আগুন ধরে যাচ্ছে সেই ফগার মেশিনে

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১১:৫৬, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৩, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০

ফগার মেশিন (ফাইল ছবি)

গত বছরের ডেঙ্গু মৌসুমে জরুরি প্রয়োজনে টেন্ডার ছাড়াই কেনা হয়েছে জার্মানির তৈরি দুইশ’ ফগার মেশিন ও পাঁচটি ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মেশিনগুলো সফলভাবে ব্যবহার করতে পারেনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অভিযোগ উঠেছে, মেশিনগুলো চালুর পর আগুন ধরে যায়। ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই এগুলো কেনা হয়েছে। ফলে সংস্থাটির কমপক্ষে সাড়ে চার কোটি টাকা গচ্চা গেছে।

গত শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিরপুর পুলিশ কনভেনশন হলের পেছন থেকে মশা নিধনে দুই সপ্তাহব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে ডিএনসিসি। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিন দুটি চালুর চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ চেষ্টার পর একটি চালু হলেও সেটি থেকে বিপজ্জনকভাবে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকে। অন্যটি কিছুসময় চললেও পরে নল থেকে স্ফুলিঙ্গ বের হয়।  

ডিএনসিসির ভান্ডার বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত ডেঙ্গু মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে বেশকিছু মশা নিধন যন্ত্রপাতি কেনে ডিএনসিসি। তবে এজন্য কোনও টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই পুরো কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কোন পণ্য কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করবে সেটাও অনুমোদনের আগেই ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল। ‘জরুরি’ অবস্থার বথা বলে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে পাস করে নেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ওই বৈঠকে পাঠানো এ সম্পর্কিত এক সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃক দ্রুততম সময়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রয়োজনীয় ফগার মেশিন, হস্তচালিত মেশিন ও কীটনাশক সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয় করা প্রয়োজন: এমন মন্তব্য জানিয়ে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এজন্য স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বাজারদরও সংগ্রহ করা হয়েছে।

ওই প্রস্তাবে ২০০টি ফগার মেশিন কেনার প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের দর দেওয়ার তথ্য দেওয়া হয়। এর মধ্যে নবাবপুরের ‘মোহাম্মদি হার্ডওয়্যার মার্ট’ এই মেশিনগুলোর মূল্য দিয়েছে চার কোটি টাকা। চট্টগ্রামের অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান দর দিয়েছে যথাক্রমে চার কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং চার কোটি ৬০ লাখ টাকা। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নবাবপুরের মোহাম্মদি হার্ডওয়্যারকে ফগার মেশিন সরবরাহ করার জন্য মনোনীত করার সুপারিশ করা হয়। এর বাইরে আরও পাঁচটি ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিন ক্রয় করে ডিএনসিসি। প্রতিটি মেশিনের দাম ধরা হয় ১০ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ টাকা। এই পাঁচটি মেশিনের মধ্যে দুটি মেশিন আগেই গ্রহণ করা হয়েছে।

মেশিনগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদি হার্ডওয়্যার মার্টের স্বত্বাধিকারী হুজাইফার সঙ্গে কথা বলার জন্য তার অফিসে ফোন করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর বলেছেন, ‘আপনার (প্রতিবেদকের) নম্বর স্যারকে দিচ্ছি। তিনি আপনাকে ফোন করবেন।’ কিন্তু এরপর তিনি আর ফোন করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির একাধিক মশক নিধন কর্মী জানান, আগের ফাল্স ফগ মেশিনগুলো অনেক ভালো। ১৯৯০ সাল থেকে দুই সিটিতে এই মেশিনগুলো ব্যবহার করা হয়। সেগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন জার্মানির কথা বলে যেসব মেশিন আনা হয়েছে, সেগুলো চালানো যায় না। সামান্য সময় চালালেই আগুন ধরে যায়। মেশিনগুলো গরম হয়ে যায়। তখন মেশিনগুলো ফের চালুও করা যায় না।

মেশিনগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির মশক সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির প্রধান ও ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেওয়ান আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেশিনগুলোতে আগুন ধরে যায় এটা সত্য। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, অপারেটিং সিস্টেম না জানার কারণে এই সমস্যাটি হচ্ছে। আমরা তো মেশিনগুলো কেনার সময় জার্মানির সেই কারখানা পরিদর্শন করে কিনেছি। এখন সরবরাহের সময় সেটা সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কিনা জানা নেই। তখন তো মেশিনগুলো ভালো দেখেছি। আগুন ধরেনি।’  

তিনি আরও বলেন, ‘ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিনগুলো আনার পর কখনও ব্যবহার করা হয়নি। আর যে ২০০টি সুইংফগ মেশিন আনা হয়েছে, সেগুলোতেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বেশ কয়েকটি অচল হয়ে পড়েছে। কারণ আগে আমরা কেরোসিন দিয়ে মেশিন চালাতাম। এখন ডিজেল দিয়ে মেশিন চালানো হয়। ডিজেলের ঘনত্ব একটু বেশি। সেই কারণে ধোঁয়াও বেশি হয়। এতে অনেক সময় মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। আর স্টার্ট নেয় না। কাজের ক্ষতি হয়।’

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান ক্রয় ও ভান্ডার কর্মকর্তা মো. সগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে আমাদের কোনও হাত নেই। আমাদের একটি ক্রয় কমিটি আছে। কমিটি যেই মেশিনগুলো কেনার জন্য সুপারিশ করে, আমরা সেগুলোর জন্য প্রক্রিয়া শেষ করি। আমাদের কাছে যেই অর্ডার এসেছে, সেই অর্ডার অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি।’

ক্রয় কমিটির প্রধান ও ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাইয়ের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

/এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ