নিজেকে মনেনয়ন দেন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরও জানায়,গত বছর ময়মনসিংহের ত্রিশাল কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের সুযোগ নিয়ে পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস দুই লাখ টাকার বিনিময়ে একটি কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন বলে শিক্ষা বোর্ডে লিখিত অভিযোগ করেন অভিভাবক গোলাম মোস্তাফা এবং অন্য আরেক অভিভাবক মো. রফিকুল ইসলাম। এই ঘটনায় গত বছর ২ অক্টোবর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। এই ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মকর্তা পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াই বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন করেছেন গত বছর। এমপিওভুক্ত করতে তড়িঘড়ি করেও বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন করেন তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ও এম সাইফুর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠা করা,জামায়াত নেতাদের প্রতিষ্ঠিত করা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াই অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মো. মোরাদ হোসেন মোল্ল্যা বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর অনেক অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবো।’

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস সরদার শুধু জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সঠিক নয়। তিনি বলেন,‘অভিযোগগুলোর তথ্য যারা দিয়েছেন তারা সঠিক তথ্য দেননি।’   

প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব কর্মকর্তাকে নিয়ে সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এককভাবে কিছুই করিনি।’ যদিও পরিদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি নবায়নের প্রধান দায়িত্বই ছিল তার।

 

 

/এমআর/টিএন/

লাইভ

টপ